পরিবেশ-জলবায়ু

বজ্রপাতে দীর্ঘ হচ্ছে লাশের মিছিল, সচেতনতা ও আগাম সতর্কতায় জোর


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৫, ০২:২০ পিএম

বজ্রপাতে দীর্ঘ হচ্ছে লাশের মিছিল, সচেতনতা ও আগাম সতর্কতায় জোর
ছবি: সংগৃহীত

ফসল ফলানো, ঘাম ঝরানো, গোধূলির আলো মেখে ঘরে ফেরা—এটাই ছিল বাংলার চিরচেনা কৃষিজীবন। কিন্তু আজ সেই পথে বারবার মৃত্যুর ছায়া। আচমকা বজ্রপাত কেড়ে নিচ্ছে অগণিত প্রাণ, বিশেষ করে মাঠে খেটে খাওয়া কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষদের।

বায়ুদূষণ, তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও বনভূমি ধ্বংসের কারণে দেশে বজ্রপাতের ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে। শুধু গত রোববারেই বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছেন ১১ জন। আবহাওয়াবিদদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বজ্রপাত এখন আর কেবল প্রাকৃতিক ঘটনা নয়—এটি এক ভয়াবহ দুর্যোগে রূপ নিয়েছে।

বেসরকারি সংগঠন ডিজাস্টার ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বজ্রপাতে প্রাণ গেছে ৪ হাজার ১৫৮ জনের—অর্থাৎ গড়ে প্রতি বছর মারা যাচ্ছেন প্রায় ৩০০ জন। অপরদিকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের হিসাবেও ২০১১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বজ্রপাতে প্রাণহানি ঘটেছে ৩ হাজার ৮৪৫ জনের।

এই মৃত্যুর বড় অংশই ঘটে মাঠে কাজ করার সময়—ধান কাটা, জমি প্রস্তুত বা মাছ ধরার সময়। ফলে সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছেন কৃষক, কৃষিশ্রমিক ও জেলেরা।

২০১৬ সালে সরকার বজ্রপাতকে জাতীয় দুর্যোগ ঘোষণা করলেও এর ক্ষয়ক্ষতি কমাতে নেওয়া প্রকল্পগুলোর ফল তেমন দৃশ্যমান নয়। তালগাছ লাগানো, বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপনসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেগুলোর বাস্তব প্রয়োগ ও রক্ষণাবেক্ষণ সীমিত ছিল।

১৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৫টি জেলার ৩৩৫টি লাইটনিং অ্যারেস্টার স্থাপন করা হলেও কার্যকারিতা না থাকায় বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার উদ্যোগটি বন্ধ করেছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক-ই আজম বলেন, “বজ্রনিরোধক দণ্ডগুলো ১০০ মিটার ব্যাসার্ধে কাজ করে, যা বাংলাদেশের বিশাল এলাকার তুলনায় অপ্রতুল। তাই প্রযুক্তিনির্ভর আগাম সতর্কতা ও জনসচেতনতা বৃদ্ধিই এখন সবচেয়ে বাস্তবসম্মত উপায়।”

নতুন পরিকল্পনায় সরকার এখন আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে অন্তত দুই ঘণ্টা আগে জানা যাবে কোন এলাকায় বজ্রপাতের আশঙ্কা রয়েছে। কৃষক ও শ্রমজীবীদের কাছে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বার্তা পৌঁছে দিতে একটি নতুন নোটিফিকেশন সিস্টেম চালুর কাজ চলছে বলে জানায় মন্ত্রণালয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া বিজ্ঞান বিভাগের জরিপে দেখা যায়, বজ্রপাতপ্রবণ ১৫টি জেলার বেশিরভাগই কৃষি উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল—নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, জামালপুর, ময়মনসিংহ, সুনামগঞ্জ, রাজশাহী, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, দিনাজপুরসহ উত্তরাঞ্চল ও হাওর এলাকা।

কৃষিবিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন, বোরো কাটার মৌসুম (এপ্রিল–জুন) ও বজ্রপাতের মৌসুম একসঙ্গে হওয়ায় কৃষি এখন নতুন বিপদের মুখে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মনিরুজ্জামান বলেন, “প্রতিবছর কৃষিকাজে যুক্ত অনেকেই বজ্রপাতে মারা যাচ্ছেন। কৃষকরা যদি এমন ঝুঁকিতে থাকতে থাকেন, ভবিষ্যতে তারা পেশা বদলাতে বাধ্য হবেন। হাওর অঞ্চলে জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ এখন সময়ের দাবি।”

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, মার্চ থেকে মে মাসে দেশে মোট বজ্রঝড়ের ৩৮ শতাংশ ঘটে, আর বর্ষাকালে (জুন–সেপ্টেম্বর) ঘটে ৫১ শতাংশ। ২০১৬ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত গড়ে প্রতি বর্গকিলোমিটারে বছরে ১২০টি বজ্রপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যার এক-তৃতীয়াংশ মাটিতে আঘাত হানে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের উত্তর ও পূর্বাঞ্চল—বিশেষ করে সিলেট, রংপুর, দিনাজপুর, টাঙ্গাইল ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় বজ্রপাত সবচেয়ে বেশি হয়।

আবহাওয়াবিদ ড. আব্দুল মান্নান বলেন, “দূষণ ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে বায়ুমণ্ডলে বিদ্যুৎ সঞ্চয়ের মাত্রা বেড়ে গেছে। সেই সঙ্গে গ্রামীণ এলাকায় গাছ কমে যাওয়ায় প্রাকৃতিক সুরক্ষাও নষ্ট হয়েছে। ফলে বজ্রপাত এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রাণঘাতী।”

অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক অধ্যাপক আশরাফ দেওয়ান বলেন, “প্রান্তিক মানুষের মৃত্যুতে রাষ্ট্রের মনোযোগ কম। বায়ুদূষণ ও জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো নিয়ন্ত্রণ না করলে বজ্রপাতের ঘটনা আরও বাড়বে।”

বজ্রপাতজনিত প্রাণহানি প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়ায় হাইকোর্ট সম্প্রতি সরকারকে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দিয়েছে। আদালত বজ্রপাত বিষয়ক প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের জন্য বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের নির্দেশও দেয় এবং ছয় মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের আদেশ দিয়েছে।

আইনজীবী মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির পল্লব বলেন, “সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদে জীবনের অধিকার মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত। আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে আগাম সতর্কতা দেওয়া সম্ভব হলে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।”

প্রতি বছর শত শত মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে বজ্রপাত। তবুও জনসচেতনতা, প্রযুক্তি ও কার্যকর তদারকির অভাবে এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় রোধে সফলতা আসছে না। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “বজ্রপাত এখন শুধু আবহাওয়ার বিষয় নয়—এটি গ্রামীণ জীবনের টিকে থাকার লড়াই।”