শিক্ষা

১১তম গ্রেডে ঢুকে এখন ৩য় গ্রেড কর্মকর্তা! ইউজিসি চেয়ারম্যানের পিএসের পদোন্নতিতে অনিয়ম


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১১:১০ পিএম

১১তম গ্রেডে ঢুকে এখন ৩য় গ্রেড কর্মকর্তা! ইউজিসি চেয়ারম্যানের পিএসের পদোন্নতিতে অনিয়ম
মো. মোস্তাফিজুর রহমান। ছবি: সংগৃহীত

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে (ইউজিসি) এক সময়ের তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী, বর্তমানে ইউজিসি চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. এস এম এ ফায়েজের একান্ত সচিব মো. মোস্তাফিজুর রহমানের পদোন্নতি নিয়ে বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

কম্পিউটার অপারেটর থেকে শুরু করে একাধিক ধাপ পেরিয়ে তিনি এখন পৌঁছে গেছেন অতিরিক্ত পরিচালক পদে যা সরকারি চাকরির ৩য় গ্রেডভুক্ত উচ্চপদ। অথচ এ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ইউজিসির নিজস্ব নিয়োগ বিধি ও সরকারি চাকরি বিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হয়েছে বলে জানিয়েছে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তর।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর দেশে নতুন রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে নিজের ‘বঞ্চিত’ অবস্থান তুলে ধরে মোস্তাফিজুর রহমান অতিরিক্ত পরিচালকের পদোন্নতি গ্রহণ করেন। এর মাধ্যমে তৃতীয় শ্রেণি থেকে প্রথম শ্রেণির (অথবা সমমর্যাদার) পদে উত্তরণ ঘটলো তাঁর। তবে এই পদোন্নতিকে ইউজিসির নিয়োগ প্রবিধান এবং সরকারি কোড অনুযায়ী সম্পূর্ণ ‘বিধিবহির্ভূত’ আখ্যা দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন শিক্ষা অডিট অধিদপ্তর।

সম্প্রতি ইউজিসিতে অডিট কার্যক্রম পরিচালনা করে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তর। অডিট রিপোর্টে বলা হয়েছে, মোস্তাফিজুর রহমানকে ৯ম গ্রেড বা তার ঊর্ধ্বতন পদে পদোন্নতি দিয়ে ইউজিসি পরিষ্কারভাবে নিজস্ব প্রবিধান ভেঙেছে। কমিশনের চাকরি প্রবিধানমালা অনুযায়ী, তৃতীয় শ্রেণি থেকে প্রথম শ্রেণির পদে সরাসরি পদোন্নতির সুযোগ নেই, আর থাকলেও তা হতে পারে খুবই সীমিত হারে—সর্বোচ্চ ৫০% পদে। কিন্তু মোস্তাফিজকে একের পর এক পদোন্নতির মাধ্যমে তৃতীয় গ্রেডের কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে।

অডিট রিপোর্টে বলা হয়, ২০০১ সালের ১৫ অক্টোবর মো. মোস্তাফিজুর রহমান কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে ১১তম গ্রেডে ইউজিসিতে যোগ দেন। এরপর ২০০৪ সালে শাখা কর্মকর্তা, ২০১১ সালে সহকারী সচিব (৬ষ্ঠ গ্রেড), ২০২০ সালে উপপরিচালক (৫ম গ্রেড) এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি অতিরিক্ত পরিচালক হিসেবে পদোন্নতি পান।

রিপোর্টে আরও বলা হয়, ইউজিসি প্রবিধানমালার ১৯(২) ধারা অনুযায়ী প্রথম শ্রেণির পদে সরাসরি নিয়োগ দিতে হবে এবং পদোন্নতির হার ৫০% এর বেশি হতে পারবে না। অথচ মোস্তাফিজের ক্ষেত্রে এই নিয়ম পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে। যার ফলে কমিশনের অভ্যন্তরে চাকরি কাঠামোতে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে।

শুধু মোস্তাফিজ নন, অডিট রিপোর্টে আরও উল্লেখ করা হয়—কম্পিউটার অপারেটর বা সমমানের অন্যান্য তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীদের মধ্য থেকে অনেকেই বিধিবহির্ভূতভাবে পদোন্নতি পেয়ে তৃতীয় গ্রেড পর্যন্ত পৌঁছে গেছেন। যা ইউজিসির নিজস্ব নীতিমালা এবং সরকারি চাকরি বিধিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের এমন আপত্তির পর ইউজিসি জানিয়েছে, বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে এবং প্রাসঙ্গিক আইন, প্রবিধান ও নথিপত্র বিশ্লেষণ করে জবাব দেওয়া হবে। তবে অডিট অধিদপ্তর বলছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জবাব না দেওয়ায় ইউজিসি অডিট কোডের ৫৯ নং বিধি এবং ট্রেজারি রুলস এর সাবসিডিয়ারি রুলস এর ৪৩৭ নং বিধি লঙ্ঘন করেছে।

ইউজিসির অভ্যন্তরীণ অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে সম্প্রতি প্রকাশিত একটি শ্বেতপত্রে। বিভিন্ন সময়ের অনিয়মের তথ্য তুলে ধরে এই শ্বেতপত্রটি সরকারের উচ্চপর্যায়, গণমাধ্যম ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে পাঠানো হয় ই-মেইলের মাধ্যমে। সেখানে দাবি করা হয়, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় কমিশনের একশ্রেণির কর্মকর্তা নিয়োগ, পদোন্নতি এবং সুবিধাজনক দপ্তরে পদায়নসহ সব ধরনের সুবিধা পেয়েছেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই সুবিধাবঞ্চিতরা আবারও নিজেদের পদোন্নতি নিশ্চিত করেছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একজন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী যদি নিজস্ব নিয়ম ভেঙে একের পর এক পদোন্নতি পেয়ে তৃতীয় গ্রেডে পৌঁছে যান, তবে তা প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক কাঠামোর জন্য হুমকিস্বরূপ। এতে করে যোগ্যতা, স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতামূলক নিয়োগ ব্যবস্থার ভিত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এই বিষয়ে অভিযুক্ত মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

তবে ইউজিসির অডিট শাখার পরিচালক (চলতি দায়িত্বে) নাহিদ সুলতানা জানান, “যে সকল বিষয়ে আপত্তি এসেছে, কমিশন সে সকল বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে। অভিযুক্তদের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে, তা নিয়ে আলোচনা করে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরে রিপোর্ট জমা দেওয়া হবে।”