সারাবিশ্ব

উচ্ছেদ হওয়া ১,৪০০ মুসলিম পরিবারের জমিতে আদানি বিদ্যুৎ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:৩৯ পিএম

উচ্ছেদ হওয়া ১,৪০০ মুসলিম পরিবারের জমিতে আদানি বিদ্যুৎ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর
ছবি: সংগৃহীত

আসামের ধুবড়ি জেলায় ১,৪০০-এর বেশি বাঙালি বংশোদ্ভূত মুসলিম পরিবারের বসতবাড়ি উচ্ছেদ করে যে জমি খালি করা হয়েছিল, সেখানেই আদানি পাওয়ার লিমিটেডের ৩ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে। গত ২০ সেপ্টেম্বর আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা চাপর এলাকায় প্রকল্পটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। প্রায় ৪৮ হাজার কোটি রুপি বিনিয়োগে নির্মিতব্য প্রকল্পটি আল্ট্রা-সুপারক্রিটিক্যাল প্রযুক্তির কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার কথা রয়েছে।

প্রকল্পটি ধুবড়ি জেলার চাপর রাজস্ব চক্রের চারুয়াবাখরা, চিরাকুটা-১, চিরাকুটা-২ ও সন্তোষপুর এলাকায় নির্মাণ করা হবে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে এসব এলাকায় প্রায় ১ হাজার ১৫৭ একর সরকারি জমিতে বসবাসকারী ১ হাজার ৪০০টির বেশি পরিবারের ঘরবাড়ি উচ্ছেদ করে আসাম সরকার। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের অনেকেই ওই এলাকায় তিন থেকে চার দশক ধরে বসবাস করছিলেন। উচ্ছেদের ফলে প্রায় ১০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হন বলে সে সময়ের প্রতিবেদনে উঠে আসে।

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ করা জমিটি প্রথমে আসাম পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (APDCL) অধীনে ছিল। পরবর্তীতে প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য জমিটি আদানি পাওয়ারকে দেওয়া হয়। ফলে উচ্ছেদের পর ওই জমিতেই এখন বড় আকারের বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কাজ শুরু হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

উচ্ছেদ অভিযানে ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের অভিযোগ, সরকারি জমির পাশাপাশি এমন জমিতেও উচ্ছেদ চালানো হয়েছে যেখানে কিছু পরিবারের জমির মালিকানা বা পাট্টার কাগজপত্র ছিল। Scroll-এর প্রতিবেদনে স্থানীয় বাসিন্দা আবদুর রশিদ শেখের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, প্রায় ৩ হাজার ৫০০ বিঘা সরকারি জমির পাশাপাশি আরও প্রায় ১ হাজার ৭০০ বিঘা জমি নেওয়া হয়, যেখানে জমির কাগজপত্র থাকা মানুষও বসবাস করতেন। তার দাবি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও পাট্টাধারীদের একটি বড় অংশ ক্ষতিপূরণ পাননি।

ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাইজার আলগা এলাকায় প্রায় ৩০০ বিঘা জমি বরাদ্দের কথা জানানো হয়েছিল। পাশাপাশি ঘরবাড়ির মালামাল সরিয়ে নিতে পরিবারপ্রতি এককালীন ৫০ হাজার রুপি সহায়তার কথাও বলা হয়। তবে ক্ষতিগ্রস্তদের একাংশ ওই এলাকায় যেতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন। তাদের দাবি, পুনর্বাসনের জন্য নির্ধারিত জায়গাটি ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত নিচু চরাঞ্চল হওয়ায় সেখানে বসবাস করা ঝুঁকিপূর্ণ।

প্রকল্পের পরিবেশগত অনুমোদনের প্রক্রিয়াতেও বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পরিবেশগত ছাড়পত্রের আবেদনে আদানি পাওয়ার কর্তৃপক্ষ প্রকল্প এলাকায় কোনো জনবসতি নেই এবং পুনর্বাসন বা পুনর্বাসন-সংক্রান্ত কোনো দাবি নেই বলে উল্লেখ করেছিল। কিন্তু উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর বক্তব্য এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাদের দাবি, প্রকল্পের জায়গা প্রস্তুত করার আগেই প্রশাসনের উচ্ছেদ অভিযানে তাদের বসতবাড়ি সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

প্রকল্পের ভূমি ব্যবহারের প্রক্রিয়াতেও বিষয়টি সামনে এসেছে। সরকারি নথি ও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ জেলা প্রশাসন গবাদিপশুর চারণভূমি হিসেবে ব্যবহৃত সরকারি ‘ভিলেজ গ্রেজিং ল্যান্ড’ প্রকল্পের কাজে ব্যবহারের জন্য রূপান্তরের প্রস্তাব দেয়। ২ এপ্রিলের জেলা পর্যায়ের ভূমি-সংক্রান্ত উপদেষ্টা সভার কার্যবিবরণীতেও বিষয়টি নথিভুক্ত হয়। এর পরই উচ্ছেদের নোটিশ দেওয়া এবং ঘরবাড়ি ভেঙে ফেলার প্রক্রিয়া শুরু হয়।

অন্যদিকে, আদানি গ্রুপ প্রকল্পটিকে আসামের বিদ্যুৎ ও শিল্প অবকাঠামো সম্প্রসারণের বড় উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরেছে। কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, নির্মাণ পর্যায়ে প্রায় ২০ হাজার এবং প্রকল্প চালু হলে প্রায় ৫ হাজার কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। প্রকল্পটি ধাপে ধাপে ২০৩০ সালের ডিসেম্বর থেকে চালুর লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।

ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা প্রকল্পটিকে আসামের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ প্রকল্প হিসেবে উল্লেখ করেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, আসামে বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে এবং নতুন এই প্রকল্প রাজ্যের ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। অন্যদিকে, আদানি গ্রুপের পরিচালক জিৎ আদানি উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সম্প্রসারণের কথা তুলে ধরে প্রকল্পটিকে বৃহত্তর বিনিয়োগ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বর্ণনা করেন।

তবে প্রকল্পটি ঘিরে শুধু ভূমি উচ্ছেদ নয়, বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। The Reporters’ Collective-এর ২০২৬ সালের মার্চের এক অনুসন্ধানে সরকারি নথি বিশ্লেষণ করে দাবি করা হয়, ৩ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ চুক্তির আওতায় আসাম ভবিষ্যতে ব্যবহার করতে না পারা অতিরিক্ত বিদ্যুতের জন্যও অর্থ পরিশোধ করতে পারে। তাদের হিসাব অনুযায়ী, পাঁচ বছরে এই সম্ভাব্য ব্যয়ের পরিমাণ ১২ হাজার ৫০০ কোটি রুপির বেশি হতে পারে। তবে এটি ওই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের হিসাব ও মূল্যায়ন; চূড়ান্ত সরকারি ব্যয় হিসেবে এটিকে উপস্থাপন করা হচ্ছে না।

এ বিষয়ে আসাম সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে রাজ্যের বিদ্যুতের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। The Reporters’ Collective-এর প্রতিবেদনে সরকারি পক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০৩২-৩৩ অর্থবছরের মধ্যে রাজ্যের সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদা প্রায় ৫ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে। একই প্রতিবেদনে কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের (CEA) পরিকল্পনার সঙ্গে রাজ্যের অতিরিক্ত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ চুক্তির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে পার্থক্যের কথাও তুলে ধরা হয়েছে।

এদিকে, প্রকল্পের পরিবেশগত ছাড়পত্রের প্রক্রিয়াও এগিয়েছে। কেন্দ্রীয় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অধীন বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন কমিটি ২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রকল্পটির পরিবেশগত ছাড়পত্র দেওয়ার সুপারিশ করে। এর আগে মন্ত্রণালয়ের নথিতে ৩ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার চার ইউনিটের কয়লাভিত্তিক আল্ট্রা-সুপারক্রিটিক্যাল তাপবিদ্যুৎ প্রকল্প হিসেবে এর বিবরণ দেওয়া হয়েছিল।

আসামে উচ্ছেদ অভিযান নিয়ে বিতর্কের মধ্যে সর্বশেষ ধুবড়ির ঘটনাটি আরও আলোচনায় এসেছে। এরই মধ্যে ২০২৬ সালের ৭ সেপ্টেম্বর গোয়ালপাড়া জেলার মাতিয়া রাজস্ব চক্রে ৭৩টি পরিবারের বাড়ি উচ্ছেদ করা হয়। প্রশাসনের দাবি ছিল, কৃষিজমির শ্রেণি পরিবর্তনের প্রয়োজনীয় অনুমতি ছাড়াই সেখানে বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছিল। তবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর আবেদনের পর গৌহাটি হাইকোর্ট উচ্ছেদের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বাসিন্দাদের মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঘর সরিয়ে নেওয়ার নোটিশ দেওয়া হয়েছিল এবং তাদের বক্তব্য উপস্থাপনের পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আদালত প্রাথমিক পর্যায়ে ওই উচ্ছেদকে ‘অননুমোদিত’ ও ‘বেআইনি’ বলে প্রতীয়মান হওয়ার কথা উল্লেখ করে প্রশাসনের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে। তবে মামলাটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখনো হয়নি।

ধুবড়ির বিদ্যুৎ প্রকল্পের ক্ষেত্রে এখন মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে-উন্নয়ন ও বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য জমি ব্যবহারের পাশাপাশি উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর পুনর্বাসন, ক্ষতিপূরণ এবং তাদের অধিকার কীভাবে নিশ্চিত করা হবে। একদিকে সরকার ও প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বিদ্যুৎ উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনার কথা বলছে; অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো তাদের হারানো বসতভিটা, অসম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। প্রকল্পের নির্মাণ এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই দুই দিকের ভারসাম্য কীভাবে নিশ্চিত করা হয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।