সারাদেশ
দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেল বেনাপোল পিকনিক ট্রাজেডির ১২ বছর
দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেল বেনাপোলের সেই হৃদয়বিদারক পিকনিক ট্রাজেডির ১২ বছর। ২০১৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি শিক্ষা সফর শেষে ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো নয় শিশুশিক্ষার্থীর স্মৃতি আজও এলাকাবাসীর চোখ ভিজিয়ে দেয়।
নিহত শিশুদের স্মরণে বেনাপোল পৌরসভা উদ্যোগে বেনাপোল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়-এর সামনে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছিল। স্মৃতিস্তম্ভটিতে বুকে তীরবিদ্ধ অবস্থায় উড়তে থাকা নয়টি কবুতরের প্রতীক স্থাপন করা হয়েছে, যা নয়টি নিষ্পাপ প্রাণের প্রতিচ্ছবি। পাশে খোদাই করা রয়েছে হৃদয়ছোঁয়া বাক্য- “আমার বর্ণমালা তুমি ভালো থেকো”।
আজ রবিবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার ১২ বছর পূর্ণ হলেও এবার দিনটি উপলক্ষে কোনো আলোচনা সভা, শোক র্যালি বা মিলাদ মাহফিলের আয়োজন হয়নি। শুধু পৌরসভার পক্ষ থেকে স্মৃতিস্তম্ভে ফুল দিয়ে আনুষ্ঠানিকতা পালন করা হয়। এতে স্থানীয়দের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রতিবছর এই দিনে বেনাপোল পৌরসভা ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ, শোক র্যালি, কালো পতাকা উত্তোলন, আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হতো। কিন্তু এবার কোনো কর্মসূচি না থাকায় নিহত শিশুদের পরিবার ও এলাকাবাসীর বেদনা আরও গভীর হয়েছে।
বেনাপোল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা আম্বিয়া খাতুন বলেন, “আগে প্রতিবছর পৌরসভা থেকে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। স্কুল থেকেও মিলাদ ও আলোচনা সভা করা হতো। এবার নির্বাচন ও সরকারি ছুটির কারণে সমন্বয় করা সম্ভব হয়নি। তাই আয়োজন করা যায়নি।”
সকাল ১০টার দিকে বেনাপোল পৌরসভার সচিব সাইফুল ইসলাম বিশ্বাসের নেতৃত্বে পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা একটি সংক্ষিপ্ত শোক র্যালি বের করে স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।
এ বিষয়ে পৌরসভার সচিব বলেন, “প্রতিবছরের মতো এবারও পৌরসভা আমাদের দায়িত্ব পালন করেছে। অন্য সংগঠন বা স্কুল কর্তৃপক্ষ আয়োজন না করলে আমাদের বলার কিছু নেই।”
বেনাপোল নাগরিক কমিটির সদস্য মোস্তাক আহমেদ স্বপন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “দিন দিন আমরা স্মৃতিকে ভুলে যাচ্ছি। আগে হাজার হাজার মানুষ এই দিনে অংশ নিত। এবার প্রশাসন বা স্কুল কমিটির মনেই নেই দিনটির কথা।”
উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বেনাপোল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শিক্ষা সফরে মুজিবনগর যান। সফর শেষে চৌগাছা হয়ে বেনাপোলে ফেরার পথে যশোরের চৌগাছা উপজেলার ঝাউতলা কাঁদবিলা পুকুরপাড় এলাকায় তাদের বহনকারী যানবাহনটি দুর্ঘটনায় পতিত হয়। এতে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারায় সাতজন শিশু শিক্ষার্থী এবং আহত হয় আরও ৪৭ জন।
নিহতরা হলেন—বেনাপোল পৌরসভার ছোটআঁচড়া গ্রামের সৈয়দ আলীর দুই মেয়ে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী সুরাইয়া (১০) ও তার বোন তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী জেবা আক্তার (৮), ইউনুস আলীর মেয়ে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী মিথিলা (১০), রফিকুল ইসলামের মেয়ে চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী রুনা আক্তার মীম (৯), লোকমান হোসেনের ছেলে চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র শান্ত (৯), গাজীপুর গ্রামের সেকেন্দার আলীর ছেলে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র সাব্বির হোসেন (১০) এবং নামাজ গ্রামের হাসান আলীর মেয়ে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী আঁখি (১১)।
দুর্ঘটনার ১৩ দিন পর ঢাকার ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল-এ চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় ছোটআঁচড়া গ্রামের মনির হোসেনের ছেলে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র ইকরামুল (১১)। সর্বশেষ ৩২ দিন পর, ১৯ মার্চ একই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় একই গ্রামের ইদ্রিস আলীর ছেলে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইয়ানুর রহমান (১১)।
বারো বছর পেরিয়ে গেলেও বেনাপোলবাসীর হৃদয়ে সেই ট্রাজেডির ক্ষত এখনো শুকায়নি। স্মৃতিস্তম্ভের নীরব কবুতরগুলো যেন আজও প্রশ্ন করে—আমরা কি সত্যিই আমাদের শিশুদের স্মৃতি ধরে রাখতে পারছি?