সারাবিশ্ব

কলকাতায় হোটেল বন্ধ, বিপাকে হাজার হাজার বাংলাদেশি পর্যটক


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৪৪ পিএম

কলকাতায় হোটেল বন্ধ, বিপাকে হাজার হাজার বাংলাদেশি পর্যটক
ছবি: সংগৃহীত

কলকাতার নিউমার্কেট এলাকায় একের পর এক হোটেল বন্ধ করে দেওয়ায় বিপাকে পড়েছেন সেখানে অবস্থানরত হাজারো বাংলাদেশি পর্যটক। মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নয়জনের মৃত্যুর পর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা যাচাইয়ে অভিযান শুরু করেছে কলকাতা পুলিশ, পৌরসভা, দমকল ও বিদ্যুৎ বিভাগ।

অভিযানের মাত্র দুই দিনের মধ্যে কলকাতার ‘মিনি বাংলাদেশ’ হিসেবে পরিচিত মারকুইজ স্ট্রিট, কলিন স্ট্রিট, সদর স্ট্রিট ও মির্জা গালিব স্ট্রিট এলাকার ২২১টি হোটেল এবং নয়টি রেস্তোরাঁ বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তাবিধি না মানায় কয়েকটি হোটেলের বিদ্যুৎ সংযোগও বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।

পর্যটকদের নিরাপত্তায় ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা আগেই জানিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। মির্জা গালিব স্ট্রিটের অগ্নিকাণ্ডের পর ওই দিন সন্ধ্যা থেকেই নিউমার্কেট থানার পুলিশ হোটেলগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা পরীক্ষা শুরু করে। অভিযানে উপমুখ্যমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালও অংশ নেন এবং কয়েকটি হোটেল বন্ধ করে দেওয়া হয়।

এরই মধ্যে কলকাতা পুলিশ, কলকাতা পৌরসভা, দমকল ও বিদ্যুৎ বিভাগের সমন্বয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি কলকাতার সাড়ে তিন হাজারের বেশি হোটেলের নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যালোচনা করবে। তবে নিউমার্কেট এলাকায় এই অভিযান সবচেয়ে কঠোরভাবে পরিচালিত হচ্ছে।

হোটেল বন্ধের ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন বাংলাদেশি পর্যটকেরা। বর্তমানে কলকাতায় প্রায় ১১ হাজার বাংলাদেশি পর্যটক অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে। এর মধ্যে প্রায় সাত হাজার পর্যটক নিউমার্কেট এলাকায় রয়েছেন। হোটেল ছাড়তে বাধ্য হয়ে অনেকে নতুন থাকার জায়গা খুঁজছেন, আবার কেউ নির্ধারিত সময়ের আগেই দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

নতুন হোটেল খুঁজে পেলেও গুনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা। পর্যটকদের অভিযোগ, কোথাও কোথাও আগের তুলনায় দেড় থেকে দ্বিগুণ পর্যন্ত ভাড়া চাওয়া হচ্ছে। দালালের মাধ্যমে হোটেল খুঁজতে গিয়ে অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে।

কলকাতার পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরাও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। নিউমার্কেট এলাকায় বাংলাদেশি পর্যটকদের ঘিরে গড়ে উঠেছে হোটেল, খাবারের দোকান, পরিবহন, কেনাকাটা ও বিভিন্ন সেবার ব্যবসা। ফলে হোটেল বন্ধের প্রভাব পুরো স্থানীয় অর্থনীতিতেই পড়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।

কলকাতার গ্রিন লাইন পরিবহনের শ্যামল ঘোষ বলেন, সীমান্ত থেকে বাসগুলো প্রায় পূর্ণ যাত্রী নিয়ে কলকাতায় আসছে। কিন্তু পর্যটকদের থাকার মতো পর্যাপ্ত হোটেল এখন পাওয়া যাচ্ছে না। আশপাশের এলাকায় হোটেল খুঁজতে গিয়ে পর্যটকদের বেশি ভাড়া দিতে হচ্ছে। তবে তিনি সরকারের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা কঠোর করার উদ্যোগকে সমর্থন জানিয়ে হোটেল মালিকদের কিছুটা সময় দেওয়ার আহ্বান জানান।

সোমবার (২৪ আগস্ট) সকাল থেকেই নিউমার্কেট এলাকায় পর্যটকদের হোটেল ছেড়ে বের হয়ে যেতে দেখা যায়। এ ঘটনায় অনেক পর্যটক ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। স্থানীয় রিকশাচালক থেকে শুরু করে বিভিন্ন পেশার মানুষও হোটেল বন্ধের কারণে ব্যবসায়িক ক্ষতির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, দীর্ঘ বিরতির পর পর্যটন ভিসা চালু হওয়ায় বাংলাদেশি পর্যটকের সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছিল। এমন সময়ে বিপুলসংখ্যক হোটেল বন্ধ হয়ে যাওয়া তাদের জন্য বড় ধাক্কা। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পর্যটকদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনো আপস করা হবে না। অগ্নিনিরাপত্তা বিধি না মানা হোটেলের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক হোটেল মালিক জানান, তার হোটেলে প্রায় ৫০ জন বাংলাদেশি পর্যটক অবস্থান করছিলেন। সোমবার তাদের হোটেল ছেড়ে দিতে বলা হয়।

নিউমার্কেটের একটি হোটেলের কর্মচারী সেলিম বলেন, ব্যবসার অবস্থা এমনিতেই খারাপ। মির্জা গালিব স্ট্রিটে অগ্নিকাণ্ডের পর তাদের হোটেলেও বন্ধের নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এতে তারা বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়েছেন।

চিকিৎসার জন্য কলকাতায় যাওয়া ঢাকার বাসিন্দা নাসিব পাপ্পুও হোটেল ছাড়ার এমন পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন। তিনি জানান, বাংলাদেশ থেকে কলকাতায় যাওয়ার পর একটি হোটেলে ওঠেন। তখন তাকে হোটেল ছাড়ার বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি। পরে বাইরে থেকে ফিরে হোটেল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে জানতে পারেন, থানার নির্দেশে তাদের হোটেল ছাড়তে হবে। পরদিন সকাল ১০টার মধ্যে তাকে হোটেল ছাড়তে বলা হয়।

নাসিব বলেন, চিকিৎসার জন্য কলকাতায় গিয়ে আবাসন নিয়ে এমন সমস্যায় পড়তে হবে ভাবেননি। এ ধরনের পরিস্থিতির কারণে ভবিষ্যতে কলকাতায় যাওয়ার বিষয়টি নতুন করে ভাবতে হবে বলেও জানান তিনি।

তার আশঙ্কা, দীর্ঘদিন পর পর্যটন ভিসা চালু হওয়ার পরও যদি বাংলাদেশি পর্যটকদের এমন ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়, তাহলে অনেকেই ভবিষ্যতে কলকাতামুখী হওয়ার বিষয়ে অনাগ্রহী হয়ে পড়তে পারেন।

এর আগে মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) গভীর রাতে নিউমার্কেটের ১৫জি, মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এতে নয়জনের মৃত্যু হয়। নিহতদের মধ্যে সাতজন বাংলাদেশি এবং দুজন ভারতীয় নাগরিক ছিলেন। নিহতদের মধ্যে ছয়জন পুরুষ, দুজন নারী ও একটি শিশু ছিল।

নিহত বাংলাদেশিরা হলেন আকরাম আলী (৭৪), দেবাশীষ দত্ত (৩৯), আফসানা শিরমিন (২৭), সর্নাশীষ দত্ত (২), বাবু আহমেদ (৩৭), রেবতী সরকার এবং এস. এম. আলিমুজ্জামান।

নিহত দুই ভারতীয় নাগরিক হলেন ঝাড়খণ্ডের বাসিন্দা সন্দীপ পাশওয়ান (১৯) এবং শিলিগুড়ির বাসিন্দা যোগ নারায়ণ আগারওয়াল (৬৮)।