জাতীয়

আজ পিলখানা ট্র্যাজেডি দিবস: ১৭ বছরেও না শুকানো রক্তাক্ত স্মৃতি


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:৪৮ এএম

আজ পিলখানা ট্র্যাজেডি দিবস: ১৭ বছরেও না শুকানো রক্তাক্ত স্মৃতি
ছবি: সংগৃহীত

আজ ২৫ ফেব্রুয়ারি-বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম বেদনাবিধুর দিন, পিলখানা ট্র্যাজেডি দিবস। ২০০৯ সালের এই দিনে তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর), বর্তমানে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ–এর সদর দপ্তর পিলখানায় সংঘটিত হয় ইতিহাসের এক ভয়াবহ ও নির্মম হত্যাযজ্ঞ।

বিদ্রোহের নামে বিপথগামী সদস্যদের হাতে প্রাণ হারান ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা, নারী ও শিশুসহ আরও অন্তত ১৭ জন। পুরো জাতি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল সেই নৃশংসতায়।

২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে ভয়ংকর তাণ্ডব চালানো হয়। নিহতদের মধ্যে ছিলেন বাহিনীর তৎকালীন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদ, তাঁর স্ত্রীসহ ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তারা। হত্যাকাণ্ডের পর পুরো বাহিনী ও রাষ্ট্রব্যবস্থা গভীরভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।

এই ঘটনার পর বিডিআরের নিজস্ব আইনে এবং পরবর্তীতে ফৌজদারি আদালতে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়। ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর নিম্ন আদালতের রায়ে ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৪২৩ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২০১৭ সালের ২৭ নভেম্বর হাই কোর্টের আপিল রায়ে ১৩৯ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকে, আটজনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন এবং চারজনকে খালাস দেওয়া হয়। এছাড়া বিভিন্ন ধাপে আরও বহু আসামির সাজা বহাল, কমানো বা বাতিল হয়। দীর্ঘ এই বিচারপ্রক্রিয়া রাষ্ট্রের ইতিহাসে এক জটিল ও আলোচিত অধ্যায় হয়ে আছে।

দীর্ঘ দেড় দশক পর, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পুনঃতদন্ত শুরু করে। এ লক্ষ্যে গঠন করা হয় জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন। কমিশনের প্রতিবেদনে হত্যাকাণ্ডের পেছনের অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ, কাঠামোগত দুর্বলতা, দায়িত্বগত অসামঞ্জস্যসহ একাধিক কারণ তুলে ধরা হয়। কমিশনের প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমান বলেন, এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে জাতির বহু অজানা প্রশ্নের জবাব পাওয়া যাবে এবং ভবিষ্যতের জন্য এটি হবে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষণীয় দলিল।

২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি সকাল ৯টায় পিলখানা সদর দপ্তরের দরবার হলে শুরু হয় বিডিআরের বার্ষিক দরবার। তৎকালীন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদের বক্তব্য চলাকালে হঠাৎ বিদ্রোহী সদস্যরা অস্ত্র হাতে হামলা চালায়। মুহূর্তের মধ্যেই দরবার হল রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। সেনা কর্মকর্তাদের নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়, তাঁদের পরিবারের সদস্যদের জিম্মি করা হয়। দুই দিনব্যাপী এই বিভীষিকার অবসান ঘটে ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে আত্মসমর্পণের মাধ্যমে। পরদিন পিলখানার ভেতরে একাধিক গণকবর থেকে উদ্ধার করা হয় শহীদ সেনা কর্মকর্তাদের মরদেহ।

ঘটনার সময় রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল শেখ হাসিনা–এর সরকার। সাম্প্রতিক সময়ে এ ঘটনার রাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রেক্ষাপট নতুন করে আলোচনায় এসেছে। জাতীয় শহীদ সেনা দিবস উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, “ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে জনগণের কাছে পিলখানা হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কারণ এখন আরও স্পষ্ট।” তিনি শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং তাঁদের পরিবারবর্গের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আজ পিলখানা ট্র্যাজেডির দিনটি ‘জাতীয় শহীদ সেনা দিবস’ হিসেবে পালিত হচ্ছে। সকালে বনানী সামরিক কবরস্থানে শহীদদের স্মৃতিস্তম্ভে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, তিন বাহিনীর প্রধান, স্বরাষ্ট্র সচিব ও বিজিবির মহাপরিচালক যৌথভাবে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। বিকেলে সেনানিবাসে শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাতের কর্মসূচি রয়েছে।

১৭ বছর পেরিয়ে গেলেও পিলখানার সেই রক্তাক্ত অধ্যায় আজও জাতির বিবেককে নাড়া দেয়। শোক, স্মরণ আর সত্য উদঘাটনের প্রত্যাশায় দিনটি পালন করছে পুরো দেশ।