সারাদেশ

সারের সংকট ঠেকাতে পবায় চালু হচ্ছে ‘পবা সার ডটকম’


সারাদেশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৫৭ পিএম

সারের সংকট ঠেকাতে পবায় চালু হচ্ছে ‘পবা সার ডটকম’
ছবি: সংগৃহীত

রাজশাহীর পবা উপজেলায় সারের সংকট, অনিয়ম, অতিরিক্ত মজুত ও বেশি দামে বিক্রি ঠেকাতে চালু হতে যাচ্ছে ডিজিটাল নজরদারি ব্যবস্থা ‘পবা সার ডটকম’। pabasaar.com ঠিকানার এই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে কোনো ডিলারের কাছে কত সার মজুত আছে, কত বিক্রি হয়েছে এবং কত সার অবশিষ্ট রয়েছে—এসব তথ্য অনলাইনে দেখা যাবে। একই সঙ্গে একজন কৃষক তার জমি ও ফসল অনুযায়ী কতটুকু সার পাওয়ার কথা এবং ইতোমধ্যে কোথা থেকে কত সার কিনেছেন, সেই তথ্যও সংরক্ষণ করা হবে।

সম্প্রতি পবায় সারের জন্য কৃষকদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানোর পাশাপাশি কোনো ডিলারের দোকানে সার পাওয়া গেলেও অন্য দোকানে গিয়ে খালি হাতে ফেরার অভিযোগ উঠেছে। কোথাও বেশি দামে সার বিক্রি, আবার কোথাও সার মজুত করে রাখার অভিযোগও রয়েছে। এসব নিয়ে ক্ষোভ-বিক্ষোভ এমনকি মহাসড়ক অবরোধের ঘটনাও ঘটেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযান চালানো হলেও সারের বাজারে অনিয়মের অভিযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে সার বিক্রির পুরো প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল নজরদারির আওতায় আনতে এই উদ্যোগ নিয়েছে পবা উপজেলা প্রশাসন।

কেন নেওয়া হলো উদ্যোগ

পবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইবনুল আবেদীনের উদ্যোগে ওয়েবসাইটটি তৈরি করা হয়েছে। এরই মধ্যে সার ডিলারসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

ইউএনও জানান, বাজারে পর্যাপ্ত সার থাকার পরও কেন সংকট তৈরি হচ্ছে, তা জানতে কৃষক, ডিলার ও কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। এসব আলোচনায় প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সার কেনা এবং আগাম সার মজুত করে রাখার বিষয়টি সামনে আসে। ফলে একজন কৃষক তার জমি ও ফসলের প্রয়োজন অনুযায়ী যাতে নির্ধারিত পরিমাণ সার পান, সে জন্য ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মো. ইবনুল আবেদীন বলেন, একজন কৃষক প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সার কিনলে অন্য কৃষক তার প্রাপ্য সার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। তাই কৃষকের জমির পরিমাণ ও চাষ করা ফসলের ধরন অনুযায়ী সার বিক্রির ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

সম্প্রতি পবায় অভিযান চালিয়ে এক কৃষকের বাড়ি থেকে ১২৯ বস্তা টিএসপি ও ইউরিয়া সার জব্দ করা হয়েছে বলেও জানান ইউএনও। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই কৃষক আলু চাষের জন্য আগাম এসব সার মজুত করেছিলেন। পরে জব্দ করা সার সরকারি কোষাগারে বিক্রি করে প্রায় ১ লাখ ৯৭ হাজার টাকা জমা দেওয়া হয়েছে।

একবার সার কিনলেই থাকবে ডিজিটাল রেকর্ড

উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, পবায় বর্তমানে ২৫ থেকে ৩০ জন সার ডিলার রয়েছেন। নতুন ব্যবস্থায় প্রত্যেক ডিলারের সার বিক্রির তথ্য একই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সংরক্ষিত হবে।

কোনো কৃষক জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য দিয়ে সার কিনলে তার কেনার তথ্যও সংরক্ষণ করা হবে। ফলে পরবর্তীতে তিনি অন্য কোনো ডিলারের কাছ থেকে কত পরিমাণ সার কিনেছেন, সেটিও দেখা যাবে। এতে একজন কৃষক প্রয়োজনের অতিরিক্ত সার কিনছেন কি না, তা সহজেই শনাক্ত করা সম্ভব হবে বলে মনে করছে উপজেলা প্রশাসন।

এ ছাড়া মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের সুপারিশ অনুযায়ী জমির পরিমাণ ও ফসলের ধরন বিবেচনা করে কৃষকের জন্য প্রয়োজনীয় সারের পরিমাণ নির্ধারণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এতে একদিকে অতিরিক্ত সার ব্যবহারের প্রবণতা কমবে, অন্যদিকে জমির মাটির গুণাগুণও সুরক্ষিত থাকবে বলে আশা করছে প্রশাসন।

ইউএনও মো. ইবনুল আবেদীন বলেন, কোনো কৃষক প্রয়োজনের অতিরিক্ত সার কিনছেন কি না, তা অনলাইনের তথ্যের মাধ্যমে জানা যাবে। অতিরিক্ত সার কেনার তথ্য পাওয়া গেলে মাঠপর্যায়ে গিয়ে সেটি যাচাই করা হবে।

ডিলারের মজুতও থাকবে প্রশাসনের নজরদারিতে

‘পবা সার ডটকম’-এ ডিলারদের জন্য আলাদা পেজ থাকবে। সেখানে কৃষকের নাম, জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য, ঠিকানা, কোন ফসলের জন্য সার নেওয়া হচ্ছে এবং কী পরিমাণ সার নেওয়া হচ্ছে—এসব তথ্য দিতে হবে।

ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি, এমওপি ও জিপসামসহ বিভিন্ন ধরনের সারের পরিমাণ দেওয়ার পর নির্ধারিত সরকারি মূল্যে মোট দাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে হিসাব হবে। ফলে নির্ধারিত মূল্যের বাইরে সার বিক্রির সুযোগ কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

একই সঙ্গে ডিলারের মোট মজুত, কত সার বিক্রি হয়েছে এবং কত সার অবশিষ্ট রয়েছে—এসব তথ্য প্রশাসনের ড্যাশবোর্ডে দেখা যাবে। ফলে কোনো ডিলারের গুদামে সার থাকার পরও তিনি ‘সার নেই’ বলে কৃষককে ফিরিয়ে দিচ্ছেন কি না, সেটিও যাচাই করা সম্ভব হবে।

মাঠপর্যায়ে পরিদর্শন করবেন কৃষি কর্মকর্তারা

শুধু ওয়েবসাইটে তথ্য সংরক্ষণ করেই এই উদ্যোগ সীমাবদ্ধ থাকছে না। ডিলারদের দোকান ও মজুত সরেজমিনে পরিদর্শন করবেন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা। তাদের জন্য ওয়েবসাইটে আলাদা আইডির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

পরিদর্শনের সময় ডিলারের মজুত খাতা সঠিক আছে কি না, সরকারি মূল্যতালিকা দৃশ্যমান রয়েছে কি না, নির্ধারিত দামে সার বিক্রি হচ্ছে কি না, কৃষকদের রসিদ দেওয়া হচ্ছে কি না এবং ডিলারের লাইসেন্স ও বরাদ্দপত্র হালনাগাদ আছে কি না—এসব বিষয় যাচাই করা হবে।

এ ছাড়া পরিদর্শনের সময় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অবস্থানও ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ করা হবে। এর ফলে কোনো কর্মকর্তা বাস্তবে মাঠে গিয়ে পরিদর্শন করেছেন কি না, পরবর্তীতে সেটিও যাচাই করা সম্ভব হবে।

ইউএনও জানান, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের কার্যক্রম কৃষি কর্মকর্তা, কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা ও ১০ জন ট্যাগ কর্মকর্তা পর্যবেক্ষণ করবেন। এর পাশাপাশি উপজেলা প্রশাসনের একটি দল পুরো কার্যক্রম তদারকি করবে।

চার স্তরের নজরদারি ব্যবস্থা

‘পবা সার ডটকম’-এ চার স্তরের মনিটরিং ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রথম স্তরে কৃষক ও সাধারণ মানুষ কোনো ধরনের লগইন ছাড়াই বিভিন্ন ডিলারের সার মজুত ও মূল্য সম্পর্কে তথ্য দেখতে পারবেন।

দ্বিতীয় স্তরে ডিলার, সাব-ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের প্রতিটি বিক্রি এবং মজুতের তথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ করা হবে। তৃতীয় স্তরে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে সার বিক্রির পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও পরিদর্শন করবেন। তাদের কার্যক্রম কৃষি কর্মকর্তা ও ট্যাগ কর্মকর্তারা তদারকি করবেন। চতুর্থ স্তরে উপজেলা প্রশাসন কেন্দ্রীয় ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে পুরো ব্যবস্থাটি পর্যবেক্ষণ করবে।

প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মতে, এর ফলে সার সরবরাহের শুরু থেকে কৃষকের হাতে বিক্রি পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ার তথ্য একটি প্ল্যাটফর্মে পাওয়া যাবে। এতে অনিয়ম শনাক্ত ও ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে।

লগইন ছাড়াই অভিযোগ জানাতে পারবেন কৃষকেরা

ওয়েবসাইটটিতে কৃষকদের জন্য অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। কোনো কৃষককে সার দিতে অস্বীকৃতি জানানো হলে, ওজনে কম দেওয়া হলে, রসিদ না দেওয়া হলে কিংবা নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রি করা হলে তিনি অনলাইনে অভিযোগ করতে পারবেন।

অভিযোগ করার সময় কৃষক তার জমির পরিমাণ, আগে সার পেয়েছেন কি না, চলতি মাসে কত পরিমাণ সার প্রয়োজন, কোন ডিলারের বিরুদ্ধে অভিযোগ এবং অভিযোগের ধরন উল্লেখ করতে পারবেন। প্রয়োজন হলে অভিযোগের সঙ্গে ছবিও যুক্ত করা যাবে। এ জন্য কৃষককে আলাদা করে নিবন্ধন বা লগইন করতে হবে না।

এ ছাড়া ইউনিয়নের নাম নির্বাচন করে কৃষকেরা জানতে পারবেন, সংশ্লিষ্ট এলাকার কোন ডিলারের কাছে কী পরিমাণ সার মজুত রয়েছে।

‘ডিলারদের ওপরও চাপ কমবে’

পবার হরিয়ান ইউনিয়নের বিসিআইসি সার ডিলার মো. সাইদুর রহমান বলেন, কিছু কৃষক জমি না থাকলেও অতিরিক্ত টিএসপি সার চাওয়ার ঘটনা রয়েছে। নতুন ডিজিটাল ব্যবস্থায় সার বিক্রির হিসাব অনলাইনে সংরক্ষিত থাকায় ডিলারদের ওপরও চাপ কমবে বলে মনে করেন তিনি।

এই ব্যবস্থায় কাজ করার জন্য ইতোমধ্যে তিনি মোবাইল ফোন কিনেছেন। সাইদুর রহমান বলেন, সব তথ্য মোবাইলেই সংরক্ষিত থাকবে। ফলে কেউ এসে জোর করে অতিরিক্ত সার নেওয়ার সুযোগ পাবে না। এতে ডিলারদেরও কাজ সহজ হবে এবং চাপ কমবে।

পবার কসবা এলাকার কৃষক আকবর আলী বলেন, সার কেনার জন্য তাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ডিলারের দোকানে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় মোবাইল ফোনের মাধ্যমে আগে থেকেই কোনো ডিলারের কাছে সার আছে কি না, তা জানা গেলে কৃষকদের ভোগান্তি কমবে বলে আশা করছেন তিনি।

খরচ হয়েছে প্রায় চার লাখ টাকা

ইউএনও মো. ইবনুল আবেদীন জানান, ওয়েবসাইট তৈরি, প্রশিক্ষণ ও প্রচারসহ এখন পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন থেকে চার লাখ টাকা খরচ হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও কিছু প্রচারব্যয় হতে পারে।

তিনি জানান, সরকারি ডোমেইন ‘pabasaar.gov.bd’ পাওয়া গেলে ওয়েবসাইট পরিচালনার খরচ আরও কমবে। পাশাপাশি এসএমএস ব্যবস্থার খরচ কমানো সম্ভব হলে বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও কমে আসবে। একটি উপজেলার জন্য বছরে আনুমানিক ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় হতে পারে বলে জানান তিনি।

সফল হলে পুরো জেলায় চালুর পরিকল্পনা

রাজশাহী জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, পর্যাপ্ত সার থাকার পরও কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা হয়েছে—এমন অভিযোগ তারা পেয়েছেন। সার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতেই পবা উপজেলায় এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, একজন ডিলার কত পরিমাণ সার বরাদ্দ পেয়েছেন, কত বিক্রি করেছেন এবং কত সার অবশিষ্ট রয়েছে—এসব তথ্য ওয়েবসাইটে দেখা যাবে। এতে সার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়বে এবং অনিয়ম শনাক্ত করা সহজ হবে।

জেলা প্রশাসক জানান, পবা উপজেলায় ‘পবা সার ডটকম’ উদ্যোগটি সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে রাজশাহী জেলার অন্যান্য উপজেলাতেও এটি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।