সারাদেশ

নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে পদ্মায় মা ইলিশ শিকার, নদীর পাড়ে জমজমাট বিক্রি


সারাদেশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৫৩ পিএম

নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে পদ্মায় মা ইলিশ শিকার, নদীর পাড়ে জমজমাট বিক্রি
ছবি: সংগৃহীত

সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে শরীয়তপুরের পদ্মা নদীতে চলছে মা ইলিশ শিকার। জেলার জাজিরা, নড়িয়া, ভেদরগঞ্জ ও গোসাইরহাট উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় নৌকা ও ট্রলার নিয়ে ইলিশ ধরার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে নদীর পাড়ে অস্থায়ী বাজার বসিয়ে প্রকাশ্যেই বিক্রি করা হচ্ছে মা ইলিশ। প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগের নিয়মিত অভিযান সত্ত্বেও শিকার ও বেচাকেনা বন্ধ না হওয়ায় ইলিশের প্রজনন এবং ভবিষ্যৎ উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

মা ইলিশের প্রজনন নির্বিঘ্ন রাখা এবং ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার ৮ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত টানা ২২ দিন ইলিশ আহরণ, পরিবহন, মজুত, বাজারজাত ও কেনাবেচা নিষিদ্ধ করেছে। এ সময়ে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইলিশ ধরা ও বিক্রির বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং মৎস্য বিভাগের অভিযান পরিচালনার কথা রয়েছে। তবে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই শরীয়তপুরের পদ্মার বিভিন্ন এলাকায় ইলিশ শিকার ও বিক্রির অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।

বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) জাজিরা উপজেলার পালেরচর, মাঝিরঘাট, কাথুরিয়া, পাইলান মোল্লারকান্দি, বড়কান্দি, বিলাসপুর ও নাওডোবাসহ পদ্মার বিভিন্ন পয়েন্টে নৌকা ও ট্রলার নিয়ে ইলিশ শিকারের অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে বিলাসপুর এলাকায় নদীর পাড়ে প্রকাশ্যে ইলিশ বিক্রি করতে দেখা গেছে। সেখানে মাছ কিনতে ক্রেতাদের ভিড়ও ছিল বলে জানা গেছে। নিষেধাজ্ঞা চলাকালে এভাবে ইলিশ বিক্রি হওয়ায় আইন প্রয়োগ ও নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

শুধু জাজিরা নয়, জেলার অন্যান্য উপজেলাতেও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। ভেদরগঞ্জ উপজেলার কাচিকাটা নতুন বাজার ও শরীয়তপুর-চাঁদপুর ফেরিঘাট এলাকায় অস্থায়ীভাবে ইলিশ বিক্রির খবর পাওয়া গেছে। নড়িয়া উপজেলার চরআত্রা, নওপাড়া ও সুরেশ্বর এবং গোসাইরহাট উপজেলার কুচাইপট্টি, আবুপুর ও কোদালপুর এলাকাতেও নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ইলিশ কেনাবেচার অভিযোগ রয়েছে। নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে অস্থায়ী বাজার গড়ে ওঠায় স্থানীয়ভাবে মাছের বেচাকেনা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু জেলে ইলিশ শিকারে শক্তিশালী ‘ফাইটার ইঞ্জিন’ ব্যবহার করছেন। এসব নৌকা ও ট্রলার দ্রুত চলাচল করতে পারায় অভিযানকারী দলের উপস্থিতি টের পেলেই তারা সহজে সরে পড়ছেন। ফলে অনেক ক্ষেত্রে জেলেদের শনাক্ত করা এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, নিষেধাজ্ঞার পুরো সময়জুড়ে এভাবে মা ইলিশ শিকার অব্যাহত থাকলে প্রজনন ব্যাহত হতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে ইলিশের বংশবৃদ্ধি ও ভবিষ্যৎ উৎপাদনেও।

এদিকে প্রয়োজনীয় জলযান ও সরঞ্জামের সীমাবদ্ধতার কারণে অভিযান পরিচালনায় সমস্যার কথা জানিয়েছে জেলা মৎস্য বিভাগ। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ কুমার দেব বলেন, মৎস্য বিভাগের পর্যাপ্ত নিজস্ব স্পিডবোট নেই। এ কারণে অধিকাংশ এলাকায় ট্রলার ভাড়া করে অভিযান পরিচালনা করতে হচ্ছে। পাশাপাশি জনবল, সরঞ্জাম ও অন্যান্য লজিস্টিক সুবিধারও সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

তিনি আরও জানান, ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের মেয়াদ গত ৩০ জুন শেষ হওয়ায় লজিস্টিক সহায়তা কমেছে। বর্তমানে সরকারি রাজস্ব খাতের বরাদ্দ থেকে অভিযানের ব্যয় বহন করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও পরিবহন সুবিধার ঘাটতি থাকায় নদীর বিস্তীর্ণ এলাকায় একযোগে নজরদারি চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে।

জেলা মৎস্য বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, ৮ থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত পরিচালিত অভিযানে প্রায় ৪১ লাখ মিটার অবৈধ জাল জব্দ করে ধ্বংস করা হয়েছে। এ সময় ১১৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আরও ২০ জনকে মোট এক লাখ চার হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে অভিযান ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা অব্যাহত থাকলেও পদ্মার বিভিন্ন এলাকায় মা ইলিশ শিকার ও বিক্রির অভিযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, মা ইলিশের প্রজনন মৌসুমে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রাখা ইলিশের উৎপাদন ও সম্পদ সংরক্ষণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য নদীর ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে নজরদারি বাড়ানো, পর্যাপ্ত জলযান ও জনবল নিশ্চিত করা এবং অবৈধভাবে মাছ ধরা ও বিক্রির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেদের সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করা এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। অন্যথায় নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও মা ইলিশ শিকার বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।