সারাদেশ

গোডাউনে আগুনের মামলা করে বৃদ্ধা বাদীই গেলেন কারাগারে


সারাদেশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:১০ পিএম

গোডাউনে আগুনের মামলা করে বৃদ্ধা বাদীই গেলেন কারাগারে
ছবি: সংগৃহীত

কুষ্টিয়ায় বাড়ি ও পাটের গোডাউনে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় মামলা করেছিলেন ৬৫ বছর বয়সী নুরজাহান বেগম। সেই মামলার বাদীকেই বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে একটি পৃথক নাশকতা মামলায় সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) থানা পুলিশ।

রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ৭টার দিকে কুষ্টিয়া সদর উপজেলার পাটিকাবাড়ি ইউনিয়নের নলকুলা গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে নুরজাহান বেগমকে পুলিশ নিয়ে যায় বলে অভিযোগ করেছে তার পরিবার। পরিবারের দাবি, পুলিশ তাকে জানায়-গোডাউনে আগুন দেওয়ার ঘটনায় তিনি যে মামলা করেছেন, সে বিষয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তার সঙ্গে কথা বলবেন। এ কথা বলে তাকে গাড়িতে তুলে থানায় নেওয়া হয়।

নুরজাহান বেগমের পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১৫ সেপ্টেম্বর স্থানীয় একটি মারামারি ও ভাঙচুরের ঘটনার জেরে নুরজাহান বেগমের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর এবং তার পাটের গোডাউনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় তিনি বাদী হয়ে ২১ সেপ্টেম্বর কুষ্টিয়ার আদালতে একটি মামলা করেন। মামলায় ৬২ জনের নাম উল্লেখ করে আরও ১৫ থেকে ২০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়।

নুরজাহান বেগমের মেয়ে সেলিনা আক্তার শিল্পী বলেন, সামাজিক ও জমি-সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে কয়েকজন ব্যক্তি তাদের বাড়ি ও পাটের গোডাউনে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালান। পরে স্থানীয় কৃষকদলের একটি অফিসেও ভাঙচুর করা হয় এবং এলাকার আরও কয়েকটি বাড়িতে হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে বলে তিনি দাবি করেন। এসব ঘটনায় বিএনপির পাশাপাশি আওয়ামী লীগের কিছু লোকজনও জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

শিল্পীর দাবি, বাড়ি ও গোডাউনে হামলা এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনায় তার মা নুরজাহান বেগম ২১ সেপ্টেম্বর আদালতে মামলা করেন। ওই মামলার বাদী হওয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই তাকে একটি পৃথক মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘রোববার সকালে একদল পুলিশ আমাদের বাড়িতে ঢোকে। তারা মাকে বলে, আপনি আদালতে গোডাউন পোড়ানোর মামলা করেছেন। মামলার বাদী আপনি। এ বিষয়ে ওসি সাহেব আপনার সঙ্গে কথা বলবেন। আমাদের সঙ্গে চলুন। এরপর পুলিশ মাকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়।’

সেলিনা আক্তার আরও বলেন, ‘মাকে নিয়ে যাওয়ার পর দীর্ঘ সময় তার কোনো খোঁজ পাচ্ছিলাম না। পরে জানতে পারি, তাকে আদালতে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু কেন তাকে গ্রেপ্তার করা হলো, সে বিষয়ে শুরুতে আমরা কিছুই জানতে পারিনি।’

নুরজাহান বেগমের ছেলে আব্দুল্লাহ আল মামুনও একই অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, বাড়ি থেকে পুলিশ নিয়ে যাওয়ার পর মায়ের সঙ্গে পরিবারের কাউকে যোগাযোগ করতে দেওয়া হয়নি। পরে থানায় গিয়ে জানতে পারেন, তাকে আদালতে পাঠানো হয়েছে।

আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘পুলিশ কী কারণে আমার মাকে বাড়ি থেকে নিয়ে গেল এবং কেন তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হলো—এ বিষয়ে আমরা কিছুই বুঝতে পারছি না।’

এদিকে পুলিশ ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, ১৫ সেপ্টেম্বর কুষ্টিয়া সদর উপজেলার পাটিকাবাড়ি ইউনিয়নের নলকুলা গ্রামের ১ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত কৃষকদলের একটি অফিসে ভাঙচুর এবং সেখানে অবস্থানরত ব্যক্তিদের মারধরের অভিযোগে ১৬ সেপ্টেম্বর একটি মামলা করা হয়। ওই মামলায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে ৭৫ জনের নাম উল্লেখ করে আরও ১০০ থেকে ১২০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়। মামলাটি করেন স্থানীয় কৃষকদল নেতা হাবিবুর রহমান। তবে তিনি কৃষকদলের ঠিক কোন পদে রয়েছেন, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ওই মামলায় নুরজাহান বেগমকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরে রোববার বিকেলে তাকে আদালতে সোপর্দ করা হলে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

তবে পরিবারের দাবি, কৃষকদলের কার্যালয় ভাঙচুরের মামলায় নুরজাহান বেগমের সম্পৃক্ততা তারা জানেন না। বরং যে ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি নিজেই বাদী হয়ে বাড়ি ও গোডাউনে হামলা-অগ্নিসংযোগের মামলা করেছিলেন, সেই ঘটনার কয়েকদিনের মধ্যেই তাকে অন্য একটি মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

নুরজাহান বেগমকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে বক্তব্য জানতে পাটিকাবাড়ি ইউনিয়ন কৃষকদলের সভাপতি আবদুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি। মামলার বাদী হাবিবুর রহমানের বক্তব্য জানতে তার বাড়িতেও যাওয়া হয়। তবে তার কাছ থেকেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস.এম. মামুনুর রশিদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি ব্যস্ত আছি। সাংবাদিক ভাইদের ইন্টারভিউ দিচ্ছি। পরে কথা বলব।’ এরপর তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

নুরজাহান বেগমের পরিবারের অভিযোগ এবং মামলার ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে পুলিশের বক্তব্য বিস্তারিতভাবে পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে সংযোজন করা হবে।