জাতীয়
পিংক বাসে যাত্রী বেড়েছে দ্বিগুণ, তবুও দৈনিক ভর্তুকি ৬০ হাজার টাকা
নারীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় যাতায়াত নিশ্চিত করতে চলতি বছরের আগস্টে রাজধানীসহ তিন জেলায় ‘পিংক বাস’ নামে বিশেষায়িত গণপরিবহন সেবা চালু করে সরকার। শুরুতে যাত্রীসংখ্যা কম থাকলেও এক মাসের ব্যবধানে তা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। কর্মদিবসে পরিচালিত এই বাসের অধিকাংশ যাত্রীই কর্মজীবী নারী ও ছাত্রী। তবে অফিস সময়ের বাইরে বাসগুলোতে যাত্রীসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কম থাকায় দিনের বড় একটি সময় বাসগুলো প্রায় ফাঁকাই থাকছে। এতে যাত্রীদের কাছ থেকে আয় হচ্ছে তুলনামূলক কম, বিপরীতে পরিচালন ব্যয় মেটাতে সরকারকে প্রতিদিন গুনতে হচ্ছে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা ভর্তুকি।
বিআরটিসি সূত্র জানায়, গত ১৮ আগস্ট বিশেষায়িত নারী বাস সার্ভিসের উদ্বোধন করা হয়। পরদিন ১৯ আগস্ট থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২০ দিন এই সেবা চালু ছিল। এ সময়ে বাসগুলো মোট ২৭২টি ট্রিপ দিয়েছে। প্রথম দিকে প্রতিদিন যাত্রীসংখ্যা ছিল প্রায় সাড়ে ৬০০। এক মাসের মধ্যে তা বেড়ে প্রায় ১ হাজার ৩০০ জনে পৌঁছেছে। অর্থাৎ অল্প সময়ের মধ্যেই যাত্রীসংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ১৯ আগস্ট থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২০ দিনে পিংক বাসে প্রায় ২১ হাজার যাত্রী যাতায়াত করেছেন। প্রতিদিন গড়ে যাত্রী ছিল প্রায় ১ হাজার ৪০ জন। সেবা চালুর প্রথম সপ্তাহে দৈনিক যাত্রীসংখ্যা এক হাজারের নিচে থাকলেও ধীরে ধীরে তা বাড়তে থাকে। এই সময়ে যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়া বাবদ আয় হয়েছে প্রায় ৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে আয় হয়েছে প্রায় ১৫ হাজার টাকা। বিপরীতে একই সময়ে বাস পরিচালনায় সরকারের ভর্তুকি দিতে হয়েছে প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা। সে হিসাবে প্রতিদিন ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা।
প্রথম ধাপে রাজধানী ঢাকা, বগুড়া ও চট্টগ্রামের ১৩টি রুটে মোট ১৪টি পিংক বাস নামানো হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকার ১০টি রুটে একটি একতলা ও নয়টি দ্বিতল বাস, বগুড়ার দুটি রুটে দুটি দ্বিতল বাস এবং চট্টগ্রামের একটি রুটে দুটি দ্বিতল বাস চলাচল করছে।
বিআরটিসি কর্মকর্তারা জানান, সকাল ৭টা থেকে ৮টা ৪০ মিনিটের মধ্যে বাসগুলো বিভিন্ন রুটে প্রথম ট্রিপ শুরু করে। এরপর ঢাকায় বিকেল ৪টা থেকে সাড়ে ৪টার মধ্যে এবং বগুড়া ও চট্টগ্রামে দুপুর ১টা ও বিকেল ৩টার দিকে বাসগুলো আবার চলাচল করে। ফলে দিনের বড় একটি সময় বাসগুলো ডিপোতে অলস অবস্থায় থাকে। যাত্রীসংখ্যা কম থাকায় নির্ধারিত সময়ের বাইরে বাস চালানোর সুযোগও সীমিত।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী ‘আমার দেশ’কে বলেন, বিআরটিসির মহিলা বাস সার্ভিস চালু করা একটি অদূরদর্শী উদ্যোগ। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যথাযথ পরামর্শ কিংবা প্রয়োজনীয় জরিপ ছাড়াই এ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এ কারণে ভবিষ্যতে প্রকল্পটি মুখ থুবড়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, শুধু নারীদের জন্য আলাদা বাস সার্ভিস চালু করাকে কার্যকর সমাধান হিসেবে দেখা যায় না। এটি একটি অকার্যকর প্রকল্প। বাসের রং পরিবর্তন করে এবং নতুন নাম দিয়ে পরিচালনা করলেই নারীবান্ধব গণপরিবহন নিশ্চিত হবে না। বরং সব ধরনের গণপরিবহনকেই নারী ও শিশুবান্ধব করা প্রয়োজন।
তবে বিআরটিসির ডিজিএম (অপারেশন) শুকদেব ঢালী বলেন, মহিলা বাস সার্ভিসের ক্ষেত্রে বর্তমানে লাভ-লোকসানের হিসাবের চেয়ে সেবার বিষয়টিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নারী যাত্রীদের মধ্যে এই বাস নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। মাত্র এক মাসের মধ্যে যাত্রীসংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। সামনে যাত্রীসংখ্যা আরও বাড়বে বলে আশা করছেন তারা।
পিংক বাস নিয়ে যাত্রীদের অভিযোগও রয়েছে। উদ্বোধনের সময় বিআরটিসি জানিয়েছিল, ঢাকা মহানগরীর ১০৬টি, চট্টগ্রামের ১২টি এবং বগুড়ার ১৬টি স্পট থেকে যাত্রী ওঠানো-নামানো হবে। কিন্তু অনেক যাত্রীর অভিযোগ, নির্ধারিত স্টপেজে অপেক্ষমাণ যাত্রী না থাকলে বাস থামানো হচ্ছে না। এতে নিয়মিত যাত্রীদের বাইরে অন্যরা অনেক সময় বাসে উঠতে পারছেন না।
যাত্রীদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে চালকরা রুটের শুরু থেকে যাত্রী নিয়ে সরাসরি গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। ফলে মাঝপথের স্টপেজগুলো থেকে যাত্রী ওঠার সুযোগ কমে যায়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিআরটিসির এক কর্মকর্তা জানান, নারী চালকদের একটি অংশ এখনো প্রতিটি স্টপেজে বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানোর বিষয়ে পুরোপুরি অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারেননি। ব্যস্ত সড়কে অন্যান্য বাসকে পাশ কাটিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় বাস থামানোর ক্ষেত্রে তাদের অভিজ্ঞতা তুলনামূলক কম। তবে সময়ের সঙ্গে তারা এ বিষয়ে অভ্যস্ত হয়ে উঠবেন বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে যাত্রীরা বলছেন, পিংক বাসের নির্দিষ্ট ও নির্ভরযোগ্য সময়সূচি না থাকায় অনেকেই এই সেবা ব্যবহার করতে পারছেন না। কখন বাস ছাড়বে কিংবা কোন স্টপেজে কখন পৌঁছাবে—এ বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য না থাকায় যাত্রীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। আবার দিনে মাত্র দুই বেলা বাস চলাচল এবং নির্দিষ্ট কিছু স্টপেজে থামার কারণেও অনেক নারী এই বাস ব্যবহারে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
ফার্মগেট থেকে মতিঝিলে কর্মস্থলে যাতায়াতকারী লায়লা ইয়ামিন (৪০) বলেন, আগে তিনি সাধারণ গণপরিবহনে যাতায়াত করতেন। পিংক বাস চালুর পর থেকে প্রতিদিন এই বাসেই কর্মস্থলে যাচ্ছেন। শুরুতে সময়সূচি নিয়ে কিছুটা সমস্যা হলেও এখন বিষয়টি অনেকটা সহজ হয়েছে। তার ভাষ্য, মিরপুর-১২ থেকে আসা বাসটি সকাল সাড়ে ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে ফার্মগেট এলাকায় পৌঁছায়। ফলে অনেক সময় তাকে আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।
গত বুধবার কারওয়ান বাজার এলাকায় পিংক বাসে ওঠার জন্য এক নারীকে দৌড়াতে দেখা যায়। কিন্তু সেখানে নির্ধারিত স্টপেজ না থাকায় তিনি শেষ পর্যন্ত সাধারণ একটি বাসে ওঠেন। এ সময় পিংক বাসের যাত্রীরা জানান, রুটের আরও বেশি জায়গায় স্টপেজ থাকলে অনেক নারী এই বাস ব্যবহার করতে পারতেন।
রেহানা পারভীন নামে এক যাত্রী বলেন, নারী চালকরা তুলনামূলক বেশি সতর্কতার সঙ্গে বাস চালানোর কারণে অনেক সময় বাসের গতি কিছুটা কম মনে হয়।
অন্যদিকে শনির আখড়া-মতিঝিল রুটে পিংক বাস চালানো সুপ্রিয়া কুণ্ডু বলেন, নারী যাত্রীদের মধ্যে এই বাস নিয়ে আগ্রহ রয়েছে। দিন দিন যাত্রীসংখ্যা আরও বাড়বে বলে তিনি আশা করেন।
মতিঝিল ডিপোতে গিয়ে দেখা যায়, নতুন বাজার, তালতলা, মিরপুর, মিরপুর-১০, মিরপুর-১২, মোহাম্মদপুর ও নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা পিংক বাসগুলো সকালের ট্রিপ শেষ করে ডিপোতে অবস্থান করছে। এসব বাস বিকেলে আবার নির্ধারিত রুটে বের হয়। বিকেলের ট্রিপ শেষে যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছে দিয়ে বাসগুলো আবার ডিপোতে রাখা হয়। ফলে সকালের ও বিকেলের নির্দিষ্ট সময় ছাড়া দিনের বড় একটি অংশ বাসগুলো কার্যত ব্যবহারহীন অবস্থায় থাকে।
নারী চালক বেড়ে ২৬ জন
পিংক বাস পরিচালনায় নারী চালকের সংখ্যাও বাড়ানো হচ্ছে। প্রশিক্ষণ শেষে দ্বিতীয় ধাপে গত বৃহস্পতিবার আরও ১০ জন নারী চালক কাজে যোগ দিয়েছেন। এর ফলে বর্তমানে নারী চালকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৬ জনে। তৃতীয় ধাপে আরও নারী চালক নিয়োগের জন্য চলতি মাসে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। ভবিষ্যতে ইলেকট্রিক বাস পরিচালনার জন্য নারী চালকদের প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
বহরে যুক্ত হবে আরও ১০০ আধুনিক বাস
পিংক বাসের সেবা আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ভবিষ্যতে এই বহরে আরও ১০০টি অত্যাধুনিক বাস যুক্ত করা হবে। নতুন বাসগুলো তুলনামূলক ছোট আকারের হবে। এতে ওয়াই-ফাই, সিসিটিভি ক্যামেরা, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (এসি) এবং অন্যান্য আধুনিক সুবিধা থাকবে।
তবে নতুন বাস যুক্ত করার আগে বর্তমান সেবার সময়সূচি, স্টপেজ, রুট ব্যবস্থাপনা এবং যাত্রীসংখ্যা বাড়ানোর বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ যাত্রীসংখ্যা বাড়লেও বর্তমানে ভাড়া থেকে পাওয়া আয়ের তুলনায় পরিচালন ব্যয় অনেক বেশি। ফলে প্রতিদিন বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিয়ে সেবাটি চালিয়ে যেতে হচ্ছে। আগামী দিনে নতুন বাস ও আধুনিক সুবিধা যুক্ত হওয়ার পর পিংক বাসের যাত্রীসংখ্যা ও আয় কতটা বাড়ে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।