জাতীয়
রাজধানীতে ২৪ ঘণ্টায় তিন স্থানে হামলা ও লুটপাট
রাজধানীর তিন এলাকায় ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও দখলের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান হাউজিংয়ে জমি দখলের চেষ্টা, মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ এফপি সেন্টারে হামলা ও লুটপাট এবং ইসিবি চত্বরে কনটেন্ট নির্মাতা সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
তিনটি ঘটনাতেই বিপুলসংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণ, স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত করা ও মালামাল লুটের অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব ঘটনায় কারা জড়িত এবং হামলার নেপথ্যে কারা ছিল, তা এখনো তদন্তাধীন। মিরপুরের ঘটনায় ইতোমধ্যে চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
মোহাম্মদপুরে জমি দখলের চেষ্টা
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধ এলাকার চাঁদ উদ্যান হাউজিংয়ে কয়েকশ লোক নিয়ে জমি দখলের চেষ্টা, হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। শনিবার সকাল ১০টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। স্থানীয় বাসিন্দাদেরও মারধর করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ঘটনায় মোহাম্মদপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন। তার দাবি, চাঁদ উদ্যান হাউজিংয়ের ৮ নম্বর সড়কে ভবনসহ ১১ কাঠা জমি তার মায়ের মালিকানাধীন। কিছুদিন ধরে মো. মোস্তাকের রহমান খোকন চৌধুরী স্থানীয় কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে জমিটি দখলের চেষ্টা করছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, ঘটনার সময় ২০০ থেকে ৩০০ লোক জমির সামনে এসে ভাঙচুর শুরু করে। বাধা দিলে স্থানীয়দের মারধর করা হয়। প্লটের ভেতরে থাকা অফিসকক্ষের তালা ভেঙে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, ল্যাপটপ, কম্পিউটার, চেয়ার, টেবিল, দরজা, জানালাসহ বিভিন্ন মালামাল নিয়ে যাওয়া হয়। পরে টিন ও বাঁশ দিয়ে প্লটটি ঘিরে দেওয়া হয়।
স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, হামলায় মোহাম্মদপুর থানার ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক নুরুল ইসলাম নান্নু এবং তার সঙ্গে থাকা কয়েকজন নেতাকর্মী নেতৃত্ব দিয়েছেন। তবে নুরুল ইসলাম অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, তিনি হামলা ও ভাঙচুরের বিষয়ে কিছু জানেন না।
মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল হালিম জানান, বেড়িবাঁধ এলাকায় একটি প্লট দখলের চেষ্টার খবর পেয়ে পুলিশ পাঠিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। জমিটির মালিকানা নিয়ে বিরোধ রয়েছে। আদালতের রায়ের মাধ্যমে মালিকানা নির্ধারণের পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি জমিতে যেতে পারবেন বলে জানান তিনি।
মিরপুরে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা ও লুটপাট
মিরপুরের ১ নম্বর সেকশনে বেসরকারি সংস্থা রাড্ডা এমসিএইচ এফপির কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। বৃহস্পতিবার রাতে প্রতিষ্ঠানটির চারটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, সেখান থেকে প্রায় ৪৫ লাখ টাকা মূল্যের আলট্রাসনোগ্রাম যন্ত্র, ১১ লাখ টাকা, জেনারেটর, তিনটি ফ্রিজ, তিনটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, চারটি কম্পিউটার, প্রিন্টার, টিকা দেওয়ার সরঞ্জাম, দুটি টেলিভিশনসহ বিভিন্ন মালামাল নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
হামলার পরও স্বাস্থ্যকর্মীরা চিকিৎসাসেবা ও টিকাদান কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। এমনকি ধ্বংসস্তূপের পাশেও স্থানীয় শিশুদের টিকা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আক্তার অভিযোগ করেন, শুক্রবার রাত ১২টা ৫ মিনিটের দিকে হামলা ও ভাঙচুর শুরু হয়। রাত আড়াইটার দিকে পুলিশকে খবর দেওয়া হলেও রাত ৩টা পর্যন্ত হামলা ও লুটপাট চলে। নিরাপত্তাকর্মীদের মারধর করে বেঁধে রাখা এবং তাদের মুঠোফোন কেড়ে নেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
পুলিশের কোনো অবহেলা ছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ। এ ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
ঘটনায় সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির জড়িত থাকার অভিযোগ উঠলেও তিনি তা অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, তিনি কিংবা বিএনপির কোনো নেতাকর্মী এ ঘটনায় জড়িত নন।
এ ঘটনায় মো. সোহেল, মো. জুয়েল, মো. জিহাদ হাসান ও মো. রাবিব নামে চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। লুট হওয়া দুটি গাড়ি ও মালামালও উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ইসিবিতে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা
রাজধানীর ইসিবি চত্বরে কনটেন্ট নির্মাতা সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। শনিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে এ ঘটনা ঘটে।
স্টুডিওর কর্মকর্তাদের অভিযোগ, প্রায় এক থেকে দেড়শ লোক সেখানে ঢুকে ভাঙচুর শুরু করে। হামলাকারীরা বিভিন্ন প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, মুঠোফোন ও মানিব্যাগ নিয়ে যায়। কয়েকজনের হাতে ধারালো অস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্র ছিল বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক হওয়ায় স্টুডিওর কর্মকর্তারা টয়লেটে আত্মগোপন করেন। সেখানেও গিয়ে হামলাকারীরা অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে তাদের মুঠোফোন ও মানিব্যাগ নিয়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এ ঘটনায় স্টুডিওর কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী আহত হননি।
ঘটনার সময় ঢাকায় ছিলেন না সালমান মুক্তাদির। খবর পেয়ে ঢাকায় ফিরে তিনি স্টুডিও পরিদর্শন করেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচারে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র তুলে ধরেন।
সালমান মুক্তাদির অভিযোগ করেছেন, চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোর প্রতিশোধ হিসেবে স্টুডিওতে হামলা চালানো হয়েছে এবং এর সঙ্গে বিএনপির লোকজন জড়িত। তবে তার এই অভিযোগের বিষয়ে বিএনপির সংশ্লিষ্ট কারও বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
তিনি জানান, স্টুডিওতে বিভিন্ন গ্রাহকের ধারণ করা ভিডিও, যন্ত্রপাতি ও কাজের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ ছিল। সেগুলো নিয়ে যাওয়ায় বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।
সালমান মুক্তাদির বলেন, হামলার কারণে তিনি সৃজনশীল কাজ থেকে সরে যাবেন না। বরং আবার নতুন করে কাজ শুরু করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি। একই সঙ্গে ঘটনায় মামলা করার কথাও জানিয়েছেন।
তিন ঘটনায় তদন্ত
রাজধানীর তিন এলাকায় ঘটে যাওয়া এসব ঘটনায় ভিন্ন ভিন্ন অভিযোগ সামনে এসেছে। কোথাও জমি দখলের চেষ্টা, কোথাও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে হামলা ও লুটপাট এবং কোথাও সৃজনশীল কাজের স্টুডিওতে হামলার অভিযোগ উঠেছে।
মিরপুরের ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তদন্ত চলছে। মোহাম্মদপুর ও ইসিবির ঘটনায়ও হামলাকারীদের পরিচয়, অভিযোগের সত্যতা এবং ঘটনার নেপথ্যের কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।