বিজ্ঞান-তথ্যপ্রযুক্তি
এআই কি একদিন মানবসভ্যতাকে গ্রাস করবে? নাকি মানুষেরই নৈতিক অবক্ষয়ের আয়না এটি
প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির এই যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইকে ঘিরে মানুষের ভয় দিন দিন বাড়ছে। অনেকের আশঙ্কা, একদিন এআই নিজস্ব স্বাধীন সত্তায় পরিণত হয়ে মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে এবং শেষ পর্যন্ত মানবসভ্যতার ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করবে। কিন্তু রাশিয়ার ভালদাই ক্লাবের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক তিমোফেই বোর্দাচেভের সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণ এই প্রচলিত ধারণাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। তার যুক্তি হলো, এআই কোনো বিচ্ছিন্ন বা স্বাধীন শক্তি নয়; বরং এটি মূলত মানুষের চিন্তা, আচরণ, সংস্কৃতি ও সৃষ্টিরই একটি বিশাল প্রতিফলন।
বোর্দাচেভের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে এমন কোনো স্বাধীন মন হিসেবে দেখা ঠিক নয়, যার সঙ্গে মানবসমাজের সম্পর্ক নেই। চাকা, মুদ্রণযন্ত্র, অভ্যন্তরীণ দহন ইঞ্জিন কিংবা পারমাণবিক প্রযুক্তির মতো বহু আবিষ্কার সময়ের সঙ্গে মানুষের জীবন ও সমাজের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। কিন্তু এআইয়ের ক্ষেত্রে বিষয়টি কিছুটা ভিন্ন। কারণ এর বিকাশ সরাসরি মানুষের তৈরি বিপুল পরিমাণ তথ্য, লেখা, ছবি, ভিডিও, ধারণা ও অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ, মানুষ যা তৈরি করছে, এআই মূলত সেই তথ্যভাণ্ডার থেকেই শিখছে এবং তার ভিত্তিতে নতুন কিছু তৈরি করছে।
এই কারণেই এআইকে অনেকটা আয়নার সঙ্গে তুলনা করা যায়। আয়না যেমন নিজের কোনো মুখ তৈরি করে না, সামনে দাঁড়ানো ব্যক্তির প্রতিবিম্বই দেখায়, তেমনি এআইও মানুষের তৈরি জ্ঞান ও সংস্কৃতির বিভিন্ন দিককে ধারণ ও পুনর্গঠন করে। মানুষের জ্ঞান যেমন সমৃদ্ধ, তেমনি মানুষের তৈরি তথ্যভাণ্ডারে ভুল তথ্য, বিদ্বেষ, প্রতারণা, অশালীনতা, রাজনৈতিক প্রচারণা এবং নিম্নমানের কনটেন্টও রয়েছে। ফলে এআইয়ের মাধ্যমে যখন এসব উপাদান আরও বড় পরিসরে দৃশ্যমান হয়, তখন সেটিকে শুধু প্রযুক্তির সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ থাকে না; বরং প্রশ্ন উঠে যায় মানুষের তৈরি ডিজিটাল সংস্কৃতির মান নিয়েও।
এআইয়ের প্রভাব কেবল প্রযুক্তি বা ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও এর প্রভাব ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। আধুনিক এআই ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজন বিপুল কম্পিউটিং ক্ষমতা, ডেটা সেন্টার, চিপ, বিদ্যুৎ এবং উন্নত প্রযুক্তিগত অবকাঠামো। ফলে কোনো দেশের এআই সক্ষমতা গড়ে ওঠার পেছনে শুধু প্রযুক্তিগত দক্ষতা নয়, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন ধনী রাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি ও এআই সহযোগিতাকে তাই বৃহত্তর নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও কৌশলগত সম্পর্কের প্রেক্ষাপটেও দেখা হচ্ছে।
একইভাবে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের দেশগুলোর ক্ষেত্রেও প্রযুক্তিগত নির্ভরতার প্রশ্নটি বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। কোনো দেশ কোন প্রযুক্তি ব্যবহার করবে, কার কাছ থেকে অবকাঠামো নেবে কিংবা কোন প্রযুক্তিগত মান অনুসরণ করবে-এসব সিদ্ধান্ত অনেক সময় তার কূটনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে যায়। ফলে এআই এখন আর কেবল সফটওয়্যার বা প্রযুক্তি শিল্পের বিষয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক ক্ষমতার ভারসাম্য এবং ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের আলোচনারও অংশ হয়ে উঠেছে।
এআইয়ের উত্থানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো, এটি ইন্টারনেট ও ডিজিটাল সংস্কৃতির দীর্ঘদিনের কিছু সমস্যাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া তথ্য, কৃত্রিম ছবি, সাজানো ভিডিও, রাজনৈতিক বিভ্রান্তি এবং অতিরঞ্জিত কনটেন্ট আগে থেকেই ছিল। কিন্তু জেনারেটিভ এআই এসব কনটেন্ট তৈরি করা আগের তুলনায় অনেক সহজ করে দিয়েছে। ফলে একজন সাধারণ ব্যবহারকারীও এখন অল্প সময়ের মধ্যে এমন লেখা, ছবি বা ভিডিও তৈরি করতে পারেন, যা দেখতে অনেক বেশি বাস্তব মনে হতে পারে।
এখানেই সামনে আসে ‘এআই স্লপ’ নামে পরিচিত একটি নতুন প্রবণতা। বিপুল পরিমাণ নিম্নমানের, উদ্দেশ্যহীন কিংবা শুধু ক্লিক ও ভিউ পাওয়ার জন্য তৈরি এআই-নির্ভর কনটেন্ট ইন্টারনেটের পরিবেশকে আরও ভারী করে তুলছে। একই ধরনের অসংখ্য ছবি, ভিডিও, পোস্ট ও স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি লেখা অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ছে। এর ফলে তথ্যের পরিমাণ বাড়লেও তথ্যের মান এবং বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
শিক্ষা ও সৃষ্টিশীলতার ক্ষেত্রেও এআই একই ধরনের দ্বন্দ্ব সামনে এনেছে। একজন শিক্ষার্থী যদি নিজের চিন্তা ও বিশ্লেষণের পরিবর্তে সম্পূর্ণভাবে এআইয়ের তৈরি উত্তর ব্যবহার করেন, তাহলে তার শেখার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে। একইভাবে লেখালেখি, শিল্প, সাংবাদিকতা কিংবা গবেষণায় এআইয়ের অতিরিক্ত ব্যবহার মৌলিক চিন্তা ও সৃজনশীলতার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। তবে একই প্রযুক্তি আবার গবেষণা, শিক্ষা, অনুবাদ, তথ্য বিশ্লেষণ এবং সৃষ্টিশীল কাজকে দ্রুত ও সহজ করার সুযোগও তৈরি করছে। অর্থাৎ সমস্যাটি শুধু এআইয়ের অস্তিত্বে নয়; বরং মানুষ কীভাবে এবং কোন উদ্দেশ্যে এটিকে ব্যবহার করছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
এআইয়ের বিকাশ ইন্টারনেটের তথাকথিত স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতার ধারণাকেও নতুনভাবে আলোচনায় এনেছে। বিশ্বের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো, উন্নত চিপ নির্মাণ সক্ষমতা, ক্লাউড অবকাঠামো এবং বিপুল ডেটা যেসব দেশের হাতে বেশি কেন্দ্রীভূত, তারা এআই যুগে তুলনামূলকভাবে বড় কৌশলগত সুবিধা পেতে পারে। এ কারণেই বিভিন্ন দেশ এখন নিজেদের ডেটা, কম্পিউটিং অবকাঠামো এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। ‘ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব’ তাই ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ একটি ধারণায় পরিণত হচ্ছে।
এখানে এআইকে পারমাণবিক প্রযুক্তির সঙ্গে তুলনা করার বিষয়টিও সামনে আসে। পারমাণবিক অস্ত্র যেমন মানবসভ্যতাকে অভূতপূর্ব ধ্বংসক্ষমতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শক্তির ভারসাম্যকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছিল, এআইও তেমনি রাষ্ট্র, অর্থনীতি, সামরিক সক্ষমতা, তথ্যব্যবস্থা এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনে গভীর পরিবর্তন আনছে। তবে দুই প্রযুক্তির প্রকৃতি এক নয়। পারমাণবিক অস্ত্রের মূল ঝুঁকি যেখানে সরাসরি ধ্বংসক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত, সেখানে এআইয়ের ঝুঁকির বড় অংশ তথ্য, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, গোপনীয়তা এবং সামাজিক আস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই হয়তো এআই একদিন মানবসভ্যতাকে গ্রাস করবে কি না, সেটি নয়। বরং প্রশ্ন হলো-মানবসভ্যতা নিজেই এআইকে কীভাবে পরিচালনা করবে। কারণ প্রযুক্তি নিজে কোনো নৈতিক মূল্যবোধ নিয়ে জন্ম নেয় না। এর ব্যবহার নির্ভর করে মানুষ, প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্র এবং সমাজের সিদ্ধান্তের ওপর। মানুষ যদি ভুল তথ্য তৈরি করে, এআই সেই ভুল তথ্যকে আরও দ্রুত ছড়িয়ে দিতে পারে; মানুষ যদি জ্ঞান তৈরি করে, এআই সেই জ্ঞানকে আরও সহজলভ্য করে তুলতে পারে।
তিমোফেই বোর্দাচেভের বিশ্লেষণের মূল বক্তব্যকে এভাবেই দেখা যায়-এআই হয়তো আমাদের সামনে এমন কিছু সমস্যা নিয়ে আসেনি, যেগুলো আগে ছিল না; বরং প্রযুক্তিটি সেগুলোকে আরও বড়, দ্রুত এবং দৃশ্যমান করে তুলেছে। আমাদের তথ্যব্যবস্থায় যে বিভ্রান্তি ছিল, এআই সেটিকে আরও ব্যাপক করতে পারে। আমাদের সংস্কৃতিতে যে নিম্নমানের কনটেন্ট ছিল, সেটি এআই আরও দ্রুত তৈরি করতে পারে। আবার একই সঙ্গে মানুষের জ্ঞান, গবেষণা ও সৃষ্টিশীলতাকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রেও এটি শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে।
সুতরাং ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় লড়াই হয়তো মানুষ বনাম এআই নয়। বরং এটি হতে পারে মানুষ কীভাবে নিজের প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করবে এবং প্রযুক্তির শক্তিকে কোন মূল্যবোধের অধীনে ব্যবহার করবে-সেই লড়াই। এআই যদি আয়না হয়ে থাকে, তাহলে সেই আয়নায় আমরা কী দেখতে পাচ্ছি, সেটিই হয়তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কারণ আয়নাকে ভেঙে ফেললে প্রতিচ্ছবি অদৃশ্য হতে পারে, কিন্তু প্রতিচ্ছবির পেছনের বাস্তবতা অদৃশ্য হয় না। সেই বাস্তবতাকে পরিবর্তন করতে হলে পরিবর্তন করতে হবে মানুষকেই, তার জ্ঞানচর্চা, নৈতিকতা, সংস্কৃতি এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের ধরনকে।