ফিচার
সরকার পতনের এক বছর; অভ্যুত্থানে আহত শিক্ষার্থীদের ভাবনায় প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি
দীর্ঘ ১৭ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটিয়ে ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট গণআন্দোলনের মাধ্যমে পতন ঘটে শেখ হাসিনা সরকারের। ছাত্রজনতার টানা ৩৬ দিনের তীব্র গণআন্দোলনে শহীদ এবং আহতের সংখ্যাও কম নয়। আন্দোলনের প্রতিটি দিন-রাত ছিল আতঙ্ক, রক্ত আর সাহসিকতার অধ্যায়।
এই আন্দোলনে অনন্য ভূমিকা রাখে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় (কুবি)। ২৪ এর আন্দোলনে প্রথম আক্রমণের শিকার হওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ইতিহাসে লেখা থাকবে। গত বছরের ১১ জুলাই, যেদিন প্রথমবার প্রতিরোধে নামে কুবির শিক্ষার্থীরা, সেদিনই পুলিশের লাঠিচার্জ ও টিয়ারশেলের আঘাতে আহত হন পঞ্চাশের অধিক শিক্ষার্থী। যে দিনটিকে এরইমধ্যে 'প্রথম প্রতিরোধ দিবস' হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
পরবর্তীতে ১৮ আগস্ট ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে আয়োজিত কর্মসূচিতে পুলিশের গুলি ও কাঁদানে গ্যাসে আহত হন আরও শতাধিক শিক্ষার্থী, যাদের মধ্যে ছয়জনকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
এই প্রেক্ষাপটে, সরকার পতনের এক বছর পূর্তিতে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী এবং আহত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের প্রত্যাশা ছিল একটি মুক্ত, গণতান্ত্রিক ও মানবিক বাংলাদেশ। অনেকেই আশা করেছিলেন রাষ্ট্রব্যবস্থায় ব্যাপক সংস্কার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
কিন্তু এক বছর পর তাঁদের কণ্ঠে রয়েছে মিশ্র অনুভূতি। কেউ বলছেন, 'আমরা জান দিয়ে স্বৈরাচার পতন ঘটিয়েছি, কিন্তু এখনো অনেক কিছু পরিবর্তন হয়নি।' আবার কেউ মনে করছেন, 'এই এক বছরে কিছু আশাব্যঞ্জক পরিবর্তন হয়েছে, তবে পথ অনেক দূরের।'
স্বৈরাচারী সরকার পতনের এক বছরে প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তি নিয়ে আন্দোলনে আহত কয়েকজন শিক্ষার্থীর ভাবনা তুলে ধরা হলো–
হাজারো পরিবর্তনের স্বপ্নে বিভোর ছিলাম
'আজ দীর্ঘ একবছর ঘুরে আমরা ৩৬ জুলাইয়ে ফিরে এসেছি। এই জুলাই এসেছে প্রায় দুই হাজর প্রাণ আর প্রায় ৩০ হাজার আহতদের বিনিময়ে। ঠিক এই দিনে খুনী স্বৈরাচার পালিয়েছে লেজ গুটিয়ে। এই এক বছরে হাজারো পরিবর্তনের স্বপ্নে বিভোর ছিলাম আমরা। যদিও সব স্বপ্ন পূরণ হয় না। তবে আমি আশাবাদী, আস্তে আস্তে হয়তো স্বপ্ন পূরণ হবে। যেই পরিবর্তনের সারথি হওয়ার কথা ছিলো আমাদের, ঠিক তার মধ্যে থেকে কিছু হয়ে গেছে চাঁদাবাজ, মামলাবাজ ও জুলাই চেতনা বিক্রেতা। তবুও আশাবাদী আমি সরকার যে সংস্কারে হাত দিয়েছে সব পরিবর্তন না হলেও কিছু কিছু হচ্ছে বা হবে। গত একবছরে কুবিতে পরিবর্তনের তেমন ছোঁয়া লেগেছে বলে মনে হয় না। যারা ডিরেক্ট হামলার সাথে জড়িত ছিলো তাদের শাস্তি হতে দেখিনি, প্রশাসন থেকে কোনো অ্যাকশন নেওয়া হয়নি। আগের প্রক্টরিয়াল বডির, যাদের সম্মতিতে ১১ জুলাই হামলা করেছে পুলিশ। সাবেক ছাত্র যারা নিষিদ্ধ সংগঠন এর ছিলো তারা এখনো গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে। পরিবহন সমস্যা, নিম্নমানের খাবার,শিক্ষক সংকট এগুলো পূর্বের সমস্যা। তবে আমরা কি এক বছরেও নতুন প্রশাসন এর কাছে সমাধানের আশা করতে পারি না? শিক্ষার্থীদের আন্দোলন করা লাগে শিক্ষক নিয়োগ এর জন্য!’
'ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ ক্যাম্পাসে রাজনীতির আনাগোনা সর্বত্র। ক্যাম্পাস ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ সেটা কঠিনভাবে প্রশাসন হ্যান্ডেল করুক সেটা আমি চাই। ছাত্র সংসদ হউক তাতে লিডারশীপ বেরিয়ে আসবে। সাধারন শিক্ষার্থীদের ব্যানার কোনো ব্যক্তি স্বার্থ বা দলীয় স্বার্থ হাসিলে ব্যবহৃত না হউক। গত শিক্ষক সমিতির মতো নীলের জায়গায় অন্য কোনো রংয়ের কোনো সমিতি নাই হউক। রাজনীতির বাইরে গিয়ে সুন্দর শিক্ষক সমিতি গড়ে উঠুক। মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই উভয় চেতনাকে ধারণ করে শিক্ষার্থীরা রাজনীতি মুক্ত সুন্দর পরিবেশে পড়াশোনা করার সুযোগ পাবে এটাই আমার প্রত্যাশা।'
জান্নাতুল ইভা
ফাইন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগ
২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষ
আমাদের স্বপ্ন ছিল একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশ
‘জুলাই আন্দোলনে আমি ফ্রন্টলাইনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছি। আমাদের স্বপ্ন ছিল একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশ—যেখানে কোনো একচেটিয়াবাদ থাকবে না, সকল নাগরিক সমান অধিকার ভোগ করবে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, এক বছর পার হলেও আমরা দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন দেখতে পাইনি। স্বৈরাচার আমলে যারা নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালিয়েছিল, তাদের এখনো আইনের আওতায় আনা হয়নি। আমরা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে কার্যকর বিচারব্যবস্থা এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চেয়েছিলাম। সেই দাবি এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।’
‘জুলাই আন্দোলনের ঘোষণাপত্র নিয়েও সরকারের তেমন কোনো স্পষ্ট অবস্থান আমরা দেখতে পাচ্ছি না। যারা আহত হয়েছেন, তাদের অনেকেই এখনো তালিকার বাইরে। অথচ আন্দোলনে অংশ না নিয়েও কিছু ব্যক্তি সেই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত। এটি গভীরভাবে হতাশাজনক। আমাদের মূল দাবি ছিল দলমত নির্বিশেষে বৈষম্যহীন একটি বাংলাদেশ গঠন করা, কিন্তু সেই লক্ষ্য এখনো অপূর্ণ থেকে গেছে।’
মোঃ এমরান
ব্যবস্থাপনা শিক্ষা বিভাগ
২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষ
এখনো আমরা নিরাপদ নই, এখনো দেশে বৈষম্য বিদ্যমান
‘জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া ছিল আমার নৈতিক দায়বদ্ধতা থেকে। এই আন্দোলনের এক পর্যায়ে স্বৈরাচারী সরকারের হামলায় আমিও আহত হই। ব্যক্তিগতভাবে আমার কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। আমরা যারা আন্দোলনে ছিলাম, আমাদের একটাই লক্ষ্য ছিল—একটি বৈষম্যহীন ও সকলের জন্য নিরাপদ বাংলাদেশ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, গত এক বছরে সেই প্রত্যাশিত পরিবর্তন আমরা দেখিনি। এখনো আমরা নিরাপদ নই, এখনো দেশে বৈষম্য বিদ্যমান। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি আমার একটাই দাবি—আমরা যেন আমাদের কাঙ্ক্ষিত সোনার বাংলা গড়ে তুলতে পারি, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত হবে।’
আব্বাস উদ্দিন
অর্থনীতি বিভাগ
২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষ
দেশটা কি এমন রাখার জন্যই তখন জীবন বাজি রেখেছিলাম?
'আসলে সরকার পতনের এক বছর বলবো না আমি, আমি বলবো আমরা শিক্ষা