সারাদেশ

সিলেটে পাথর লুটে জড়িত বিএনপি, আ.লীগ, জামায়াত ও সমন্বয়কদের সিন্ডিকেট


সারাদেশ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৫, ০৩:০৯ পিএম

সিলেটে পাথর লুটে জড়িত বিএনপি, আ.লীগ, জামায়াত ও সমন্বয়কদের সিন্ডিকেট
ছবি: সংগৃহীত

সিলেটের শাহ আরেফিন টিলা। একসময় প্রায় ১৩৭ একর জায়গাজুড়ে ছিল সবুজে ঘেরা উঁচু টিলা। কিন্তু আজ তার চিত্র ভিন্ন। জায়গায় জায়গায় গর্ত, ধ্বংসস্তূপ আর বিরানভূমি—কোনওভাবেই বোঝার উপায় নেই এটি একসময় একটি টিলা ছিল।

১৯৯৫ সালে আইন হওয়ার পরও ১৯৯৯ সালে এই টিলা সরকারিভাবে ইজারা দেওয়া হয়। এরপর থেকে শুরু হয় নির্বিচারে টিলা কেটে পাথর উত্তোলন। মামলাজটের কারণে একসময় বন্ধ থাকলেও গত বছরের ৫ আগস্ট থেকে ফের শুরু হয় দেদারছে পাথর উত্তোলন। মাত্র এক বছরে পুরো টিলা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।

ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই টিলায় ছিল প্রায় ৭০০ বছরের পুরনো শাহ আরেফিন টিলা মাজার। যা এখনও গত বছরের আগস্টে ৫০ ফুট উঁচু টিলার উপরে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু মাত্র চার মাসের ব্যবধানে তা সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে। শুধুমাত্র এই টিলা থেকেই লুট হয়েছে শতকোটি টাকার পাথর।

একটি বেসরকারি টেলিভিশনে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। দেখা গেছে, এই ধ্বংসযজ্ঞের পেছনে রয়েছে প্রায় ২০ জনের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা মিলে গড়ে তুলেছেন এই ‘পাথর সিন্ডিকেট’।

৫ আগস্টের পর যাদের নাম সামনে এসেছে তাদের মধ্যে রয়েছেন—উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক বাবুল আহমদ বাবুল, ইসলামপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সেবুল আহমদ, ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ইসমাঈল মিয়া, উপজেলা আওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক হুঁশিয়ার আলী, ওয়ার্ড যুবলীগ সভাপতি ফয়জুর রহমান, জালিয়ারপাড় গ্রামের আব্দুর রসিদ, মাজারের সাবেক খাদেমের ছেলে মনির হোসেন এবং জামায়াতকর্মী ইয়াকুব আলী।

তবে অভিযুক্তরা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। বাবুল আহমদ দাবি করেন, তিনি কোনও পাথর উত্তোলনে জড়িত নন। জামায়াতকর্মী ইয়াকুব আলীও জানান, তিনি সরাসরি উত্তোলন করেননি, বরং গাড়ি থেকে পাথর কিনে মিলে বিক্রি করেছেন।

আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট যারা এ কাজে জড়িত ছিলেন তারা এখন পলাতক। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে তারাই সবচেয়ে বেশি পাথর উত্তোলনে জড়িত ছিলেন।

পাথর লুটের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কী করেছে? এমন প্রশ্নও উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পুলিশের বিরুদ্ধেই রয়েছে চাঁদাবাজির প্রমাণ। এমনকি বেসরকারি টেলিভিশনটির হাতে একটি ভিডিও ফুটেজও এসেছে, যেখানে দেখা গেছে পাথরবাহী ট্রাক থেকে পুলিশ টাকা নিচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, লুটের পর নদীপারের জায়গাগুলো দখল করে রাখা হতো পাথর স্তূপ করার জন্য। এসব জায়গার ভাড়া দেওয়া হতো দিনে দুই হাজার টাকা। এরপর নৌকার মাধ্যমে পাথর পরিবহন করা হতো। শ্রমিকরা চারভাগের একভাগ দামে পাথর বিক্রি করতে বাধ্য হতো। এক নৌকার বাজারমূল্য প্রায় ৮ হাজার টাকা হলেও তারা তা বিক্রি করতো মাত্র ২ হাজার টাকায়। এতে সিন্ডিকেটের প্রতিদিনের আয় দাঁড়াতো প্রায় সোয়া কোটি টাকা।

৫ আগস্টের পর উপজেলা বিএনপির সভাপতি সাহাব উদ্দিন ছিলেন এ লুটের অন্যতম হোতা। তার বিরুদ্ধে প্রমাণ আসায় দল থেকেও তাকে পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। জেলা যুবদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বাহার আহমেদ রুহেল, উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক রজন মিয়া, সদস্য গিয়াস মিয়াসহ আরও অনেকে এতে জড়িত ছিলেন বলে অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে।

এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে আরও ৫১ জনের বিরুদ্ধে। এ তালিকায় রয়েছেন জেলা যুবদলের সদস্য মোস্তাকিম আহমেদ ফরহাদ, ইউনিয়ন যুবলীগ সভাপতি আলিমুদ্দিন, সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান লাল মিয়া ও তার ছেলে রিয়াজ উদ্দিন, উপজেলা যুবদল নেতা সাজ্জাদ হোসেন দুদুসহ বিএনপি, যুবদল, আওয়ামী লীগ ও তাদের আত্মীয়স্বজন।

পাথর লুটপাট ঠেকাতে পরিবেশবাদীরা একাধিকবার প্রতিবাদ করলেও কোনও সুফল মেলেনি। বেলা’র বিভাগীয় সমন্বয়ক শাহ সাহেদা আক্তার বলেন, “যারা অবৈধভাবে এই কাজ করেছে তারা চেহারা বদলেছে, কিন্তু লুটপাট বন্ধ হয়নি।”

জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহের একটি ফুটেজে দেখা গেছে, টিলা থেকে অবাধে পাথর তোলা হচ্ছে, অথচ সেখানেই উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। এখন তাকেই আবার তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

শুধু শাহ আরেফিন টিলাই নয়, সাদাপাথর, জাফলং ও রাংপানি থেকেও গত এক বছরে লুট হয়েছে প্রায় ৩ কোটি ঘনফুট পাথর। উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে মাত্র ৫ লাখ ঘনফুট। যেগুলো ইতিমধ্যেই বিক্রি হয়ে গেছে কিংবা চূর্ণ করে ফেলা হয়েছে, সেগুলো আর কোনওভাবেই উদ্ধার সম্ভব নয়।

সবমিলিয়ে, সিলেটের পাথর লুট শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস করেনি, বরং রাজনৈতিক দলগুলোর কালো সিন্ডিকেট আর প্রশাসনের নীরবতাকে উন্মোচন করেছে। পরিবেশবাদী থেকে সাধারণ মানুষ—সবাই প্রশ্ন তুলছে, এই হরিলুট ঠেকাবে কে? আর দায় নেবে কারা?