সারাবিশ্ব

বিশ্বজুড়ে ইসরায়েলের ভয়ংকর ফাঁদ, নিশানায় পেন্টাগন, ন্যাটো ও জাতিসংঘ


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:১৪ পিএম

বিশ্বজুড়ে ইসরায়েলের ভয়ংকর ফাঁদ, নিশানায় পেন্টাগন, ন্যাটো ও জাতিসংঘ
ছবি: সংগৃহীত

অনলাইন বিজ্ঞাপনের আড়ালে বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ওপর নজরদারি এবং তাদের যন্ত্রে আড়িপাতার কাজে সহায়তার অভিযোগ উঠেছে ইসরায়েলি একটি ডিজিটাল বিজ্ঞাপন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। গবেষকদের দাবি, এই নজরদারির আওতায় এসেছে পেন্টাগন, ন্যাটো ও জাতিসংঘের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার নেটওয়ার্কও।

কানাডাভিত্তিক সাইবার নজরদারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিটিজেন ল্যাব এবং নিউইয়র্কভিত্তিক বিজ্ঞাপন নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান কনফিয়েন্টের পৃথক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

প্রতিবেদন দুটিতে বলা হয়েছে, গুগল, কমকাস্ট ও রাশিয়ার ইয়ানডেক্সসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন প্ল্যাটফর্মে ইসরায়েলি স্পাইওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ক্যান্ডিরু এবং দেশটির অন্যান্য নজরদারি সংস্থার প্রবেশে সহায়তা করেছে ইসরায়েলি ডিজিটাল বিজ্ঞাপন প্রতিষ্ঠান ডিসকভার টেক। ক্যান্ডিরুকে আগেই কালো তালিকাভুক্ত করেছে মার্কিন সরকার।

গবেষণায় তুলে ধরা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগের কারণ হয়ে থাকা অনলাইন বিজ্ঞাপনব্যবস্থা কীভাবে ব্যাপক গোয়েন্দা নজরদারির হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে।

সিটিজেন ল্যাবের জ্যেষ্ঠ গবেষক উলফি ক্রিস্টল রয়টার্সকে বলেন, বর্তমানে যেভাবে অনলাইন বিজ্ঞাপন পরিচালিত হচ্ছে, তা একটি পরিকল্পিত নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করেছে। রাষ্ট্র, বেসরকারি খাত, নাগরিক সমাজ ও সাধারণ মানুষ, সবার জন্যই এটি সমান বিপজ্জনক।

সিটিজেন ল্যাবের তথ্য অনুযায়ী, ডিসকভার টেক প্রায়ই ফোন ও ইয়ারপডের মতো সাধারণ পণ্যের বিজ্ঞাপন প্রচার করত। বিভিন্ন অংশীদার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এসব বিজ্ঞাপন এক লাখ ২০ হাজারের বেশি ওয়েবসাইট এবং ৭৫ হাজার অ্যাপে পৌঁছে যেত।

গবেষকদের দাবি, ক্ষতিকর বিজ্ঞাপন থাকা ওয়েবসাইটে প্রবেশ করা কিংবা সংশ্লিষ্ট অ্যাপ ব্যবহার করা ব্যক্তিদের শনাক্ত ও অনুসরণ করতে পারত ডিসকভার টেক। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের ফোন নম্বর সংগ্রহের চেষ্টাও করা হতো। নজরদারির জন্য অনেক ক্ষেত্রে ওয়েবসাইটে বিজ্ঞাপনটি প্রদর্শিত হওয়া বা লোড হওয়াই যথেষ্ট ছিল।

দুই গবেষণা দলের দাবি, কিছু বিজ্ঞাপন ব্যবহারকারীদের যন্ত্রে ক্যান্ডিরুর তৈরি স্পাইওয়্যার স্থাপনে সহায়তা করত। তবে কনফিয়েন্ট জানিয়েছে, ক্যান্ডিরুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞাপনগুলো ডিসকভার টেকের মোট বিজ্ঞাপনের খুবই সামান্য অংশ ছিল।

কনফিয়েন্টের সহপ্রতিষ্ঠাতা জেরোম ড্যাঙ্গু বলেন, ডিসকভার টেক প্রতিদিন বিশ্বজুড়ে অন্তত এক কোটি বিজ্ঞাপন প্রচার করত। কুকি ম্যাচিং নামের একটি তথ্য বিনিময়প্রক্রিয়া ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের বিজ্ঞাপন নেটওয়ার্কের বাইরের ব্যক্তিদেরও অনুসরণ করতে পারত।

ড্যাঙ্গুর ধারণা, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্ভবত কোটি কোটি মানুষ নজরদারির আওতায় এসেছে।

২০২০ সালে প্রতিষ্ঠিত ডিসকভার টেকের ওয়েবসাইটের যোগাযোগ ফরমে বার্তা পাঠিয়েও কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে রয়টার্স। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী দেকেল বোনিকে পাঠানো ইমেইল ও লিংকডইন বার্তারও জবাব পাওয়া যায়নি। ক্যান্ডিরুর মালিকদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া মেলেনি বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারি কর্মকর্তা, সাংবাদিক, অধিকারকর্মী ও শিক্ষাবিদদের অন্যায়ভাবে লক্ষ্যবস্তু করতে স্পাইওয়্যার সরবরাহের অভিযোগে ২০২১ সালে ক্যান্ডিরুকে কালো তালিকাভুক্ত করে মার্কিন বাণিজ্য বিভাগ।

সিটিজেন ল্যাবের তথ্যমতে, ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে কাতারভিত্তিক সম্প্রচারমাধ্যম আল জাজিরার ৪৫টি উইন্ডোজচালিত যন্ত্রে প্রবেশের জন্য ডিসকভার টেকের বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে পাঠানো ক্যান্ডিরুর শক্তিশালী স্পাইওয়্যার ব্যবহার করা হয়েছিল। আল জাজিরার নেটওয়ার্ক লগ পর্যালোচনা করে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সিটিজেন ল্যাব। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে পাঠানো বার্তার জবাব দেয়নি আল জাজিরাও।

কনফিয়েন্টের সহপ্রতিষ্ঠাতা ড্যাঙ্গু বলেন, পেন্টাগন, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতসহ সংবেদনশীল কার্যক্রম পরিচালনাকারী শত শত নেটওয়ার্কের ব্যবহারকারীদের কাছে এসব ক্ষতিকর বিজ্ঞাপন পৌঁছেছিল। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের মতো কিছু এলাকায় ডিসকভার টেকের বিজ্ঞাপন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল বলেও জানান তিনি।

ড্যাঙ্গুর ভাষ্য, ফিলিস্তিনের যেকোনো ওয়েবসাইটে গেলেই ডিসকভার টেকের বিজ্ঞাপন দেখা যেত। এর ফলে একটি দেশের সামগ্রিক ডিজিটাল কর্মকাণ্ডের ওপর বিস্তারিত নজরদারির সুযোগ তৈরি হয়েছিল।

সিটিজেন ল্যাব জানিয়েছে, জাতিসংঘ, ন্যাটো, ইউরোপীয় কমিশন এবং এক ডজনের বেশি দেশের সরকারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও এসব ক্ষতিকর বিজ্ঞাপন দেখেছেন। এ ছাড়া এনভিডিয়া, স্যানডিস্ক, ব্রডকম ও মাইক্রনের মতো চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্ক এবং মেক্সিকো, ইসরায়েল ও ইউরোপের কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের নেটওয়ার্কেও এসব বিজ্ঞাপন দেখা গেছে।

ক্যান্ডিরু ও অন্যান্য নজরদারি প্রতিষ্ঠানকে শনাক্ত করার পাশাপাশি ডিসকভার টেকের ব্যবহারকারীদের অবস্থান সম্পর্কেও তথ্য সংগ্রহ করেছে সিটিজেন ল্যাব। এসব তথ্য থেকে দেখা গেছে, ব্যবহারকারীরা ইসরায়েল, ইউরোপ ও উপসাগরীয় অঞ্চলের ইন্টারনেট প্রটোকল ঠিকানা থেকে প্রবেশ করছিলেন। ডিসকভার টেক ভুলবশত নিজেদের পরিচয় যাচাইসংক্রান্ত তথ্যের নথি ইন্টারনেটে উন্মুক্ত রাখায় গবেষকেরা এসব তথ্য সংগ্রহ করতে পেরেছেন বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

এদিকে, এই নজরদারির অভিযোগের পর ডিসকভার টেককে অনলাইন বিজ্ঞাপনের বাজার থেকে সরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। গুগল এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সিটিজেন ল্যাব ও কনফিয়েন্টের তদন্তে তারা সহযোগিতা করেছে। একই সঙ্গে বিজ্ঞাপন নীতিমালা ধারাবাহিকভাবে লঙ্ঘনের অভিযোগে ডিসকভার টেককে নিজেদের বিজ্ঞাপন প্ল্যাটফর্ম থেকে নিষিদ্ধ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

ডিজিটাল বিপণন ও বিজ্ঞাপনবিষয়ক ইউরোপীয় সংস্থা আইএবি ইউরোপ জানিয়েছে, নীতিমালা লঙ্ঘনের বিষয়টি পর্যালোচনায় উঠে আসার পর গত সপ্তাহে ডিসকভার টেককে তাদের বিশ্বব্যাপী অনুমোদিত বিক্রয়কারীদের তালিকা থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে।

কমকাস্টের অধীন বিজ্ঞাপনপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান বিজওয়াক্সও সম্প্রতি সন্দেহজনক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে ডিসকভার টেককে নিজেদের প্ল্যাটফর্ম থেকে সরিয়ে দিয়েছে।

বিজ্ঞাপননির্ভর ডিজিটাল নজরদারিকে বর্তমানে জাতীয় নিরাপত্তার ক্রমবর্ধমান হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। চলতি বছরের শুরুর দিকে পেন্টাগন জানিয়েছিল, বিজ্ঞাপনপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও তথ্য ব্যবসায়ীদের সংগ্রহ করা অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য ব্যবহার করে যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েন মার্কিন সেনাদের লক্ষ্যবস্তু করার ঘটনা সম্পর্কে তারা তথ্য পেয়েছে।

এরপর থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন শাখা কয়েক ধরনের যন্ত্রে বিজ্ঞাপনভিত্তিক অনুসরণব্যবস্থা বন্ধ করে দিয়েছে।