সারাবিশ্ব
যুক্তরাষ্ট্রে সর্ববৃহৎ ইস্পাত কারখানা প্রতিষ্ঠা করবে ভারতের এসার গ্রুপ: ট্রাম্প
যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প ও উৎপাদন খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে ভারতের বহুজাতিক শিল্পগোষ্ঠী এসার গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটির মার্কিন অঙ্গপ্রতিষ্ঠান মেসাবি মেটালিক্স আইওয়া অঙ্গরাজ্যে ১৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে একটি বিশাল ইস্পাত কমপ্লেক্স নির্মাণ করবে। পুরো প্রকল্পে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলার। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২৮ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এই প্রকল্পের ঘোষণা দেন। মেসাবি মেটালিক্স জানিয়েছে, এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে কোনো স্টিল কমপ্লেক্সে একক বৃহত্তম বিনিয়োগ হতে যাচ্ছে।
প্রস্তাবিত কারখানাটি আইওয়ার পূর্বাঞ্চলে নির্মাণ করা হবে এবং ২০৩০ সাল নাগাদ সেখানে বাণিজ্যিকভাবে ইস্পাত উৎপাদন শুরু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পূর্ণমাত্রায় প্রকল্পটি চালু হলে বছরে প্রায় ১০ মিলিয়ন টন ইস্পাত উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করবে। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে বছরে প্রায় ৭.৫ মিলিয়ন টন। এই সক্ষমতা বাস্তবায়িত হলে কারখানাটি যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ইস্পাত উৎপাদন কেন্দ্রগুলোর একটি হয়ে উঠবে।
এই প্রকল্পের অন্যতম বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এর সমন্বিত বা ‘মাইন-টু-মিল’ সরবরাহব্যবস্থা। আইওয়ার কারখানায় ইস্পাত উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় লৌহ আকরিক সরবরাহ করা হবে মিনেসোটার মেসাবি আয়রন রেঞ্জে মেসাবি মেটালিক্সের নিজস্ব খনি থেকে। অর্থাৎ খনি থেকে আকরিক উত্তোলন, পরিবহন এবং পরবর্তী পর্যায়ে ইস্পাত উৎপাদনের বড় অংশই যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ভাষায়, এর মাধ্যমে একটি সম্পূর্ণ মার্কিন সরবরাহশৃঙ্খল গড়ে তোলা হবে।
মিনেসোটার খনি প্রকল্পটিও এই বৃহৎ বিনিয়োগ পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মেসাবি মেটালিক্স ইতোমধ্যে সেখানে প্রায় ২.৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে এবং নতুন খনি থেকে লৌহ আকরিক উৎপাদনের কার্যক্রম শুরু করেছে। কোম্পানির পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই খনি থেকে উৎপাদিত আকরিক ও তা থেকে তৈরি পেলেট সরাসরি আইওয়ার নতুন স্টিল কমপ্লেক্সে সরবরাহ করা হবে। পুরো প্রকল্পের আওতায় মিনেসোটা ও আইওয়া মিলিয়ে একটি সমন্বিত ইস্পাত উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলাই কোম্পানির লক্ষ্য।
প্রকল্পটি কর্মসংস্থান তৈরিতেও বড় ভূমিকা রাখবে বলে জানিয়েছে মেসাবি মেটালিক্স। নির্মাণপর্বে প্রায় ৬ হাজার কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। কারখানাটি পূর্ণমাত্রায় চালু হলে আইওয়ায় অন্তত ১ হাজার ৭৫০টি স্থায়ী চাকরি সৃষ্টি হবে। কোম্পানির হিসাবে, নির্মাণকাজ এবং কার্যক্রম শুরুর পর প্রথম ১০ বছরে প্রকল্পটি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে প্রায় ৯৫ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক উৎপাদন বা প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে।
হোয়াইট হাউসে প্রকল্পটির ঘোষণা দিতে গিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের ইস্পাত শিল্প ও অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সক্ষমতা পুনর্গঠনের গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন। ট্রাম্প দাবি করেন, বিদেশি ইস্পাতের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের পর আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে উৎপাদন স্থাপনে আগ্রহী হচ্ছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, আমদানি শুল্ক এড়ানোর পাশাপাশি মার্কিন বাজারের কাছাকাছি উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলাও বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখছে।
মেসাবি মেটালিক্সের চেয়ারম্যান রেওয়ান্ত রুইয়া প্রকল্পটিকে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে একটি পূর্ণাঙ্গ ইস্পাত সরবরাহব্যবস্থা তৈরির উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কোম্পানির পরিকল্পনা অনুযায়ী, মিনেসোটা থেকে লৌহ আকরিক মার্কিন রেলপথে পরিবহন করে আইওয়ার কারখানায় নেওয়া হবে এবং সেখানে তা প্রক্রিয়াজাত করে ইস্পাতে রূপান্তর করা হবে। উৎপাদন ব্যবস্থায় লৌহ আকরিকের পাশাপাশি পুনর্ব্যবহৃত স্ক্র্যাপ স্টিলও ব্যবহার করা হবে।
নতুন কারখানায় উৎপাদিত ইস্পাত যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শিল্পে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গাড়ি ও ট্রাক উৎপাদন, জাহাজ নির্মাণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি খাত, গৃহস্থালি পণ্য এবং জাতীয় প্রতিরক্ষা-সংশ্লিষ্ট শিল্প। ফলে প্রকল্পটি শুধু একটি ইস্পাত কারখানা নির্মাণের উদ্যোগ নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ শিল্প সরবরাহব্যবস্থাকে আরও বিস্তৃত করার একটি বড় পরিকল্পনা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
প্রকল্পটির ঘোষণার সময় হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন মেসাবি মেটালিক্সের চেয়ারম্যান রেওয়ান্ত রুইয়া, এসার গ্রুপের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও ভাইস চেয়ারম্যান রবি রুইয়া এবং মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা। আইওয়ার গভর্নর কিম রেনল্ডস, সিনেটর জোনি আর্নস্ট এবং প্রতিনিধি অ্যাশলে হিনসন ও মারিয়েনেট মিলার-মিক্সসহ একাধিক রিপাবলিকান নেতাকেও অনুষ্ঠানে দেখা যায়।
আইওয়ায় এই বিশাল বিনিয়োগের ঘোষণা এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ২০২৬ সালের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে। আইওয়ার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কংগ্রেসনাল আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে এবং রাজ্যটির রাজনৈতিক গুরুত্বও উল্লেখযোগ্য। ফলে প্রকল্পটির অর্থনৈতিক দিকের পাশাপাশি এর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে কারখানাটি ২০৩০ সালের দিকে উৎপাদনে যাওয়ার কথা থাকায় এর দীর্ঘমেয়াদি শিল্প ও অর্থনৈতিক প্রভাবই প্রকল্পটির মূল বিষয়।
ভারতের এসার গ্রুপের জন্যও যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রকল্প আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে বড় পদক্ষেপ। ১৯৬৯ সালে শশী রুইয়া ও রবি রুইয়ার প্রতিষ্ঠিত এসার সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানি, খনি, অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও অন্যান্য শিল্পখাতে ব্যবসা বিস্তার করেছে। মেসাবি মেটালিক্সের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের খনি ও ইস্পাত খাতে তাদের উপস্থিতি আরও শক্তিশালী হচ্ছে। মিনেসোটার খনি এবং আইওয়ার প্রস্তাবিত স্টিল কমপ্লেক্স একসঙ্গে চালু হলে যুক্তরাষ্ট্রে এসারের একটি বড় সমন্বিত শিল্পভিত্তি তৈরি হবে।
মেসাবি মেটালিক্স জানিয়েছে, প্রকল্পটির মাধ্যমে মিনেসোটা ও আইওয়াকে যুক্ত করে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে একটি সমন্বিত ইস্পাত উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। ১৮ বিলিয়ন ডলারের এই বিনিয়োগের মধ্যে ১৫ বিলিয়ন ডলার যাবে আইওয়ার স্টিল কমপ্লেক্স নির্মাণে এবং প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার মিনেসোটার খনি প্রকল্প সম্পন্ন করতে। পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে এটি শুধু এসার গ্রুপের যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগগুলোর একটি হবে না, বরং দেশটির ইস্পাত শিল্পের সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় শিল্প প্রকল্প হিসেবেও জায়গা করে নেবে।