জাতীয়

চীন বাংলাদেশকে দিচ্ছে বিনামূল্যে ২০টি রেল ইঞ্জিন


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১২:৪৮ পিএম

চীন বাংলাদেশকে দিচ্ছে বিনামূল্যে ২০টি রেল ইঞ্জিন
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য ২০টি মিটারগেজ (এমজি) ডিজেল-ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ কেনার জন্য চীন ১২৯ কোটি ৫৪ লাখ ডলার (প্রায় ১ হাজার ৫৯১ কোটি টাকা) অনুদান দিচ্ছে। রেল কর্মকর্তারা মনে করছেন, দীর্ঘদিন ধরে পুরোনো ইঞ্জিনের কারণে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা নিরসনে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

রেল মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যেই ‘চায়না গ্রান্টের আওতায় বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য ২০টি মিটারগেজ ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ সংগ্রহ’ শীর্ষক প্রস্তাব অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) ও পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে। প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবের (পিডিপিপি) অনুমোদন দ্রুত করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

পিডিপিপি অনুযায়ী, প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকা (প্রায় ১৩৩ কোটি ১২ লাখ ডলার)। এর মধ্যে চীনের অনুদান ১ হাজার ৫৯১ কোটি টাকা এবং সরকারি তহবিল থেকে ৪৪ কোটি টাকা (প্রায় ৩ কোটি ৫৮ লাখ ডলার) যোগ করা হবে। প্রকল্পটি ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু হয়ে ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন হবে। এই সময়ে ২০টি লোকোমোটিভের সরবরাহ ছাড়াও খুচরা যন্ত্রাংশ, সরঞ্জাম এবং বাংলাদেশি প্রকৌশলী ও মেকানিকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও থাকবে, যা প্রযুক্তি ও জ্ঞানের স্থানান্তর নিশ্চিত করবে।

বর্তমান রেল বহরে মোট ৩০৬টি লোকোমোটিভ রয়েছে, যার মধ্যে ১৭৪টি মিটারগেজ এবং ১৩২টি ব্রডগেজ। তবে এমজি লোকোমোটিভের অধিকাংশই ২০ বছরের নকশাগত আয়ুষ্কাল অতিক্রম করেছে। বিশেষ করে, ১২৪টি এমজি ইঞ্জিন অর্থাৎ বহরের ৭১ শতাংশ নকশাগতভাবে পুরনো। এর মধ্যে ৬৮টি ইঞ্জিন ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে এবং ৮৪টি ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে ব্যবহার হচ্ছে। প্রকৌশলীরা বলছেন, এত পুরোনো ইঞ্জিন সচল রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।

এক জ্যেষ্ঠ রেল কর্মকর্তা জানান, “পুরোনো ইঞ্জিন রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের খরচ উৎপাদনক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি। নির্ভরযোগ্যতা কমে যাওয়ায় ট্রেন বিলম্ব বা বাতিল হওয়া প্রায় অনিবার্য। দ্রুত নতুন লোকোমোটিভ সংগ্রহ না করলে পূর্বাঞ্চলসহ বিভিন্ন এমজি রুটে চলাচল বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।”

২০২০ সালের ওয়ার্কিং টাইম টেবিল অনুযায়ী, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও লালমনিরহাট বিভাগের এমজি রুটে ২০৩টি লোকোমোটিভের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বর্তমানে সক্রিয় আছে মাত্র ১৮২টি, অর্থাৎ অন্তত ২১টির ঘাটতি। ২০২০ সালের পর যাত্রী ও মালবাহী পরিবহনের চাহিদা আরও বেড়েছে। সংকটের কারণে আন্তঃনগর ট্রেন অগ্রাধিকার পায়, ফলে মালবাহী ও লোকাল ট্রেন সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

সরকারের অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় রেলওয়ের যাত্রী পরিবহন অংশীদারিত্ব ১০ শতাংশ এবং মালবাহী পরিবহন ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। কিন্তু ২০১৭-২০২১ সালের প্রথম ধাপে সুপারিশ করা ৭৪টি প্রতিস্থাপনযোগ্য এবং ৩৭টি নতুন লোকোমোটিভের মধ্যে মাত্র ৩০টি কেনা হয়েছে। ২০১১ সালে ৭০টি এমজি লোকোমোটিভ কেনার পরিকল্পনা অর্থসংকটে বাতিল হওয়ায় রেলওয়ে এখনও পুরোনো বহরের ওপর নির্ভর করছে।

নতুন ২০টি চীনা লোকোমোটিভ আসার পর যাত্রী ও মালবাহী পরিবহনে সেবা সম্প্রসারণ সম্ভব হবে। রক্ষণাবেক্ষণ খরচ কমবে, আধুনিক ইঞ্জিন নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য চলাচল নিশ্চিত করবে এবং আয় বাড়াবে। তবে রেল কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলছেন, চীনের এই অনুদান কিছুটা স্বস্তি দেবে, কিন্তু এমজি ও ব্রডগেজ উভয় ধরনের বহরে আরও বড় বিনিয়োগের প্রয়োজন। দীর্ঘমেয়াদে না হলে রেলওয়ে নির্ভরযোগ্য পরিবহন হিসেবে যাত্রী ও মালবাহী উভয় বাজারেই বিশ্বাসযোগ্যতা হারাতে পারে।