সারাবিশ্ব
ভারতের রাজপথে ক্ষুব্ধ তরুণদের ঢল, মোদি সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে ভোটার তালিকা সংশোধনকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভে নেমেছেন তরুণদের একটি বড় অংশ। ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক নাম বাদ দেওয়া, নাগরিকদের ভোটাধিকার নিয়ে উদ্বেগ এবং আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের বলপ্রয়োগ-সব মিলিয়ে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকারের সামনে এখন বড় প্রশ্ন, তরুণদের এই ক্ষোভ কতটা বিস্তৃত ও দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলনে রূপ নেয়। গত কয়েক দিনে নয়াদিল্লিসহ ভারতের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। এর প্রতিবেদনেও ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্ক এবং তরুণদের আন্দোলনের বিস্তারের বিষয়টি উঠে এসেছে।
ভোটার তালিকা ঘিরে ক্ষোভ, রাজপথে তরুণেরা
২২ বছর বয়সী অর্থনীতির শিক্ষার্থী কশিশ রাওয়াত পরিবারের কাউকে না জানিয়েই গত শনিবার নয়াদিল্লিতে এসেছিলেন। রাজধানীতে পৌঁছে তিনি দেখতে পান, শহরের বিভিন্ন এলাকায় ধাতব ব্যারিকেড বসানো হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, পুলিশ অনেককে লাঠিপেটা করেছে, কাউকে টেনে-হিঁচড়ে আটক করেছে এবং অন্যদের ধাওয়া দিয়ে সরিয়ে দিয়েছে। পুলিশের সঙ্গে সংঘাত ও আটকের কিছু দৃশ্য আন্দোলনকারীরা মুঠোফোনে ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন।
পুলিশি বাধা সত্ত্বেও রাওয়াত ও তাঁর সহযোগীরা সন্ধ্যা পর্যন্ত রাজপথে অবস্থান করেন। নিজেদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় জানিয়ে রাওয়াত বলেন, তাঁরা আন্দোলন ছেড়ে যাচ্ছেন না; আবার ফিরে এসে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরবেন।
ভারতের ভোটার তালিকা সংশোধন কার্যক্রমকে কেন্দ্র করেই এই আন্দোলনের সূত্রপাত। গত বছর থেকে শুরু হওয়া তালিকা পর্যালোচনায় এখন পর্যন্ত ১৩ কোটির বেশি নাম বাদ পড়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিরোধী দল ও আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়া রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট এবং এর ফলে বৈধ ভোটারদের একটি অংশ ভোটাধিকার হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন।
তবে ভারতের নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য ভিন্ন। কমিশনের দাবি, ভোটার তালিকা থেকে মৃত, স্থানান্তরিত, অযোগ্য ও একাধিকবার নিবন্ধিত ব্যক্তিদের নাম বাদ দিয়ে তালিকা নির্ভুল করতেই এই পর্যালোচনা চালানো হচ্ছে। ফলে তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে দুটি প্রশ্ন-বাদ পড়া নামগুলোর যথার্থতা এবং বৈধ ভোটারদের অধিকার কীভাবে সুরক্ষিত রাখা হবে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবি
ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে ক্ষোভের জেরে আন্দোলনকারীরা ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের এই উদ্যোগ ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) রাজনৈতিক সুবিধা দেওয়ার পথ তৈরি করতে পারে। বিরোধী দলগুলোর একাংশের দাবি, তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার প্রভাব সংখ্যালঘু ও বিরোধী দলসমর্থক ভোটারদের ওপর তুলনামূলক বেশি পড়তে পারে।
অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের বক্তব্য, ভোটার তালিকা পর্যালোচনা একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, যার উদ্দেশ্য নির্বাচনী তালিকায় থাকা ভুল ও অযোগ্য নিবন্ধন দূর করা। ফলে তালিকা সংশোধনের পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে কি না, তা নিয়ে পক্ষগুলোর মধ্যে তীব্র মতবিরোধ তৈরি হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজে বিক্ষোভ নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করেননি বলে প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বিজেপির কয়েকজন নেতা আন্দোলনকারীদের ‘অরাজকতাবাদী’ বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং তাঁদের বিদেশি শক্তির সমর্থন পাওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। এসব অভিযোগের পক্ষে তাঁরা কী প্রমাণ দিয়েছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে বাড়ছে প্রশ্ন
মোদির দীর্ঘ শাসনামলে ভারতের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা, বিরোধী মতের প্রতি সরকারের আচরণ এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে সমালোচনা হয়ে আসছে। সরকারের সমালোচকদের অভিযোগ, প্রশাসনিক ক্ষমতার ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়েছে, ভিন্নমত প্রকাশের জায়গা সংকুচিত হয়েছে এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে।
তবে কেন্দ্রীয় সরকার এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে। সরকারের বক্তব্য, ভারতের গণতান্ত্রিক ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকর রয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আইন অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করে।
তরুণ আন্দোলনকারীদের একটি অংশের কাছে বর্তমান ভোটার তালিকা বিতর্ক তাই শুধু নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রশ্ন নয়; বরং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহি নিয়েও উদ্বেগের বিষয়। তাঁদের মতে, নাগরিকের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা এবং নির্বাচন পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর জনসাধারণের আস্থা বজায় রাখা গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য।
পুলিশের বলপ্রয়োগে আরও তীব্র ক্ষোভ
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ সমাবেশেও পুলিশের কঠোর অবস্থান তাঁদের ক্ষোভ বাড়িয়ে দিয়েছে। বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করা, অংশগ্রহণকারীদের আটক করা এবং রাজপথে চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপের ঘটনায় নাগরিক অধিকার নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
২১ বছর বয়সী দর্শনের শিক্ষার্থী আরিয়ান কাজানিয়ার মতে, এই বিতর্ক তরুণদের রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি হতাশার বহিঃপ্রকাশ। তাঁর বক্তব্য, সাধারণ মানুষ যদি সমাবেশের অধিকার প্রয়োগ করতে গিয়ে বাধার মুখে পড়ে কিংবা প্রতিবাদ করায় আটক হওয়ার আশঙ্কা করে, তাহলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কার্যকরভাবে কীভাবে নিশ্চিত হবে-সেই প্রশ্ন সামনে আসে।
আন্দোলনকারীরা আরও বলছেন, তাঁদের প্রতিবাদ কোনো একটি রাজনৈতিক দলের কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ নয়। ভোটাধিকার, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও নাগরিক অধিকার নিয়ে অভিন্ন উদ্বেগ থেকেই বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শহরের তরুণেরা একত্র হচ্ছেন। বন্ধুদের আলোচনা, পারিবারিক পরিসরে রাজনৈতিক বিতর্ক এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কথোপকথনও তাঁদের মধ্যে পারস্পরিক সংযোগ তৈরিতে ভূমিকা রাখছে।
‘ককরোচ’ আন্দোলন কীভাবে আলোচনায় এল
ভারতের তরুণদের মধ্যে আলোচিত ‘ককরোচ’ বা তেলাপোকা আন্দোলন সাম্প্রতিক সময়ে নতুন রাজনৈতিক গুরুত্ব পেয়েছে। আন্দোলনটির নাম ও প্রতীককে তরুণেরা ব্যঙ্গ, প্রতিবাদ এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও টিকে থাকার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করছেন। এর সঙ্গে যুক্ত কর্মীরা ভোটার তালিকা সংশোধনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকারসংক্রান্ত বিষয়ে সরব হয়েছেন।
চলতি বছরের জুলাইয়ে শিক্ষাসংক্রান্ত বিতর্কের পর মোদি সরকারের শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের ঘটনায়ও তরুণদের আন্দোলনের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতে এই আন্দোলনকে ভারতের তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক সক্রিয়তা বৃদ্ধির একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
১৯ বছর বয়সী সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী মায়া রিবেরো মনে করেন, ভোটার তালিকা বিতর্ক তাঁদের গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। তাঁর মতে, ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধিত হওয়া শুধু নাগরিক অধিকার নয়, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অংশগ্রহণের দায়িত্বও। কিন্তু তালিকা থেকে ব্যাপকভাবে নাম বাদ পড়ার ঘটনায় ভোটাধিকার কতটা সুরক্ষিত, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
রিবেরোর বক্তব্য, নির্বাচনী ব্যবস্থাকে স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য করতে প্রয়োজনীয় সংস্কার জরুরি। তবে সেই সংস্কারের প্রক্রিয়ায় যেন বৈধ ভোটারদের অধিকার ক্ষুণ্ন না হয়, তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
রাজপথের আন্দোলন কি মোদি সরকারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ হবে?
নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে ভারতের রাজনীতিতে শক্তিশালী অবস্থান ধরে রেখেছে। দলটির বিস্তৃত সাংগঠনিক কাঠামো ও নির্বাচনী ভিত্তির কারণে শুধু রাজপথের আন্দোলন দিয়ে সরকারকে রাজনৈতিকভাবে চাপে ফেলা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিরোধী দলগুলোও বিভিন্ন সময়ে সরকারের বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষকে একটি সমন্বিত জাতীয় রাজনৈতিক বিকল্পে রূপ দিতে সমস্যার মুখে পড়েছে।
বর্তমান তরুণ আন্দোলনও এখন পর্যন্ত একক, সুসংগঠিত রাজনৈতিক বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে-এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই। তবে আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, তাঁদের লক্ষ্য শুধু সরকারের বিরোধিতা করা নয়; বরং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, নাগরিক অধিকারের সুরক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
কশিশ রাওয়াতের জন্য এই আন্দোলনের প্রভাব রাজপথের বাইরেও বিস্তৃত। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক মতপার্থক্য নিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কেও টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে নিজের অবস্থানের পার্থক্যের কারণে স্বাভাবিক কথাবার্তা চালিয়ে যাওয়াও কখনো কখনো কঠিন হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে, মায়া রিবেরোর কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, তরুণদের এই তাৎক্ষণিক ক্ষোভ দীর্ঘমেয়াদি নাগরিক আন্দোলনে রূপ নিতে পারবে কি না। ভোটার তালিকার প্রতিটি পরিবর্তন পর্যালোচনা, বৈধ ভোটারদের আপিলের সুযোগ নিশ্চিত করা এবং নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা বাড়ানোর মতো দাবিগুলো আন্দোলনের ভবিষ্যৎ দিক নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সব মিলিয়ে, ভারতের তরুণদের এই আন্দোলন মোদি সরকারের জন্য রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে এবং ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে জাতীয় বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে। তবে এই ক্ষোভ শেষ পর্যন্ত কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে, নির্বাচনী ব্যবস্থায় কী ধরনের পরিবর্তন আনবে এবং তরুণদের দাবি কতটা বাস্তবায়িত হবে-তা নির্ভর করবে আন্দোলনের ধারাবাহিকতা, নির্বাচন কমিশনের পদক্ষেপ, আদালতের পর্যালোচনা এবং সরকারের প্রতিক্রিয়ার ওপর।