সারাবিশ্ব

সর্বাত্মক যুদ্ধে নামছে সৌদি, প্রস্তুত এক লাখ সেনা 


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:০১ পিএম

সর্বাত্মক যুদ্ধে নামছে সৌদি, প্রস্তুত এক লাখ সেনা 
ছবি: সংগৃহীত

ইয়েমেনে ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতির বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে সৌদি আরব। লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উপকূলীয় এলাকায় সীমিত অভিযান অথবা ইয়েমেনের একাধিক রণাঙ্গনে একযোগে হামলার পরিকল্পনা বিবেচনা করছে রিয়াদ।

আঞ্চলিক ও পশ্চিমা কর্মকর্তাদের বরাতে শনিবার (৩ অক্টোবর) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

সংশ্লিষ্ট ছয়টি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে অভিযান শুরু হতে পারে। এতে সৌদি আরবের তত্ত্বাবধানে থাকা ইয়েমেনি বাহিনী স্থল অভিযান পরিচালনা করবে। পাশাপাশি বিমান হামলার মাধ্যমে তাদের সহায়তা করবে রিয়াদ।

ইতোমধ্যে ইয়েমেনে সম্ভাব্য অভিযানের জন্য সৌদি আরবকে গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তা করছে যুক্তরাষ্ট্র। কয়েকটি আঞ্চলিক ও ইউরোপীয় দেশও প্রতিরক্ষামূলক সামরিক সহায়তা দিচ্ছে। তবে সৌদির মিত্ররা সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেবে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

২০১৫ সালে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে হস্তক্ষেপ করে সৌদি আরব। সে সময় সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন দেয়। তবে হুতিরা রাজধানী সানা থেকে ওই সরকারকে সরিয়ে দেয়।

২০২২ সালে দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠিত হলেও ইরান যুদ্ধের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ার পর পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। চলতি বছর সৌদি জাহাজ ও তেল অবকাঠামো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করে হুতিরা।

সৌদি আরবের পরিকল্পিত অভিযানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো হুতিদের অগ্রযাত্রা ঠেকানো এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করা।

এ জন্য দুটি সম্ভাব্য সামরিক পরিকল্পনা বিবেচনা করছে রিয়াদ। প্রথম পরিকল্পনায় বাব আল-মান্দেব প্রণালিকে কেন্দ্র করে সীমিত পরিসরে অভিযান চালানোর কথা রয়েছে। দ্বিতীয় পরিকল্পনাটি আরও বিস্তৃত। এতে আল-বায়দা, মারিব, তাইজ ও আল-জাওফসহ ইয়েমেনের বিভিন্ন এলাকায় একযোগে হামলা চালানো হতে পারে।

অভিযানের ব্যাপ্তি অনুযায়ী এক লাখের বেশি ইয়েমেনি সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। তবে অভিযান শুরুর নির্দিষ্ট সময় এখনো চূড়ান্ত হয়নি। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে এটি শুরু হতে পারে। আবার নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরও অভিযান শুরুর সম্ভাবনা রয়েছে।

বাব আল-মান্দেব লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। ভূমধ্যসাগর ও এশিয়ার মধ্যে জাহাজ চলাচলের অন্যতম প্রধান পথ এটি। ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাব আল-মান্দেবের কৌশলগত গুরুত্ব আরও বেড়েছে।

পশ্চিমা কূটনীতিক ও উপসাগরীয় এক কর্মকর্তার মতে, বাব আল-মান্দেব হুতিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা অবস্থায় সৌদি আরব নতুন করে শান্তি আলোচনায় যেতে আগ্রহী নয়। কারণ গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথের নিয়ন্ত্রণ হুতিদের আঞ্চলিক প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করেছে।

সৌদি আরবে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইকেল র‍্যাটনি মনে করেন, ২০১৫ সালের সৌদি নেতৃত্বাধীন অভিযানের তুলনায় নতুন অভিযানটি ছোট পরিসরের হতে পারে। তার মতে, হুতিদের পুরোপুরি পরাজিত করার পাশাপাশি বাব আল-মান্দেবের উপকূলীয় এলাকায় আগের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনতে চাইতে পারে রিয়াদ। এতে নৌপথে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল পুনরায় চালু করা সম্ভব হবে।

এদিকে লেবাননে ইসরায়েলি অভিযানে হিজবুল্লাহ দুর্বল হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের অন্যতম শক্তিশালী মিত্র হিসেবে উঠে এসেছে হুতি। ফলে তাদের বিরুদ্ধে সৌদি নেতৃত্বাধীন নতুন অভিযান অঞ্চলটিতে বড় ধরনের সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

সৌদি আরবের প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন গোয়েন্দা তথ্য ও সামরিক উপদেষ্টার মাধ্যমে সম্ভাব্য অভিযানে সহায়তা করছে। এর মধ্যে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণসংক্রান্ত তথ্যও রয়েছে বলে জানিয়েছেন এক পশ্চিমা কূটনীতিক।

তবে মার্কিন সহায়তার পরিসর সীমিত থাকতে পারে। রয়টার্সের আগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সরাসরি বিমান হামলার মতো সামরিক সহায়তা চাইলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাতে সম্মতি দেননি।

গত মাসে সৌদি আরবের সঙ্গে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি করা তুরস্ক ও পাকিস্তানও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে। পাকিস্তানের এক সরকারি কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, গত মাসে চারটি কার্গো বিমানে করে বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, হালকা কামান, ড্রোন ও ড্রোন প্রতিরোধী সরঞ্জাম এডেনে পাঠানো হয়েছে।

পাকিস্তানের সামরিক উপদেষ্টারাও সৌদি কর্মকর্তাদের সঙ্গে ইয়েমেনে অবস্থান করছেন এবং স্থানীয় বাহিনীকে সহায়তা করছেন বলে জানিয়েছেন পাকিস্তানের এক কর্মকর্তা, উপসাগরীয় এক কর্মকর্তা ও পশ্চিমা এক কূটনীতিক। এ ছাড়া সৌদি আরবের কেনা তুরস্কের ড্রোনও ইয়েমেনে মোতায়েন করা হয়েছে।

তবে নতুন অভিযান নিয়ে সৌদি আরবের বড় উদ্বেগ হুতিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা। নিজেদের তেল স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কয়েকটি মিত্র দেশের কাছে প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সহায়তা চেয়েছে রিয়াদ।

পাকিস্তানের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সৌদি আরবের স্থলসীমান্তের নিরাপত্তা এবং ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে দেশটি ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার সেনা মোতায়েন করেছে। গত বছর থেকে কয়েক ধাপে এসব সেনা সৌদি আরবে পৌঁছেছে। তবে ইয়েমেনে সরাসরি যুদ্ধ করার জন্য পাকিস্তানি সেনা পাঠানোর কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

অন্যদিকে সৌদি আরবের লোহিত সাগর উপকূলের বন্দরনগরী ইয়ানবু রক্ষায় প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও সেনা পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে ফ্রান্স।

ইয়েমেনে সম্ভাব্য স্থল অভিযান মূলত বিভিন্ন স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর ওপর নির্ভর করবে। গৃহযুদ্ধের আগের পর্যায়গুলোতে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এসব গোষ্ঠীকে অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়েছিল। তবে দীর্ঘদিনের সংঘাতে তাদের মধ্যে বিভক্তি তৈরি হয়েছে।

গত শীতেও ইয়েমেনি বাহিনীর অভ্যন্তরীণ বিভক্তি বেড়ে যায়। সংযুক্ত আরব আমিরাত সমর্থিত দক্ষিণাঞ্চলের যোদ্ধারা পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা দখল করে বিচ্ছিন্নতার ঘোষণা দেওয়ার চেষ্টা করে। পরে একাধিক সংঘর্ষের পর সৌদি সমর্থিত বাহিনীর কাছে পরাজিত হয় তারা।