সারাদেশ
সিটি কর্পোরেশনের পর এবার বগুড়ায় উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, তৈরি আইনের খসড়া
বগুড়া শহর ও এর আশপাশের এলাকাকে পরিকল্পিত, আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব নগর হিসেবে গড়ে তুলতে নতুন একটি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ‘বগুড়া উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০২৬’-এর একটি খসড়া প্রণয়ন করেছে। খসড়ায় বগুড়া সিটি কর্পোরেশন এলাকা এবং সরকার নির্ধারিত সংলগ্ন অঞ্চলগুলোকে এই কর্তৃপক্ষের আওতাভুক্ত করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
সম্প্রতি দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বগুড়া পৌরসভাকে সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত করা হয়। এরপর প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসসংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) অনুমোদনের মাধ্যমে এ সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয় এবং গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে বগুড়া দেশের নতুন সিটি কর্পোরেশন হিসেবে কার্যক্রম শুরু করে।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দ্রুত নগরায়ণ, অপরিকল্পিত উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ ও প্রতিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, দুর্যোগ সহনশীল নগর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা, তথ্যপ্রযুক্তি ও পর্যটন খাতের বিকাশ এবং নাগরিক সুযোগ-সুবিধা সম্প্রসারণের লক্ষ্যেই এই উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
খসড়া আইনে বলা হয়েছে, সরকার প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে আইন কার্যকর হওয়ার তারিখ নির্ধারণ করবে। আইন কার্যকর হলে ‘বগুড়া উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’ নামে একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান গঠিত হবে।
১৭ সদস্যের প্রস্তাবিত কাঠামো
খসড়া অনুযায়ী, একজন চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে মোট ১৭ সদস্যের একটি কর্তৃপক্ষ গঠিত হবে। এতে সরকারের প্রেষণে নিয়োগ পাওয়া চারজন সদস্য ছাড়াও বগুড়ার জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, গণপূর্ত ও স্থাপত্য অধিদপ্তরের প্রতিনিধি, বগুড়া সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতিনিধি এবং একজন নির্বাহী পরিচালক থাকবেন।
নির্বাহী পরিচালক একইসঙ্গে সদস্যসচিবের দায়িত্বও পালন করবেন। চেয়ারম্যান হিসেবে সরকারের একজন অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা অথবা সরকার মনোনীত কোনো ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
নগর পরিকল্পনা ও নিয়ন্ত্রণে বিস্তৃত ক্ষমতা
খসড়া আইনে কর্তৃপক্ষকে নগর উন্নয়ন, পরিকল্পনা, নিয়ন্ত্রণ ও বাস্তবায়নের ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মহাপরিকল্পনা, কৌশলগত পরিকল্পনা ও বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) প্রণয়ন, ভূমি জরিপ ও গবেষণা পরিচালনা, তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন।
এছাড়া ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, ভবন নির্মাণের অনুমোদন ও তদারকি, ঝুঁকিপূর্ণ ও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং আবাসন খাতের অনিয়ম প্রতিরোধের ক্ষমতাও থাকবে এই কর্তৃপক্ষের হাতে।
সরকারি ও বেসরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন, জনসেবা ও অবকাঠামো উন্নয়নে সমন্বয় এবং নগর উন্নয়নের সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণের ভারসাম্য নিশ্চিত করাও এর দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
জলাশয় ও কৃষিজমি সংরক্ষণে গুরুত্ব
খসড়ায় বিশেষভাবে পরিবেশ, ঐতিহাসিক স্থাপনা, জলাশয়, কৃষিজমি, খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান ও উদ্যান সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সবুজায়ন, বনায়ন, সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলা এবং নাগরিক বিনোদনের সুযোগ সম্প্রসারণের বিষয়েও নির্দেশনা রাখা হয়েছে।
আইন লঙ্ঘনে শাস্তির বিধান
খসড়া আইনে বিভিন্ন ধরনের অপরাধের জন্য শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
মহাপরিকল্পনার বাইরে ভূমি ব্যবহার করলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড, ১০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
অনুমতি ছাড়া নিচু জমি ভরাট, জলাধারের স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি বা নদী-খাল-বিল-পুকুরসহ জলাশয়ের প্রবাহ ব্যাহত করলে প্রথমবার সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড বা দুই লাখ টাকা জরিমানা হতে পারে। একই অপরাধ পুনরায় সংঘটিত হলে দুই থেকে ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং দুই থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান প্রস্তাব করা হয়েছে।
এছাড়া অনুমোদিত নকশার বাইরে ভবন নির্মাণ করলে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের মন্তব্য
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) ও খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মতো বগুড়াতেও পৃথক উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠিত হলে নগর সম্প্রসারণ ও অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রম আরও সমন্বিতভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, এতে অপরিকল্পিত নগরায়ণ নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন আরও কার্যকর হবে। খসড়াটি ইতোমধ্যে মতামতের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। মতামত পাওয়ার পর এটি সংশোধন করে চূড়ান্ত করা হবে।