সারাবিশ্ব
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত, বাড়ছে চাপ-সমঝোতার পথে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান?
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চলমান সংঘাত যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, ততই দুই দেশের ওপর বাড়ছে কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক চাপ। দীর্ঘস্থায়ী এই সংঘাত থেকে বেরিয়ে এসে নিজেদের স্বার্থ ও মর্যাদা অক্ষুণ্ন রেখে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানের পথ খুঁজতে হচ্ছে ওয়াশিংটন ও তেহরানকে। পরিস্থিতি যত গড়াচ্ছে, ততই যুদ্ধ অবসানের প্রয়োজনীয়তা উভয় পক্ষের কাছেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
ইরানের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থনৈতিক চাপ। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা আরও বিস্তৃত হওয়ায় দেশটির অর্থনীতি ক্রমেই সংকটের দিকে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ এবং গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কার্যক্রমে এর প্রভাব পড়ছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে চলমান অচলাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু ইরান নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।
কাতারে জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক লুসিয়ানো জাকারা মনে করেন, এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান-উভয় পক্ষই তীব্র চাপের মধ্যে রয়েছে। তার মতে, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, তা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে ইরানের জন্য দৃশ্যমান কিছু অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অর্জন প্রয়োজন হবে। বিশেষ করে নিষেধাজ্ঞা শিথিল বা প্রত্যাহার এবং আন্তর্জাতিক অর্থপ্রবাহ স্বাভাবিক করার সুযোগ তেহরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ইরানের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও দুর্বল হলে সংকটের প্রভাব দেশটির অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতেও ব্যাপকভাবে পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি জ্বালানি ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হলে মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে তেহরানের জন্যও দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
অন্যদিকে, ওয়াশিংটনের জন্যও পরিস্থিতি খুব সহজ নয়। সামরিক অভিযান দীর্ঘায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রকে একদিকে সামরিক ও অর্থনৈতিক ব্যয় বহন করতে হবে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এর কূটনৈতিক প্রভাবও সামলাতে হবে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর চাপ রয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে প্রশাসনকে এমন একটি ফলাফল দেখাতে হবে, যা তারা নিজেদের পররাষ্ট্রনীতি ও সামরিক কৌশলের সাফল্য হিসেবে তুলে ধরতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এখানেই দুই দেশের স্বার্থের একটি গুরুত্বপূর্ণ মিল তৈরি হয়েছে। ইরান চাইছে অর্থনৈতিক চাপ কমাতে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অর্থপ্রবাহ স্বাভাবিক করতে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র চাইছে সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে এমন একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে, যা ওয়াশিংটনের জন্যও রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়।
ফলে সামনে সম্ভাব্য কূটনৈতিক আলোচনার পরিসর তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তবে উভয় পক্ষের অবস্থান এখনও কঠোর এবং বড় কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে হলে নিষেধাজ্ঞা, হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি, নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এবং সামরিক কার্যক্রমসহ একাধিক জটিল বিষয়ে সমাধান খুঁজতে হবে।
সব মিলিয়ে সংঘাত যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়ের ওপর একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানোর চাপ বাড়ছে। এখন মূল প্রশ্ন হলো-দুই দেশ নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান ও কৌশলগত স্বার্থ বজায় রেখে কত দ্রুত সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার পথ তৈরি করতে পারে।