সারাবিশ্ব

হুতিদের অগ্রযাত্রায় সৌদি চাপে ট্রাম্প, টানাপোড়েনে যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি সম্পর্ক


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:০৪ পিএম

হুতিদের অগ্রযাত্রায় সৌদি চাপে ট্রাম্প, টানাপোড়েনে যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি সম্পর্ক
ছবি: সংগৃহীত

ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের সামরিক অগ্রযাত্রা এবং সৌদি আরবে ধারাবাহিক হামলার ঘটনায় নতুন করে চাপে পড়েছে রিয়াদ। ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু এলাকায় হুতিদের অগ্রগতি যেমন সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশটির দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা অংশীদারত্ব নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো-সৌদি আরবের অনুরোধ সত্ত্বেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আপাতত হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি মার্কিন বিমান হামলায় যেতে রাজি হননি।

সাম্প্রতিক সময়ে হুতিরা ইয়েমেনে সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন স্থাপনা ও জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলাও চালিয়েছে তারা। ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের দিকে হুতিদের অগ্রযাত্রা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ এই অঞ্চলটি কৌশলগত বাব আল-মানদেব প্রণালির কাছাকাছি। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে ইতোমধ্যেই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সৌদি আরবের ওপর বাড়ছে চাপ

সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরেই ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের মোকাবিলায় যুক্ত রয়েছে। তবে কয়েক বছর ধরে রিয়াদ ইয়েমেনের সংঘাত থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছিল। ২০২২ সালে প্রতিষ্ঠিত যুদ্ধবিরতি দীর্ঘ সময় মোটামুটি কার্যকর থাকার পর চলতি বছরের জুলাইয়ে পরিস্থিতির বড় পরিবর্তন ঘটে। হুতিরা সৌদি বন্দরগুলোর বিরুদ্ধে অবরোধের হুমকি দেয় এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দাবি সামনে আনে।

এরপর থেকেই ইয়েমেনে সংঘাত আবার তীব্র হতে শুরু করে। সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনী কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রাখতে ব্যর্থ হওয়ায় হুতিরা লোহিত সাগর উপকূলের দিকে আরও এগিয়ে যায়। সাম্প্রতিক অভিযানে কৌশলগত অঞ্চল দখলের ফলে বাব আল-মানদেবের কাছাকাছি তাদের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

হুতিদের এই অগ্রগতি সৌদি আরবের জন্য শুধু সামরিক নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও বড় উদ্বেগের কারণ। দেশটির তেল রপ্তানি, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক যোগাযোগের ওপর হামলার ঝুঁকি বাড়লে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের অর্থনৈতিক রূপান্তরের পরিকল্পনাও চাপের মুখে পড়তে পারে।

ট্রাম্পের কাছে সামরিক সহায়তা চেয়েছিলেন মোহাম্মদ বিন সালমান

পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হওয়ায় সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে সরাসরি সামরিক সহায়তা চেয়েছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম Axios-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একদিনেই বিন সালমান ট্রাম্পকে দুবার ফোন করে হুতিদের বিরুদ্ধে হামলা চালানোর অনুরোধ করেছিলেন। তবে ট্রাম্প তখন সরাসরি মার্কিন সামরিক অভিযানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেননি।

পরবর্তী সময়ে ট্রাম্প প্রশাসন বিষয়টি নিয়ে আবারও আলোচনা করে। একপর্যায়ে মার্কিন সামরিক বাহিনীকে সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার খবরও আসে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে আপাতত হামলা না চালানোর পথ বেছে নেন। নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের সামনে মূল দ্বিধা ছিল সৌদি আরবকে সহায়তা করা এবং একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি সামরিক ফ্রন্টে যুক্তরাষ্ট্রকে জড়িয়ে না ফেলা।

কেন সরাসরি যুদ্ধে যেতে চাইছে না ওয়াশিংটন?

যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থানের পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই ইরানকে ঘিরে বড় ধরনের সামরিক সংঘাতে জড়িত। এই পরিস্থিতিতে ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে নতুন করে সরাসরি অভিযান শুরু করলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দ্বিতীয়ত, হুতিদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদি ইয়েমেন সংঘাতে আবারও জড়িয়ে ফেলতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসন এর আগে হুতিদের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিমান হামলা চালালেও পরবর্তীতে সেই অভিযান বন্ধ করে যুদ্ধবিরতির দিকে যায়। ফলে এবার ওয়াশিংটন সরাসরি যুদ্ধে না গিয়ে সীমিত সহায়তার পথ অনুসরণ করছে।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণে সহায়তা করছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ ওয়াশিংটন রিয়াদকে পুরোপুরি একা ছেড়ে দেয়নি; তবে সরাসরি মার্কিন বিমান হামলায় অংশ নেওয়ার বিষয়টি থেকে আপাতত দূরে রয়েছে।

ঘনিষ্ঠ সম্পর্কেও তৈরি হচ্ছে অস্বস্তি

ট্রাম্প ও মোহাম্মদ বিন সালমানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক রয়েছে। সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও অর্থনৈতিক অংশীদারদের একটি। ফলে রিয়াদের নিরাপত্তা সংকটের সময় ওয়াশিংটনের সামরিকভাবে পিছিয়ে থাকা দুই দেশের সম্পর্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সৌদি আরবের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর। কারণ রিয়াদ বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, অস্ত্রচুক্তি ও নিরাপত্তা অংশীদারত্ব জোরদার করেছে। এখন যখন সৌদি ভূখণ্ড ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হুতিদের হামলার মুখে পড়ছে, তখন ওয়াশিংটন কতটা সামরিকভাবে পাশে দাঁড়াবে—সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, হুতিদের অগ্রযাত্রা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সীমিত সামরিক প্রতিক্রিয়া সৌদি নেতৃত্বের জন্য একটি বড় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

অস্ত্র দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, কিন্তু তাৎক্ষণিক সমাধান নয়

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের অন্যতম প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ। সম্প্রতি সৌদি আরবের জন্য সম্ভাব্য ২৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির অনুমোদনের খবরও এসেছে। তবে এই ধরনের বড় অস্ত্রচুক্তি বাস্তবায়নে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। ফলে বর্তমান হুতি হামলার তাৎক্ষণিক পরিস্থিতিতে এর প্রভাব সীমিত।

অন্যদিকে, সৌদি আরবের কাছে ইতোমধ্যেই মার্কিন তৈরি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা ও লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তাও অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু রিয়াদের মূল চাওয়া হচ্ছে হুতিদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে সরাসরি মার্কিন বিমান শক্তির ব্যবহার। সেই জায়গাতেই ওয়াশিংটনের সঙ্গে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে।

হুতিদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগও গুরুত্বপূর্ণ

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্র নিজেও হুতিদের সঙ্গে আলোচনার পথ খোলা রেখেছে। ট্রাম্প জানিয়েছেন, হুতিরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যেতে চায় না এবং মার্কিন স্বার্থে হামলা না চালানোর বিষয়ে যোগাযোগ হয়েছে।

হুতিদের পক্ষ থেকেও দাবি করা হয়েছে, তাদের লক্ষ্য মূলত সৌদি আরবের সঙ্গে সংঘাতকে কেন্দ্র করে এবং মার্কিন বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক জাহাজকে লক্ষ্য করা তাদের উদ্দেশ্য নয়। তবে এই দাবির বাস্তবতা এবং ভবিষ্যতে তা কতটা বজায় থাকবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

বাব আল-মানদেব কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

হুতিদের অগ্রযাত্রার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো বাব আল-মানদেব প্রণালির কাছাকাছি তাদের অবস্থান শক্তিশালী হওয়া। লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের মধ্যে সংযোগকারী এই সরু নৌপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহন হয়।

এই নৌপথের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে শুধু সৌদি আরব নয়, ইউরোপ, এশিয়া এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের আরেক গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যখন ইতোমধ্যেই উত্তেজনা রয়েছে, তখন বাব আল-মানদেবের পরিস্থিতি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সামনে কী হতে পারে?

বর্তমান পরিস্থিতিতে সৌদি আরব একদিকে হুতিদের সামরিক অগ্রযাত্রা ঠেকাতে চাপের মুখে রয়েছে, অন্যদিকে সরাসরি বড় ধরনের যুদ্ধ শুরু করলে সৌদি তেল অবকাঠামো ও অর্থনীতির ওপর আরও বড় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের অনিশ্চয়তা রিয়াদের কৌশলগত হিসাবকে আরও জটিল করে তুলছে।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র যদি সরাসরি হুতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামে, তাহলে ইরান-সম্পৃক্ত আঞ্চলিক সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। আর ওয়াশিংটন যদি সামরিকভাবে দূরে থাকে, তাহলে সৌদি আরবের নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে রিয়াদের মধ্যে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে পারে।

ফলে হুতিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রা এখন শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের বিষয় নয়। এটি সৌদি আরবের নিরাপত্তা, তেল রপ্তানি, বাব আল-মানদেবের নৌপথ, ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব এবং যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি নিরাপত্তা অংশীদারত্ব-সবকিছুকে একই সঙ্গে প্রভাবিত করছে। আর এই সংকটে ট্রাম্প ও মোহাম্মদ বিন সালমানের পরবর্তী সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়।