সারাদেশ

নদীর বালু তোলার প্রতিবাদ করায় গ্রামবাসীর ওপর হামলা, অন্তত ১০ জন গুলিবিদ্ধ


সারাদেশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০:২৯ এএম

নদীর বালু তোলার প্রতিবাদ করায় গ্রামবাসীর ওপর হামলা, অন্তত ১০ জন গুলিবিদ্ধ
ছবি: সংগৃহীত

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে মেঘনা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের প্রতিবাদ করায় চরলাপাং গ্রামের নিরীহ গ্রামবাসীর ওপর সশস্ত্র হামলা ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। রোববার সকালে এ হামলায় কমপক্ষে ১০ জন গুলিবিদ্ধসহ প্রায় ২০ জন আহত হন। ঘটনায় পুরো এলাকায় চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

আহত গুলিবিদ্ধরা হলেন—সিয়াম আহমেদ (১৬), ইব্রাহিম খলিল (৩০), নূরুল আমীন (৪০), রূপ মিয়া (৪৫), স্বপন মিয়া (৫০), শরিফ মিয়া (৩০), জুলাস মিয়া (৫০), শাকাল মিয়া (৫০), সামত মিয়া (৪০) ও সফর মিয়া (৫০)। আহতদের প্রথমে নবীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স-এ নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে গুরুতর আহতদের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদর হাসপাতাল-এ পাঠানো হয়। অন্য আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

নবীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক হাবিব রহমান জানান, দুপুরের দিকে ছররা গুলিতে আহত প্রায় ১০ থেকে ১৩ জন রোগী জরুরি বিভাগে আসেন। তাদের অবস্থা বিবেচনায় উন্নত চিকিৎসার জন্য জেলা সদর হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে।

হামলার খবর পেয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (নবীনগর সার্কেল) পিয়াস বসাক এবং নবীনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চরলাপাং গ্রাম-এর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া মেঘনা নদী থেকে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী চক্র অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে আসছে। এর ফলে চরলাপাংসহ আশপাশের গ্রামগুলো মারাত্মক নদীভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে। বারবার প্রতিবাদ করেও গ্রামবাসী কোনো প্রতিকার পাচ্ছিল না।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অবৈধ বালু ব্যবসায়ীদের পক্ষে থাকা অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা গ্রামবাসীর জমি থেকে জোরপূর্বক ফসল কেটে নিয়ে যাচ্ছে। পাশ্ববর্তী নরসিংদীর রায়পুরা ইউনিয়নের মির্জাপুর এলাকার একটি প্রভাবশালী মহল কয়েক মাস ধরে চরলাপাং গ্রামের কাছাকাছি এলাকা থেকে বালু উত্তোলন করছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, নাসিরাবাদের ব্যবসায়ী শাহদাদ হোসেন পায়েল-এর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান মেসার্স সামিউল ট্রেডার্স এই বালুমহালের ইজারা পায়। তিনি শ্যামগ্রাম ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি। উপজেলা বিএনপি দুই ভাগে বিভক্ত হলেও উভয় পক্ষের কিছু প্রভাবশালী নেতা এই বালু ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।

গ্রামবাসীদের দাবি, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ইজারার শর্ত ভঙ্গ করে ও নির্ধারিত সীমানা অতিক্রম করে দিন-রাত বালু উত্তোলন চলছে। এতে চরলাপাং, সোনাবালুয়া ঘাট, এমপি টিলা, নূরজাহানপুর, ঈদগাহ মাঠ ও কবরস্থানসহ বিস্তীর্ণ এলাকা নদীতে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

গ্রামবাসী আলী নেওয়াজ, জসিম মিয়া, জামাল মিয়া, তৌহিদ মিয়া ও জামাল হোসেন অভিযোগ করে বলেন, বিএনপি ও সাবেক ক্ষমতাসীন দলের কিছু নেতার ছত্রচ্ছায়ায় এই বালু চক্র দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ কার্যক্রম চালাচ্ছে। প্রতিবাদ করলেই গুলি, হামলা ও ভয়ভীতি দেখানো হয়। লাগামহীন বালু উত্তোলনের কারণে বহু পরিবার বসতভিটা হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে।

এ বিষয়ে মেসার্স সামিউল ট্রেডার্সের মালিক শাহদাদ হোসেন পায়েলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি এবং পাঠানো খুদে বার্তারও জবাব দেননি।

নবীনগর পশ্চিম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নূরে আলম বলেন, প্রশাসনের নজরদারি এড়িয়ে দীর্ঘদিন ধরে নদীর পাড় কাটা হচ্ছে। ফসলি জমি ও বসতভিটা হুমকিতে পড়ায় গ্রামবাসী প্রতিবাদ করলে তাদের ওপর গুলি চালানো হয়-এটি ভয়াবহ ও অমানবিক। তিনি অবৈধ বালু ব্যবসা বন্ধ ও ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেন।

নবীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদুল হাসান বলেন, পুলিশ ঘটনাস্থলে মোতায়েন করা হয়েছে। দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নবীনগর থানার ওসি রফিকুল ইসলাম জানান, পুলিশ যাওয়ার আগেই হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। বর্তমানে পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং নতুন করে সংঘর্ষ এড়াতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ (নবীনগর) আসনের সংসদ সদস্য এম. এ. মান্নান বলেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বালু সন্ত্রাসীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।