সারাদেশ

পর্যটকের ভিড় বাড়ছে, কিন্তু কুয়াকাটায় থমকে আছে পরিকল্পিত উন্নয়ন


সারাদেশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৫৮ পিএম

পর্যটকের ভিড় বাড়ছে, কিন্তু কুয়াকাটায় থমকে আছে পরিকল্পিত উন্নয়ন
ছবি: সংগৃহীত

সাগর আছে, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আছে, পর্যটকের আগ্রহও বাড়ছে-কুয়াকাটার পর্যটন সম্ভাবনার যেন কোনো কমতি নেই। একই সৈকত থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার বিরল সুযোগ, দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত এবং উপকূলীয় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকদের টেনে আনছে সাগরকন্যা কুয়াকাটায়। বিশেষ করে পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হওয়ায় কুয়াকাটায় পর্যটকের আনাগোনাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে পর্যটনের এই ক্রমবর্ধমান চাপ ও সম্ভাবনার সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং সমন্বিত ব্যবস্থাপনা এখনো পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি।

কুয়াকাটার একদিকে যেমন পর্যটন ব্যবসা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ছে, অন্যদিকে সমুদ্রভাঙন, অপরিকল্পিত স্থাপনা, জলাবদ্ধতা, যানজট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং পরিবেশগত ঝুঁকি ক্রমেই বড় হয়ে উঠছে। দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিত পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে কুয়াকাটাকে গড়ে তোলার উদ্যোগ থাকলেও সেই পরিকল্পনার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না হওয়ায় বিভিন্ন সমস্যা জটিল আকার ধারণ করছে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কুয়াকাটাকে একটি পরিকল্পিত পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে এক যুগেরও বেশি সময় আগে মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০১৪ সালের ৪ ডিসেম্বর এ-সংক্রান্ত মাস্টারপ্ল্যানের গেজেট প্রকাশ করা হয়। এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও পরিকল্পনার সব অংশ এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে পরিকল্পিত নগরায়ণ ও পর্যটন ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে ওঠা বিভিন্ন স্থাপনার মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়ে গেছে।

তবে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ধীরগতি থাকলেও কুয়াকাটায় পর্যটনকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেমে নেই। পর্যটকদের চাহিদাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে হোটেল, মোটেল, রেস্তোরাঁ, দোকান, পরিবহনসহ বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগও তৈরি হয়েছে। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব উন্নয়ন অনেক ক্ষেত্রেই একটি সমন্বিত পরিকল্পনার বাইরে বিচ্ছিন্নভাবে হয়েছে।

তাদের ভাষ্য, কোথাও হোটেল হয়েছে, কোথাও দোকান বা বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে উঠেছে। কিন্তু পর্যটন ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সংরক্ষণ, যোগাযোগব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিকসেবাকে একই পরিকল্পনার আওতায় এনে সমন্বিতভাবে উন্নয়ন করা হয়নি। ফলে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কুয়াকাটার বিদ্যমান অবকাঠামোর ওপর চাপও বাড়ছে।

বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও রয়েছে নানা ধরনের অনিশ্চয়তা। জমির মালিকানা, কাগজপত্র, জমির ব্যবহার, ভবন নির্মাণের অনুমোদন এবং উন্নয়নসংক্রান্ত বিভিন্ন বিধিনিষেধ নিয়ে জটিলতার কারণে অনেকেই নতুন বিনিয়োগে সতর্কতা অবলম্বন করছেন। জমি কেনার পর সেখানে কী ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে, কোন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমোদন নিতে হবে এবং অনুমোদন পেতে কত সময় লাগবে-এসব বিষয়ে স্পষ্টতা ও সময়সীমা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

কুয়াকাটার পর্যটনের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার সমুদ্রসৈকত। অথচ সেই সৈকতই এখন ক্রমাগত ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও বর্ষাকালে উত্তাল সাগরের ঢেউয়ে সৈকতের বিভিন্ন অংশ এবং সংলগ্ন বনাঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কোথাও সৈকতের প্রস্থ কমে যাচ্ছে, আবার কোথাও সৈকতসংলগ্ন পর্যটন অবকাঠামোও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।

সমুদ্রভাঙনের প্রভাব পড়ছে সৈকতকেন্দ্রিক ব্যবসার ওপরও। সৈকতের কাছাকাছি থাকা বিভিন্ন স্থাপনা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ভবিষ্যতে ভাঙনের কবলে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কা রয়েছে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।

পর্যটকদের অভিযোগও কম নয়। ছুটির দিন ও পর্যটন মৌসুমে কুয়াকাটায় হাজারো মানুষের সমাগম হলেও সৈকতে নিরাপদে হাঁটাচলা ও গোসলের ক্ষেত্রে নানা সমস্যা রয়েছে। বিশেষ করে জিরো পয়েন্টসংলগ্ন এলাকায় কংক্রিটের টুকরো, ইট, পাথর, ছেঁড়া জাল ও কাচের অংশ পড়ে থাকতে দেখা যায়। আবার ভাঙন রোধে ব্যবহৃত জিও ব্যাগ ও জিও টিউবও বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে রয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, এসব কারণে জোয়ারের সময় সমুদ্রে গোসল করতে গিয়ে পর্যটকদের আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটছে। শিশুদের জন্য পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এর পাশাপাশি খাবারের মান, পর্যাপ্ত পার্কিংয়ের অভাব, যানজট, জলাবদ্ধতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং অপরিকল্পিত স্থাপনা নিয়েও পর্যটকদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে।

পর্যটকদের প্রত্যাশা, কুয়াকাটার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রেখেই পর্যটনসেবার মান উন্নত করা হবে। তাদের মতে, প্রকৃতি কুয়াকাটাকে যে বিপুল সম্ভাবনা দিয়েছে, সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে শুধু পর্যটনকেন্দ্রিক ব্যবসা বাড়ালেই হবে না; প্রয়োজন নিরাপদ সৈকত, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, পর্যাপ্ত পার্কিং, কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনা।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের কলাপাড়া নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহ আলম জানান, সৈকতের ভাঙন রোধে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে একটি প্রকল্প প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদন ও বাস্তবায়ন করা হলে কুয়াকাটার সৈকতভাঙন স্থায়ীভাবে রোধ করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

পরিবেশকর্মী মো. নজরুল ইসলাম বলেন, কুয়াকাটার উন্নয়ন মানে শুধু বড় হোটেল নির্মাণ কিংবা নতুন সড়ক তৈরি নয়। পরিবেশ ও প্রতিবেশ, জীববৈচিত্র্য, ম্যানগ্রোভ বন, রাখাইন সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি, স্থানীয় ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং লোকজ সংস্কৃতিকেও উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ করতে হবে। একই সঙ্গে জমি আইন, পরিবেশ আইন, পর্যটন নীতি ও মাস্টারপ্ল্যানের মধ্যে সমন্বয় থাকা প্রয়োজন।

পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী হোসাইন আমির বলেন, কুয়াকাটার জন্য এখন প্রয়োজন বাস্তবসম্মত ও সমন্বিত উদ্যোগ। শুধু নতুন ভবন, হোটেল কিংবা সড়ক নির্মাণ করলেই পর্যটন উন্নয়ন হবে না। সৈকত রক্ষা, উপকূলীয় বন সংরক্ষণ, জলাবদ্ধতা নিরসন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং যানজট নিয়ন্ত্রণেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে মাস্টারপ্ল্যানের প্রয়োজনীয় অংশ দ্রুত বাস্তবায়ন এবং বিনিয়োগের অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ ও সময়সীমাবদ্ধ করা দরকার।

পর্যটন উন্নয়নকর্মী ও সাংবাদিক আনোয়ার হোসেন আনু বলেন, ১৯৯৮ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত প্রায় তিন দশকে কুয়াকাটায় সড়ক যোগাযোগ, পৌরসভা, ইন্টারনেট সেবা এবং পর্যটন মোটেলের অবকাঠামোসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু যে সৈকতকে কেন্দ্র করে এত আয়োজন, সেই সৈকতের উন্নয়ন ও সৌন্দর্য রক্ষায় কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। তার মতে, পরিকল্পনা গ্রহণ করতেই দীর্ঘ সময় চলে গেছে; এখন প্রয়োজন পরিকল্পনার বাস্তবায়ন।

কুয়াকাটার মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন ও ভবন নির্মাণের বিষয়ে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও কুয়াকাটা পৌর প্রশাসক মো. ইয়াসীড়ন সাদেক জানান, মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী বেড়িবাঁধের কাছাকাছি নির্ধারিত উচ্চতার বেশি ভবন নির্মাণ করা যাবে না। বেড়িবাঁধ থেকে দূরত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ধাপে ধাপে ভবনের উচ্চতা বাড়ানোর বিধান রয়েছে। এর মাধ্যমে কুয়াকাটার সৌন্দর্য, পরিবেশ ও পরিকল্পিত নগর কাঠামো বজায় রাখার লক্ষ্য রয়েছে।

তিনি জানান, গত দুই মাসে সাতটি ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে মাস্টারপ্ল্যান ও নির্মাণবিধি না মেনে নির্মাণাধীন ৩৫টি ভবনের কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশনা দিয়ে পৌরসভার পক্ষ থেকে সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, ভবন নির্মাণের অনুমোদনের ক্ষেত্রে বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী, কুয়াকাটা পৌরসভার প্রশাসক এবং নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের জ্যেষ্ঠ পরিকল্পনাবিদ সমন্বয়ে গঠিত কমিটি যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত দেয়। এ সময় জমির মালিকানার ধারাবাহিকতা, ভবনের চারপাশে নির্ধারিত জায়গা, অগ্নিনিরাপত্তা, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, জরুরি বহির্গমন পথ এবং প্রকৌশলীর মাধ্যমে নকশা প্রস্তুত ও অনুমোদনের বিষয়গুলোও পর্যালোচনা করা হয়।

মো. ইয়াসীড়ন সাদেক আরও বলেন, মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নে পৌরবাসীর সহযোগিতা প্রয়োজন। পরিকল্পিত কুয়াকাটা গড়ে তুলতে ভবন নির্মাণের আগে পৌরসভা থেকে অনাপত্তিপত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক। তার তথ্য অনুযায়ী, কুয়াকাটার মাস্টারপ্ল্যান ২০১৬ সালে প্রণয়ন করা হয় এবং পরে এর সংশোধিত সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী কুয়াকাটাকে পর্যটনসেবা, কৃষি, বিমানবন্দর, ক্রীড়া ও রেলওয়ে অঞ্চলসহ বিভিন্ন জোনে ভাগ করা হয়েছে।

সমুদ্র, প্রকৃতি ও পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনা কুয়াকাটার সামনে থাকলেও সেই সম্ভাবনাকে টেকসইভাবে কাজে লাগাতে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা এবং পরিকল্পনার কার্যকর বাস্তবায়ন। পর্যটক ও বিনিয়োগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সৈকত, পরিবেশ ও নগর ব্যবস্থাপনাকে সুরক্ষিত রাখা না গেলে ভবিষ্যতে কুয়াকাটার সবচেয়ে বড় সম্পদ সমুদ্রসৈকতই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তাই কুয়াকাটার উন্নয়ন এখন শুধু পর্যটন অবকাঠামো নির্মাণের বিষয় নয়; বরং সৈকত সংরক্ষণ, পরিবেশ রক্ষা, নাগরিকসেবা নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সমন্বিত বাস্তবায়নের বিষয়।