সারাবিশ্ব
মার্কিন বিমানঘাঁটিতে হামলার আশঙ্কা, গ্রেফতার পাঁচজনই ব্রিটিশ
যুক্তরাজ্যের গ্লুচেস্টারশায়ারে মার্কিন সামরিক বাহিনী ব্যবহৃত আরএএফ ফেয়ারফোর্ড বিমানঘাঁটির কাছে সম্ভাব্য সন্ত্রাসী হামলার প্রস্তুতির অভিযোগে পাঁচজনকে গ্রেফতার করেছে ব্রিটিশ পুলিশ। গ্রেফতার পাঁচজনই ব্রিটিশ নাগরিক এবং লন্ডনের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা। তাদের বয়স ২৩ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। ব্রিটিশ কাউন্টার-টেররিজম পুলিশের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, তারা বিস্ফোরক-সংক্রান্ত অপরাধ এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতির সন্দেহে পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন।
ঘটনাটি ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে-এই হামলার পেছনে কারা ছিল এবং এর উদ্দেশ্য কী? বিশেষ করে ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটিটি সাম্প্রতিক সময়ে ইরান-সংক্রান্ত মার্কিন সামরিক অভিযানে ব্যবহৃত হওয়ায় তদন্তে সম্ভাব্য ইরানি যোগসূত্রের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ এখনো ইরানের সংশ্লিষ্টতার কোনো প্রমাণ প্রকাশ করেনি। বরং কাউন্টার-টেররিজম পুলিশ জানিয়েছে, হামলার উদ্দেশ্য ও সম্ভাব্য ভূরাজনৈতিক যোগসূত্র নিয়ে নানা জল্পনা থাকলেও তদন্ত এখনো চলছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যে ইরানি দূতাবাস এই ঘটনার সঙ্গে তেহরানের সম্পৃক্ততার যেকোনো ইঙ্গিত প্রত্যাখ্যান করেছে। দূতাবাসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কোনো প্রমাণ ছাড়াই ঘটনাটিকে ইরানের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা ভিত্তিহীন ও বিদ্বেষপূর্ণ জল্পনার অংশ। ফলে হামলার সঙ্গে ইরানের কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
তিনটি সাদা ভ্যান ঘিরেই শুরু হয় সন্দেহ
ঘটনার সূত্রপাত স্থানীয় সময় রোববার রাত প্রায় ১২টা ৪৫ মিনিটে। পুলিশের কাছে খবর আসে, তিনটি সন্দেহজনক ভ্যান বিমানঘাঁটির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এর কিছুক্ষণ পর স্থানীয় এক নারী কৃষকও বিমানঘাঁটির কাছাকাছি সড়কে তিনটি সাদা ভ্যান দেখতে পান। ভ্যানগুলো রাস্তা এবং একটি খামারের প্রবেশপথের অংশবিশেষ আটকে রেখেছিল বলে তিনি জানান।
ওই নারী দাবি করেন, তিনি একটি অনুষ্ঠান থেকে বাড়ি ফেরার পথে ভ্যানগুলো দেখতে পান। এরপর তিনি হুড ও মুখোশ পরা একদল ব্যক্তিকে দেখতে পান। তাকে দেখে কয়েকজন মাঠের দিকে এবং অন্যরা পাশের কেম্পসফোর্ড গ্রামের দিকে দৌড়ে পালিয়ে যায়। পরিস্থিতি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় তিনি প্রথমে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। পরে স্থানীয় সময় রাত ১টা ৩৬ মিনিটের দিকে জরুরি নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশকে বিষয়টি জানান।
ওই ফোন পাওয়ার পর সশস্ত্র পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায়। পরে তিনটি ভ্যান ঘিরে প্রায় ৪০০ মিটার এলাকাজুড়ে নিরাপত্তাবেষ্টনী তৈরি করা হয়। বোমা নিষ্ক্রিয়কারী বিশেষজ্ঞ ও সেনাবাহিনীর বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয়কারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে যানবাহনগুলো পরীক্ষা শুরু করে।
৮৫টি পরিবারকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়
ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় বিমানঘাঁটির আশপাশের এলাকায় ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। স্থানীয় প্রায় ৮৫টি পরিবারকে সাময়িকভাবে বাড়ি থেকে সরিয়ে নিরাপদ স্থানে নেওয়া হয়। একই সঙ্গে আশপাশের বেশ কয়েকটি সড়কে যান চলাচল সীমিত করে দেওয়া হয় এবং পুলিশ পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে।
তিনটি ভ্যানের ভেতরে সন্দেহজনক বস্তু রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করতে বোমা নিষ্ক্রিয়কারী রোবটও ব্যবহার করা হয়। প্রাথমিকভাবে যানবাহনগুলোর ভেতরে বিস্ফোরক তৈরির উপকরণ বা সম্ভাব্য বিস্ফোরক ডিভাইস থাকার বিষয়টি তদন্তকারীদের নজরে আসে। তবে এসব বস্তু কার্যকর বিস্ফোরক ছিল কি না, সে বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছিল।
আত্মঘাতী হামলার আশঙ্কা নিয়েও তৎপরতা
গ্রেফতারের সময় সন্দেহভাজনদের শরীরের ওপরের পোশাক খুলে নেওয়া হয়েছিল-এমন ছবি ও তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর একটি সম্ভাব্য কারণ ছিল তাদের শরীরে আত্মঘাতী বিস্ফোরক বা অন্য কোনো অস্ত্র লুকানো আছে কি না, সে বিষয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সতর্কতা। তবে পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি যে গ্রেফতার ব্যক্তিদের কাছে কোনো ‘সুইসাইড ভেস্ট’ পাওয়া গেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, পাঁচজনকে প্রথমে বিস্ফোরক আইনের অধীনে গ্রেফতার করা হয়। পরে তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতির সন্দেহও যুক্ত করা হয়। তদন্তকারীরা এখন হামলার সম্ভাব্য উদ্দেশ্য, পরিকল্পনার ধরন এবং এর সঙ্গে অন্য কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের যোগাযোগ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছেন।
গ্রেফতার পাঁচজনই ব্রিটিশ নাগরিক
কাউন্টার-টেররিজম পুলিশের সর্বশেষ তথ্যে বলা হয়েছে, গ্রেফতার পাঁচজনই ব্রিটিশ নাগরিক এবং লন্ডনের বাসিন্দা। তাদের মধ্যে একজনের বয়স ২৩, তিনজনের ২৪ এবং একজনের ২৫ বছর। তারা লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার, ক্যামডেন ও উইলেসডেন এলাকার বাসিন্দা বলে জানানো হয়েছে।
তবে তাদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি এবং তদন্ত শেষ হওয়ার আগে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রকৃতি সম্পর্কে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়নি। পুলিশ জানিয়েছে, সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
‘অত্যন্ত জটিল ও বড় পরিসরের অভিযান’
কাউন্টার-টেররিজম পুলিশের সিনিয়র ন্যাশনাল কো-অর্ডিনেটর ভিকি ইভান্স ঘটনাটিকে অত্যন্ত জটিল ও বড় পরিসরের অভিযান হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, স্থানীয় ও জাতীয় পুলিশ, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থা একসঙ্গে তদন্ত চালাচ্ছে।
তিনি একই সঙ্গে হামলার উদ্দেশ্য ও সম্ভাব্য ভূরাজনৈতিক যোগসূত্র নিয়ে চলমান নানা জল্পনা সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। তদন্তকারীদের প্রয়োজনীয় সময় ও সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, তদন্তের বিভিন্ন দিক এখনো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
কৃষকের ফোনেই কি বড় বিপদ এড়ানো গেল?
ঘটনার পর স্থানীয় ওই নারী কৃষকের ৯৯৯ নম্বরে করা ফোনকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং সন্দেহজনক ভ্যান ও সেখানে থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযান চালায় বলে জানা গেছে।
ওই কৃষকের দাবি, বিমানঘাঁটির কাছাকাছি রাতের বেলায় মুখোশধারী ব্যক্তিদের চলাচল এবং তিনটি ভ্যানের অবস্থান তার কাছে অত্যন্ত অস্বাভাবিক মনে হয়েছিল। তাই ঝুঁকি না নিয়ে তিনি পুলিশকে খবর দেন। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলি তার দ্রুত সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেছেন। তবে একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ওই নারী ঘটনাটির কেবল একটি অংশ প্রত্যক্ষ করেছেন; তাই তার পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে নিরাপত্তাব্যবস্থা বা হামলার উদ্দেশ্য সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।
ট্রাম্পের মন্তব্যে উঠেছে নতুন প্রশ্ন
ঘটনার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি মন্তব্যও আলোচনায় এসেছে। ট্রাম্প দাবি করেছেন, সন্দেহভাজনদের সম্পর্কে আগে থেকেই তথ্য ছিল এবং তারা মার্কিন সামরিক স্থাপনায় ‘বড় ধরনের ক্ষতি’ করার চেষ্টা করছিল। তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতার প্রশংসাও করেছেন।
তবে ব্রিটিশ সূত্র ও পুলিশের প্রকাশ্য বক্তব্য অনুযায়ী, এই অভিযান আগে থেকেই গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়েছিল কি না, তা নিয়ে এখনো স্পষ্টতা নেই। কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থানীয় বাসিন্দার ৯৯৯ নম্বরে ফোন পাওয়ার পরই পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। ফলে ট্রাম্পের বক্তব্যের সঙ্গে ব্রিটিশ তদন্তের প্রকাশ্য তথ্যের মধ্যে কিছু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।
ইরানের সঙ্গে যোগসূত্র এখনো অপ্রমাণিত
ঘটনাটি এমন একটি সামরিক ঘাঁটির কাছে ঘটেছে, যেটি মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরান-সংক্রান্ত অভিযানে ব্যবহার করেছে। এ কারণেই সম্ভাব্য ইরানি সম্পৃক্ততার বিষয়টি তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক হয়ে উঠেছে। তবে এখন পর্যন্ত ব্রিটিশ পুলিশ প্রকাশ্যে এমন কোনো প্রমাণ দেয়নি, যা থেকে বলা যায় যে এই হামলার পরিকল্পনার সঙ্গে ইরান সরাসরি জড়িত ছিল।
ইরানের লন্ডন দূতাবাসও এ ধরনের অভিযোগ বা ইঙ্গিত প্রত্যাখ্যান করেছে। ফলে এই মুহূর্তে সবচেয়ে নিশ্চিত তথ্য হলো-পাঁচ ব্রিটিশ নাগরিককে গ্রেফতার করা হয়েছে, তিনটি সন্দেহজনক ভ্যান পরীক্ষা করা হচ্ছে এবং ঘটনাটিকে সম্ভাব্য সন্ত্রাসী হামলার প্রস্তুতি হিসেবে তদন্ত করছে ব্রিটিশ কাউন্টার-টেররিজম পুলিশ। হামলার উদ্দেশ্য, সম্ভাব্য সংগঠন বা বিদেশি কোনো রাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা সম্পর্কে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।