জাতীয়
সর্বোচ্চ ৭ টাকা ১১ পয়সায় সৌরবিদ্যুৎ কিনবে পিডিবি
বেসরকারি বাণিজ্যিক সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেনার দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সংযোগের ভোল্টেজের ওপর ভিত্তি করে প্রতি ইউনিট সৌরবিদ্যুতের দাম হবে ৬ টাকা ৯৮ পয়সা থেকে সর্বোচ্চ ৭ টাকা ১১ পয়সা। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বাণিজ্যিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিতে সরকারি সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থা ব্যবহারের জন্য ‘ওপেন অ্যাকসেস ট্যারিফ’ও নির্ধারণ করেছে কমিশন।
বুধবার এক বিজ্ঞপ্তিতে বিইআরসি জানিয়েছে, আগামী অক্টোবর থেকে নির্ধারিত নতুন হার কার্যকর হবে। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, সৌরবিদ্যুৎভিত্তিক বাণিজ্যিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে একক ক্রেতা হিসেবে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) বিদ্যুৎ কিনতে পারবে। ৩৩ কিলোভোল্ট (কেভি) সংযোগের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিটের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ টাকা ৯৮ পয়সা। আর ১৩২ কেভি সংযোগের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিট সৌরবিদ্যুতের দাম হবে ৭ টাকা ১১ পয়সা।
এদিকে বাণিজ্যিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বা মার্চেন্ট পাওয়ার প্ল্যান্ট (এমপিপি) থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরাসরি বড় গ্রাহকের কাছে বিক্রির সুযোগও থাকছে। এ ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ উৎপাদক ও ক্রেতা নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করতে পারবেন। তবে সরকারি সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো ব্যবহার করে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হলে নির্ধারিত হারে আলাদা মাশুল পরিশোধ করতে হবে।
সরকারি সঞ্চালন ও বিতরণ লাইন ব্যবহারের এই মাশুলকে ‘ওপেন অ্যাকসেস ট্যারিফ’ বলা হচ্ছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র ও গ্রাহকের সংযোগের ধরন অনুযায়ী এই মাশুল প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ২২ পয়সা থেকে সর্বোচ্চ ১ টাকা ৯০ দশমিক ৯৭ পয়সা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিইআরসির বিজ্ঞপ্তিতে তিন ধরনের সংযোগের জন্য আলাদা মাশুল নির্ধারণ করা হয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র সরাসরি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত এবং গ্রাহক সরকারি বিতরণ সংস্থার মাধ্যমে বিদ্যুৎ গ্রহণ করলে সঞ্চালন ভোল্টেজ অনুযায়ী মাশুল দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে ২৩০ কেভি সংযোগে প্রতি ইউনিটের মোট মাশুল ১ টাকা ৫৯ দশমিক ৮৯ পয়সা, ১৩২ কেভিতে ১ টাকা ৬০ দশমিক ২৫ পয়সা এবং ৩৩ কেভিতে ১ টাকা ৬০ দশমিক ৯৭ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই মোট মাশুলের মধ্যে সঞ্চালন, বিতরণ, বিদ্যুতের হিসাব ব্যবস্থাপনা এবং বিল নিষ্পত্তির খরচ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সঞ্চালন মাশুল ২৩০ কেভিতে প্রতি ইউনিটে ৩৭ দশমিক ৮৯ পয়সা, ১৩২ কেভিতে ৩৮ দশমিক ২৫ পয়সা এবং ৩৩ কেভিতে ৩৮ দশমিক ৯৭ পয়সা। বিদ্যুৎ গ্রহণের প্রান্তে বিতরণ মাশুল ধরা হয়েছে প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ১৭ পয়সা। পাশাপাশি হিসাব ব্যবস্থাপনা ও বিল নিষ্পত্তির জন্য আরও ৫ পয়সা দিতে হবে।
বিদ্যুৎকেন্দ্র ও গ্রাহক যদি সঞ্চালন ব্যবস্থার দুই প্রান্তে আলাদা বিতরণ সংস্থার আওতায় থাকে, তাহলে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রান্তে অতিরিক্ত ৩০ পয়সা বিতরণ মাশুল প্রযোজ্য হবে। ফলে ২৩০ কেভি সংযোগে মোট মাশুল দাঁড়াবে প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ৮৯ দশমিক ৮৯ পয়সা। ১৩২ কেভিতে তা হবে ১ টাকা ৯০ দশমিক ২৫ পয়সা এবং ৩৩ কেভিতে ১ টাকা ৯০ দশমিক ৯৭ পয়সা।
তবে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও গ্রাহক একই বিতরণ সংস্থার আওতায় থাকলে অতিরিক্ত ৩০ পয়সার মাশুল দিতে হবে না। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রান্তে বিতরণজনিত লসও আরোপ করা হবে না। এ ক্ষেত্রে সব পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিকে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) আওতাধীন একটি সংস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
অন্যদিকে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও গ্রাহক একই বিতরণ সংস্থার আওতায় থাকলে এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য কোনো সঞ্চালন ব্যবস্থা ব্যবহার না করা হলে মোট ওপেন অ্যাকসেস মাশুল হবে প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ২২ পয়সা।
মাশুলের পাশাপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহের সময় সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থায় বিদ্যুতের অপচয় বা লসের হিসাবও প্রযোজ্য হবে। সঞ্চালন লসের ক্ষেত্রে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি প্রতি মাসে যে প্রকৃত গড় হার প্রকাশ করবে, সেটিই বিবেচনায় নেওয়া হবে। আর বিতরণ লসের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ভোল্টেজ পর্যায়ে সর্বশেষ সমাপ্ত অর্থবছরের অর্জিত হার প্রযোজ্য হবে।
বিতরণ সংস্থাভেদেও পৃথক মাশুল নির্ধারণ করেছে বিইআরসি। পিডিবির জন্য প্রতি ইউনিটে এই হার ৭০ পয়সা। পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের জন্য ১ টাকা ৪৩ পয়সা, ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) ৮৫ পয়সা এবং ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো) ৯৯ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির জন্য ৮৭ পয়সা এবং নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানির (নেসকো) জন্য ১ টাকা ৪ পয়সা মাশুল নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাণিজ্যিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদিত ও সরবরাহ করা বিদ্যুতের হিসাব ব্যবস্থাপনা এবং বিল নিষ্পত্তির সমন্বিত দায়িত্ব পালন করবে পিডিবি। নির্ধারিত হারে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে বিল করবে সংস্থাটি। পরে সংশ্লিষ্ট বিতরণ সংস্থাগুলোকে তাদের প্রযোজ্য মাশুল অনুযায়ী অর্থ পরিশোধ করা হবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে ২০২৫ সালে মার্চেন্ট পাওয়ার নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। এই নীতিমালার আওতায় এক এলাকায় স্থাপিত বিদ্যুৎকেন্দ্র সরকারি সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থা ব্যবহার করে অন্য এলাকার বড় গ্রাহকের কাছে সরাসরি বিদ্যুৎ বিক্রি করতে পারবে।
নীতিমালা অনুযায়ী, বাণিজ্যিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ঘোষিত মাসিক উৎপাদনের সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ সরকারি বিতরণ সংস্থার কাছে বিক্রি করা যাবে। অবশিষ্ট বিদ্যুৎ বড় গ্রাহকদের কাছে সরাসরি বিক্রির সুযোগ পাবেন উদ্যোক্তারা।
এর আগে গত ২৩ আগস্ট মার্চেন্ট পাওয়ার প্ল্যান্টের বিদ্যুতের দাম এবং গ্রিড ব্যবহারের মাশুল নিয়ে গণশুনানি করে বিইআরসি। ওই শুনানিতে কমিশনের কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি সরকারি বিতরণ সংস্থার কাছে বিক্রি করা সৌরবিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিটে ৬ টাকা ৪৮ পয়সা নির্ধারণের সুপারিশ করেছিল।
গণশুনানিতে পিডিবি ও কয়েকটি বিতরণ কোম্পানি আশঙ্কা প্রকাশ করে, বড় শিল্পগ্রাহকরা মার্চেন্ট পাওয়ারের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কিনলে তাদের রাজস্ব কমে যেতে পারে। তাদের বক্তব্য ছিল, শিল্পগ্রাহকরা দিনের বেলায় মার্চেন্ট সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করার পর রাতে আবার বিতরণ কোম্পানির বিদ্যুতের ওপর নির্ভর করতে পারেন।
অন্যদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের উদ্যোক্তারা যুক্তি দেন, সঞ্চালন, বিতরণসহ অন্যান্য মাশুল বেশি হলে সৌরবিদ্যুৎ খাতে নতুন বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। নতুন ট্যারিফ ও ওপেন অ্যাকসেস মাশুল নির্ধারণের মাধ্যমে এই দুই পক্ষের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য আনার চেষ্টা করা হয়েছে।