সারাবিশ্ব

৫৭ বছর বয়সে ৫৮ সন্তানের বাবা! দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াইয়ে দিশেহারা আফগানিস্তানের সাদিক


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৫৩ পিএম

৫৭ বছর বয়সে ৫৮ সন্তানের বাবা! দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াইয়ে দিশেহারা আফগানিস্তানের সাদিক
ছবি: সংগৃহীত

আফগানিস্তানের ৫৭ বছর বয়সী মোহাম্মদ সাদিক ৫৮ সন্তানের বাবা। চার স্ত্রী ও বিশাল এই পরিবারকে নিয়ে তাঁর জীবন কাটছে চরম দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তার মধ্যে। একসময় ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে বড় পরিবার গড়ার স্বপ্ন দেখলেও বর্তমানে পরিবারের সদস্যদের মুখে দুবেলা খাবার তুলে দেওয়াই তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অর্থাভাবে প্রায়ই না খেয়ে ঘুমাতে যেতে হয় তাঁর সন্তানদের। পরিবারের ভরণপোষণ, সন্তানদের শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে রীতিমতো দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তিনি।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে মোহাম্মদ সাদিক ও তাঁর পরিবারের এমন মানবেতর জীবনযাপনের চিত্র। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সীমিত আয়ের কারণে পরিবারের ন্যূনতম চাহিদা পূরণ করাও তাঁর পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে। সামান্য উপার্জনে এত বড় সংসার চালাতে গিয়ে প্রতিনিয়ত নানা সংকটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাঁকে।

পেশায় একটি গাড়ির শোরুমের কর্মী সাদিক প্রতিটি গাড়ি বিক্রির বিপরীতে পান মাত্র ১ হাজার আফগানি। এই সামান্য অর্থ দিয়ে ৬০ জনেরও বেশি সদস্যের পরিবারের খাবার, পোশাক, চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহ করা প্রায় অসম্ভব। ফলে পরিবারের বড় সন্তানদেরও উপার্জনের কাজে নামতে হয়েছে। তারা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের জন্য প্লাস্টিক ও কাগজের মতো পরিত্যক্ত সামগ্রী সংগ্রহ করে বিক্রি করে। এভাবেই পরিবারের খরচ জোগাতে বাবার পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে তারা।

দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকটের পাশাপাশি পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবার অভাবও পরিবারটির দুর্ভোগ বাড়িয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, চিকিৎসা ও আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে সাদিক ও তাঁর স্ত্রীদের অন্তত ১৪ সন্তানকে হারাতে হয়েছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সীমাবদ্ধতা এবং পরিবারের বিপুল সদস্যের প্রয়োজন মেটাতে না পারার পরিস্থিতি তাঁদের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছে।

এত বড় পরিবারের প্রতিদিনের হিসাব সামলানোই শুধু নয়, সন্তানদের নাম মনে রাখাও সাদিকের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। সন্তানদের গুনে দেখার সময় কখনো কখনো কে কোথায় আছে, তা বুঝতে সমস্যায় পড়েন তিনি। অনেক সময় নির্দিষ্ট নাম ধরে না ডেকে ‘আমার ছেলে’ কিংবা ‘আমার সন্তান’ বলে ডাকতে হয়। এমনকি সন্তানদের বিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানেও এক মেয়ের জায়গায় অন্য মেয়ের নাম বলে ফেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। বিশাল পরিবারটির দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনা যে কতটা জটিল, এসব ঘটনা তারই ইঙ্গিত দেয়।

সাদিকের পরিবারের বসবাসের পরিবেশও অত্যন্ত নাজুক। দরজাহীন কাঁচা ঘরে দরজার পরিবর্তে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে পাতলা পর্দা। একই জায়গায় রয়েছে শৌচাগার ও থালাবাসন ধোয়ার ব্যবস্থা। শীতকালে পরিবারের সদস্যরা ঘরের ভেতরে এবং গরমের সময় উঠানে বসে খাবার খান। প্রতিদিন মাত্র দুই বেলা খাবার জোটে তাঁদের। রাতে ঘুমানোর সময় ছয় থেকে সাতজনকে ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতে হয় একটি পাতলা কম্বল। এমন অস্বাস্থ্যকর ও সংকীর্ণ পরিবেশে শিশুদের বেড়ে ওঠা এবং সুস্থভাবে বেঁচে থাকা নিয়েও উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

নিরক্ষর সাদিকের ভাষ্য অনুযায়ী, বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর অনুসারীর সংখ্যা বাড়ানোর ধর্মীয় আকাঙ্ক্ষা থেকেই তিনি বড় পরিবার গড়ে তুলেছিলেন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর সেই সিদ্ধান্তের আর্থিক ও সামাজিক চাপ এখন প্রকট হয়ে উঠেছে। বর্তমানে নিজের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন এই বাবা চান, তাঁর সন্তানেরা অন্তত মৌলিক শিক্ষার সুযোগ পাক এবং পর্যাপ্ত খাবার খেয়ে জীবনধারণ করতে পারুক। এ জন্য তিনি আফগান সরকার, আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থা ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা কামনা করেছেন।

সাদিকের পরিবারের এই পরিস্থিতি আফগানিস্তানের প্রত্যন্ত অঞ্চলে দারিদ্র্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতার মতো দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোকে সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে নারীদের অল্প বয়সে বিয়ে এবং ঘন ঘন গর্ভধারণের ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সাদিকের চার স্ত্রীর বিয়ে হয়েছিল মাত্র ১৩ থেকে ১৬ বছর বয়সের মধ্যে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অল্প বয়সে গর্ভধারণ এবং পরপর একাধিকবার সন্তান জন্ম দেওয়া নারীদের স্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এতে মা ও নবজাতকের জটিলতা, অপুষ্টি এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যসমস্যার আশঙ্কা বাড়ে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে পর্যাপ্ত চিকিৎসক, হাসপাতাল ও মাতৃস্বাস্থ্যসেবার অভাব এসব ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

মোহাম্মদ সাদিকের জীবনসংগ্রাম তাই কেবল একজন বাবার বিশাল সংসার সামলানোর গল্প নয়; এটি দারিদ্র্য, অপুষ্টি, শিক্ষার অভাব এবং মাতৃস্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতায় জর্জরিত একটি পরিবারের বাস্তব চিত্র। তাঁর সবচেয়ে বড় চাওয়া এখন আর বড় পরিবার নিয়ে স্বপ্ন দেখা নয়, বরং সন্তানদের জন্য নিশ্চিত খাবার, শিক্ষা, চিকিৎসা ও তুলনামূলক নিরাপদ জীবন গড়ে তোলা।