জাতীয়
ছয় মাসে ৯৫ কারখানা বন্ধ, চাকরি হারিয়েছেন প্রায় ৬২ হাজার শ্রমিক: সিপিডি
নতুন সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম ছয় মাসে দেশের অর্থনীতির ৩১টি প্রধান সূচকের মধ্যে ১৯টিতেই অবনতি হয়েছে বলে জানিয়েছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। একই সময়ে দেশের গুরুত্বপূর্ণ তিন শিল্পাঞ্চল গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া এবং নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদীতে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এতে সরাসরি কর্মসংস্থান হারিয়েছেন ৬১ হাজার ৮৮১ শ্রমিক।
সোমবার (২৪ আগস্ট) রাজধানীতে সিপিডির কার্যালয়ে ‘নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাস: একটি অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক সংলাপে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, নতুন সরকারের কাছে মানুষের অন্যতম বড় প্রত্যাশা ছিল অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা। তবে সরকারের প্রথম ছয় মাসের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনায় স্বস্তির চেয়ে উদ্বেগের জায়গাই বেশি দেখা যাচ্ছে।
তিনি বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের অর্থনীতি কী অবস্থায় ছিল, সে বিষয়ে এখনো কোনো সমন্বিত ও তথ্যভিত্তিক নথি তৈরি হয়নি। ফলে সরকারের বিভিন্ন বক্তব্য ও প্রকাশিত পরিসংখ্যানের মধ্যে সামঞ্জস্য যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
৯৫ কারখানা বন্ধ, কর্মহীন ৬১ হাজার ৮৮১ শ্রমিক
সিপিডির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া এবং নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদী শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। এসব কারখানা বন্ধ হওয়ায় সরাসরি কর্মসংস্থান হারিয়েছেন ৬১ হাজার ৮৮১ শ্রমিক।
গ্যাস সংকটের কারণেও টেক্সটাইল, ইস্পাত, কাগজ, কাচ ও সিরামিকসহ বিভিন্ন শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
সিপিডির হিসাবে, শিল্প খাতে গ্যাসের ব্যবহার ১ হাজার ১৮৬ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে কমে ১ হাজার ১৪৮ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমেছে। একই সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন সূচকের প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমে ঋণাত্মক শূন্য দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
৩১ সূচকের ১৯টিতেই অবনতি
সিপিডির পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অর্থনীতির ৩১টি প্রধান সূচকের মধ্যে প্রবাসী আয় ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভসহ ১২টি সূচকে উন্নতি হয়েছে। বিপরীতে মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও মাথাপিছু ঋণসহ ১৯টি সূচকে অবনতি অথবা উদ্বেগজনক পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে।
সিপিডির ‘সংস্কার পর্যবেক্ষণ’-এর আওতায় সরকারের প্রায় ৩৬২টি উদ্যোগকে নয়টি ভাগে নিয়ে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি সুশাসনসংক্রান্ত ১০৫টি ঘটনাও পর্যালোচনা করা হয়েছে।
মূল্যস্ফীতি কমলেও চাপ রয়ে গেছে
সিপিডির পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ৮ দশমিক ৩ শতাংশে নেমেছে। একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ২ শতাংশে।
তবে মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮ দশমিক ২ শতাংশ হলেও প্রকৃত মজুরি এখনো নেতিবাচক অবস্থায় রয়েছে।
চলতি অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা হতে পারে বলেও পূর্বাভাস দিয়েছে সিপিডি।
কিছু উদ্যোগকে ইতিবাচক বলছে সিপিডি
সরকারের কয়েকটি উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে সিপিডি। এগুলোর মধ্যে রয়েছে করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি, ই-রিটার্নের পরিধি সম্প্রসারণ, রপ্তানিমুখী শিল্পে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা বাড়ানো, স্টার্টআপ তহবিল গঠন এবং কয়েকটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের উদ্যোগ।
সিপিডির মতে, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও শিল্প উৎপাদনের দুর্বলতা কাটাতে দ্রুত ও কার্যকর সংস্কার প্রয়োজন। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও দৃঢ় সিদ্ধান্ত ছাড়া দেশের অর্থনীতিকে টেকসই পুনরুদ্ধারের পথে নেওয়া কঠিন হবে।