রাজনীতি

আবু সাঈদের রক্ত থেকে রাজপথ, ছাত্রদলের নেতৃত্বে উত্তরবঙ্গের বড় আশা


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬, ০৪:৩৯ পিএম

আবু সাঈদের রক্ত থেকে রাজপথ, ছাত্রদলের নেতৃত্বে উত্তরবঙ্গের বড় আশা
ছবি: সংগৃহীত

২০২৪ সালের ১৬ জুলাই। রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে দুপুরের তীব্র রোদ উপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক যুবক। দুই হাত দুই দিকে প্রসারিত করে বুক চিতিয়ে পুলিশের বন্দুকের নলের সামনে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন তিনি। মুহূর্তেই সেই দৃশ্য ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া-সবখানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে তার সাহসিকতা। তিনি শহীদ আবু সাঈদ, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রতীকী চরিত্র।

নিজের বুকের রক্ত দিয়ে আবু সাঈদ যে আত্মত্যাগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন, তা শুধু জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের ইতিহাসেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তার আত্মত্যাগ উত্তরবঙ্গের তরুণদের মধ্যেও নতুন রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাস ও অধিকার আদায়ের প্রেরণা তৈরি করে। রংপুরের মাটিতে দাঁড়িয়ে তার সেই প্রতিরোধের মুহূর্ত পরিণত হয় গণআন্দোলনের অন্যতম প্রতীকে। একই সঙ্গে আবারও সামনে আসে উত্তরবঙ্গের মানুষের দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতার ইতিহাস।

আবু সাঈদের আত্মত্যাগ যখন রংপুরসহ উত্তরবঙ্গের মানুষের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা তৈরি করছিল, তখন ঢাকার রাজপথেও আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ছিলেন উত্তরবঙ্গের আরেক তরুণ ছাত্রনেতা শামীম আক্তার শুভ। কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার সন্তান শুভ বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের ১ নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

রৌমারীর প্রত্যন্ত জনপদ থেকে উঠে আসা শামীম আক্তার শুভর ছাত্ররাজনীতির পথচলা ছিল নানা প্রতিকূলতায় ঘেরা। বিরোধী রাজনৈতিক দলের ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীদের ওপর মামলা, হামলা, গ্রেপ্তার ও পুলিশি হয়রানির অভিযোগের মধ্যেও তিনি সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন বলে তার অনুসারীদের দাবি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো দেশের গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থেকে দীর্ঘ সময় ধরে তিনি আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা রাখার চেষ্টা করেছেন।

রাজনীতির মাঠে তার পথচলায় এসেছে একের পর এক বাধা। বিভিন্ন সময়ে হামলা-মামলা, গ্রেপ্তার ও হয়রানির অভিযোগের মুখোমুখি হলেও সংগঠনের কর্মসূচিতে তার উপস্থিতি অব্যাহত ছিল বলে দাবি করেন তার সমর্থকেরা। তাদের ভাষ্য, প্রতিকূল পরিস্থিতি তাকে রাজপথ থেকে সরিয়ে দিতে পারেনি; বরং দীর্ঘদিনের সক্রিয়তার মধ্য দিয়ে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের কাছে তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণআন্দোলনের সময়ও ঢাকার রাজপথে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন শুভ। রংপুরে যখন আবু সাঈদের আত্মত্যাগ আন্দোলনের অন্যতম প্রতীকে পরিণত হচ্ছিল, তখন রাজধানীতে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে মাঠে থেকে আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নেন তিনি। ফলে উত্তরবঙ্গের সীমান্তঘেঁষা একটি উপজেলা থেকে উঠে আসা এই তরুণ নেতা ধীরে ধীরে জাতীয় পর্যায়ের ছাত্ররাজনীতিতে নিজের অবস্থান তৈরি করেন।

ছাত্রদলের রাজনীতিতে উত্তরবঙ্গের অবদান নতুন নয়। এই অঞ্চলের অসংখ্য নেতাকর্মী দীর্ঘদিন ধরে সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ে আন্দোলন-সংগ্রাম ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় রয়েছেন। তবে কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতৃত্বে উত্তরবঙ্গের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই এক ধরনের আক্ষেপ রয়েছে বলে দাবি তৃণমূলের নেতাকর্মীদের।

সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রায় সাড়ে তিন দশক আগে রুহুল কবির রিজভী ও হাবিব-উন-নবী খান সোহেলের পর উত্তরবঙ্গ থেকে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের শীর্ষ পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য নেতৃত্বের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কমে গেছে। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলের নেতাকর্মীদের মধ্যে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে নিজেদের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে প্রত্যাশা তৈরি হলেও তা পূরণ হয়নি-এমন অভিযোগ রয়েছে।

এই সময়ের মধ্যে কুড়িগ্রাম, রংপুর, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, নীলফামারী, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়সহ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার অসংখ্য নেতাকর্মী ছাত্রদলের রাজনীতিতে সক্রিয় থেকেছেন। আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নেওয়া থেকে শুরু করে সাংগঠনিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন-বিভিন্ন পর্যায়ে তাদের ভূমিকা রয়েছে। অনেকে মামলা, হামলা ও গ্রেপ্তারের মতো প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন বলেও দাবি করেন সংশ্লিষ্টরা।

তৃণমূলের নেতাকর্মীদের একটি অংশের ভাষ্য, আন্দোলন-সংগ্রামের সময় তারা সামনে থাকলেও সাংগঠনিক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অনেক সময় পিছিয়ে পড়েছেন। তাদের ভাষায়, ‘ত্যাগের জায়গায় উত্তরবঙ্গ এগিয়ে থাকলেও মূল্যায়নের ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ে।’ দীর্ঘদিনের এই অনুভূতিই এখন কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের নেতৃত্ব নিয়ে নতুন প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছে।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর উত্তরবঙ্গের রাজনৈতিক বাস্তবতায়ও নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে। শহীদ আবু সাঈদের আত্মত্যাগ উত্তরবঙ্গের তরুণদের কাছে যেমন সাহস ও প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে উঠেছে, তেমনি কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বে এ অঞ্চলের প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নটিও নতুন করে সামনে এসেছে।

তৃণমূলের নেতাকর্মীদের অনেকে মনে করছেন, দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকা এবং সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা অর্জন করা উত্তরবঙ্গের একজন ত্যাগী নেতাকে এবার কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া প্রয়োজন। আর সেই আলোচনায় উঠে আসছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শামীম আক্তার শুভর নাম।

তার সমর্থকদের দাবি, শুভকে এখন শুধু রৌমারী কিংবা কুড়িগ্রামের একজন নেতা হিসেবে দেখলে তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিধি পুরোপুরি মূল্যায়ন করা হবে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজপথে দীর্ঘদিনের সক্রিয়তা, সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা এবং আন্দোলন-সংগ্রামের অভিজ্ঞতার কারণে কেন্দ্রীয় ছাত্ররাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের জন্য তিনি নিজেকে প্রস্তুত করেছেন বলে মনে করেন তার অনুসারীরা।

কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক পদে শামীম আক্তার শুভর নাম আলোচনায় আসাকে তাই শুধু একজন ব্যক্তির রাজনৈতিক প্রত্যাশা হিসেবে দেখছেন না উত্তরবঙ্গের তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মী। তাদের মতে, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক নেতৃত্বের প্রত্যাশাও।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের ১ নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করার অভিজ্ঞতাকে শুভর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে দেখছেন তার সমর্থকেরা। দেশের অন্যতম প্রধান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্ররাজনীতির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা এবং দীর্ঘ সময় রাজপথে সক্রিয় থাকার অভিজ্ঞতা তাকে কেন্দ্রীয় পর্যায়ের দায়িত্ব পালনের জন্য যোগ্য করে তুলেছে-এমনটাই তাদের দাবি।

তাদের মতে, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক পদে উত্তরবঙ্গের একজন ত্যাগী নেতার মূল্যায়ন হলে তা শুধু একজন ব্যক্তির রাজনৈতিক অগ্রযাত্রা হবে না; বরং দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে অপেক্ষায় থাকা উত্তরবঙ্গের হাজারো নেতাকর্মীর প্রত্যাশারও প্রতিফলন ঘটবে।

শহীদ আবু সাঈদের আত্মত্যাগ রংপুর তথা উত্তরবঙ্গকে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসে নতুনভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে তার বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্য আজও আন্দোলনের সাহস ও প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে আলোচিত।

অন্যদিকে ঢাকার রাজপথে শামীম আক্তার শুভর মতো উত্তরবঙ্গের তরুণ ছাত্রনেতাদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে বলে দাবি তাদের সমর্থকদের। তাদের প্রত্যাশা, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের নেতৃত্ব নির্ধারণের ক্ষেত্রে এবার উত্তরবঙ্গের ত্যাগী ও সক্রিয় নেতাদের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।

তৃণমূলের নেতাকর্মীদের বক্তব্য, আবু সাঈদের আত্মত্যাগে যে উত্তরবঙ্গ জাতীয় আন্দোলনের ইতিহাসে নতুন করে আলোচনায় এসেছে, সেই উত্তরবঙ্গ আর কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকতে চায় না। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা শামীম আক্তার শুভকে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে মূল্যায়ন করা হলে তা উত্তরবঙ্গের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটাবে বলে মনে করেন তার অনুসারীরা।

রৌমারীর সীমান্তঘেঁষা প্রত্যন্ত জনপদ থেকে উঠে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজপথে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করেছেন শামীম আক্তার শুভ। তার রাজনৈতিক পথচলায় যেমন ব্যক্তিগত সংগ্রাম ও সাংগঠনিক তৎপরতার গল্প রয়েছে, তেমনি এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উত্তরবঙ্গের দীর্ঘদিনের নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা।

শহীদ আবু সাঈদ নিজের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে উত্তরবঙ্গের সাহস ও প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে উঠেছেন। আর সেই আত্মত্যাগের পর উত্তরবঙ্গের ছাত্ররাজনীতিতে এখন নতুন প্রশ্ন-কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে কি এবার এ অঞ্চলের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটবে?

শামীম আক্তার শুভ যদি শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পান, তাহলে তার সমর্থকদের দৃষ্টিতে এটি শুধু একজন তরুণ নেতার রাজনৈতিক উত্থান হবে না; বরং উত্তরবঙ্গের দীর্ঘদিনের নেতৃত্বের প্রত্যাশা পূরণেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠতে পারে।

আবু সাঈদের আত্মত্যাগ, উত্তরবঙ্গের তৃণমূল নেতাকর্মীদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং ঢাকার রাজপথে সক্রিয় তরুণ নেতৃত্ব-এই তিনটি বিষয়কে সামনে রেখে এখন কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের নেতৃত্ব নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন উত্তরবঙ্গের অনেক নেতাকর্মী। শেষ পর্যন্ত নেতৃত্ব নির্বাচনে তাদের এই প্রত্যাশা কতটা প্রতিফলিত হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।