সারাদেশ
এমপির বিশেষ বরাদ্দের জিআর অনুদান বিএনপি নেতাকর্মীদের পকেটে
প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত দুস্থ ও অসহায় মানুষের সহায়তার জন্য সংসদ সদস্যের বিশেষ বরাদ্দের আওতায় দেওয়া জিআর (জেনারেল রিলিফ) অনুদানের উপকারভোগীর তালিকা নিয়ে নাটোরের বড়াইগ্রাম ও গুরুদাসপুরে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব তালিকায় বিত্তবান ও রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় বিভিন্ন পর্যায়ের বিএনপি নেতাকর্মীদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে তালিকায় থাকা কয়েকজন নেতাকর্মী দাবি করেছেন, তারা এ অর্থ নেওয়ার জন্য আবেদন করেননি; এমনকি কেউ কেউ জানিয়েছেন, তাদের অজান্তেই তালিকায় নাম দেওয়া হয়েছে।
সরকারি নথি ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. আব্দুল আজিজের বিশেষ বরাদ্দের আওতায় বড়াইগ্রাম উপজেলায় ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং গুরুদাসপুর উপজেলায় একই পরিমাণ অর্থ জিআর অনুদান হিসেবে বরাদ্দ দেওয়া হয়। বড়াইগ্রামে ৯৮ জন এবং গুরুদাসপুরে ৭০ জনকে এসব অর্থের উপকারভোগী হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
বড়াইগ্রাম উপজেলার জোনাইল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী ও ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি মো. আব্দুস সালাম ফকিরের নামও রয়েছে বড়াইগ্রামের জিআর অনুদানের তালিকায়। তালিকায় তার নামে ২ হাজার ৫০০ টাকা বরাদ্দ দেখানো হয়েছে। তবে আব্দুস সালাম ফকির দাবি করেন, তিনি ওই অর্থ গ্রহণ করেননি এবং ভবিষ্যতেও করবেন না।
আব্দুস সালাম ফকির বলেন, তিনি চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী এবং ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি। তার পরিবারও স্বচ্ছল। ফলে দুস্থ ও অসহায় মানুষের জন্য বরাদ্দ করা সরকারি অনুদানের তালিকায় তার নাম কীভাবে এসেছে, তা তিনি জানেন না। তার ভাষ্য, তিনি নিজে এ অর্থ নেওয়ার কোনো উদ্যোগও নেননি।
একই ধরনের দাবি করেছেন বড়াইগ্রাম উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মো. জাহিদুল হাসান বিপুল। তিনি জানান, তালিকায় তার নাম থাকলেও তিনি কোনো অর্থ সংগ্রহ করেননি এবং ভবিষ্যতেও করবেন না। তার মতে, তিনি এই সহায়তা পাওয়ার যোগ্য নন।
তবে তালিকায় থাকা কয়েকজন নেতাকর্মী জানিয়েছেন, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয় থেকে তারা বরাদ্দের অর্থ সংগ্রহ করেছেন। তাদের কেউ কেউ দাবি করেন, ওই অর্থ যে দুস্থ ও অসহায় মানুষের জন্য জিআর অনুদান হিসেবে বরাদ্দ করা হয়েছিল, তা তারা জানতেন না।
তালিকায় নগর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি ও চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী মো. তরাত মন্ডল এবং গুরুদাসপুর উপজেলা ছাত্রদলের সদস্য সচিব মো. আরিফুল ইসলাম রবিউলসহ বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের আরও কয়েকজন নেতাকর্মীর নাম রয়েছে বলে জানা গেছে।
সরকারি নথি ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২২ সেপ্টেম্বর বড়াইগ্রাম উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে ৯৮ জন উপকারভোগীর মধ্যে জিআর অনুদানের অর্থ বিতরণের আয়োজন করা হয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লায়লা জান্নাতুল ফেরদৌসের সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্য মো. আব্দুল আজিজ, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. আমিনুর রশীদসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
ওই তালিকায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত ১২টি পরিবারের সদস্যদের জন্য ৭ হাজার টাকা করে বরাদ্দ রাখা হয় এবং অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের অর্থ দেওয়া হয়। অন্যদিকে তালিকার বাকি ৮৬ জনকে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে বরাদ্দের অর্থ সংগ্রহ করতে বলা হয়।
অভিযোগ উঠেছে, এই ৮৬ জনের তালিকাতেই বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীদের নাম রয়েছে। তাদের মধ্যে কয়েকজন রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় এবং আর্থিকভাবে স্বচ্ছল হলেও কীভাবে তারা দুস্থ ও অসহায় মানুষের জন্য নির্ধারিত সহায়তার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হলেন-এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
শুধু বড়াইগ্রাম নয়, একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে পাশের গুরুদাসপুর উপজেলাতেও। গত ২৯ জুন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ে ৭০ জনের মধ্যে ৫ হাজার টাকা করে মোট ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা জিআর অনুদান বিতরণ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, সেখানেও বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে কয়েকজনকে উপকারভোগী হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
গুরুদাসপুর উপজেলা ছাত্রদলের সদস্য সচিব মো. আরিফুল ইসলাম রবিউল বলেন, তিনি জানতেন না ওই ৫ হাজার টাকা কীসের জন্য দেওয়া হয়েছিল। তার ধারণা ছিল, সংসদ সদস্য তাদের জন্য বরাদ্দ দিয়েছেন। বিষয়টি আগে জানলে তিনি হয়তো দুস্থ মানুষের জন্য বরাদ্দ করা ওই অর্থ গ্রহণ করতেন না।
এ ঘটনায় মূল প্রশ্ন উঠেছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত দুস্থ ও অসহায় মানুষের জন্য বরাদ্দ করা সরকারি অর্থের উপকারভোগীদের তালিকা কীভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে। তালিকা তৈরির আগে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ও দরিদ্র ব্যক্তিদের যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এ বিষয়ে গুরুদাসপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা এবং বড়াইগ্রাম উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা মো. আমিনুর রশীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এটি সংসদ সদস্যের বিশেষ বরাদ্দ। উপকারভোগীদের তালিকা সংসদ সদস্য নিজেই করেছেন এবং যাচাই-বাছাইও তিনি করেছেন। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে সংসদ সদস্যের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি।
তবে জিআর অনুদানের সরকারি নীতিমালায় কারা এই সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবেন, সে বিষয়ে ভিন্ন তথ্য জানিয়েছেন নাটোর জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা এ. কে. এম শাহা আলম মোল্লা। তিনি জানান, নীতিমালা অনুযায়ী প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত দুস্থ ও অসহায় মানুষই এই সরকারি সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবেন।
অভিযোগের বিষয়ে নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. আব্দুল আজিজ বলেন, দলের মধ্যেও অনেক অসহায় নেতাকর্মী রয়েছেন। যাচাই-বাছাই করেই উপকারভোগীদের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। পাশাপাশি সম্প্রতি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত পরিবারের সদস্যদেরও বড়াইগ্রামের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, তালিকায় থাকা কেউ যদি বরাদ্দের অর্থ গ্রহণ না করেন, তাহলে পরবর্তীতে সেই অর্থ দুস্থ ও অসহায় মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হবে।
ফলে জিআর অনুদানের উপকারভোগীর তালিকা প্রণয়ন, যাচাই-বাছাই এবং অর্থ বিতরণের প্রক্রিয়ায় প্রকৃত দুস্থ ও অসহায় মানুষ কতটা অগ্রাধিকার পেয়েছেন-এখন সেটিই মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।