জাতীয়

বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য ভারতের প্রথম চালানে ১৮ কোচ, থাকছে যেসব আধুনিক সুবিধা


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৩৩ পিএম

বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য ভারতের প্রথম চালানে ১৮ কোচ, থাকছে যেসব আধুনিক সুবিধা
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য ২০০টি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী কোচ নির্মাণ ও সরবরাহের চুক্তির আওতায় প্রথম চালানে ১৮টি কোচ পাঠিয়েছে ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান রাইটস লিমিটেড। এসব কোচে যাত্রীদের আরাম, নিরাপত্তা ও ভ্রমণসুবিধা বাড়াতে যুক্ত করা হয়েছে বেশ কিছু আধুনিক বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশের রেল পরিচালনার প্রয়োজন বিবেচনায় কোচগুলোর নকশা ও বিদ্যুৎব্যবস্থায়ও আনা হয়েছে বিশেষ পরিবর্তন।

রাইটস লিমিটেডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১২ অক্টোবর প্রথম চালানে ১৮টি কোচ পাঠানো হয়। সাত ধরনের কোচ সরবরাহের পরিকল্পনার আওতায় প্রথম চালানে চার ধরনের কোচ রয়েছে। এর মধ্যে ১১টি শীতাতপনিয়ন্ত্রণবিহীন শোভন চেয়ার কার, তিনটি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত চেয়ার কার, দুটি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত স্লিপার কোচ এবং দুটি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত পাওয়ার কার রয়েছে। পাওয়ার কারগুলোতে গার্ডের জন্য পৃথক কক্ষ এবং মালপত্র রাখার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

ভারতের পাঞ্জাবের কাপুরথালায় অবস্থিত রেল কোচ কারখানায় বাংলাদেশের জন্য এসব এলএইচবি (লিংক হফম্যান বুশ) ধরনের কোচ নির্মাণ করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রেল প্রকল্প বাস্তবায়নে অভিজ্ঞ রাইটস লিমিটেড জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি এ পর্যন্ত ২৮০টির বেশি রেল ইঞ্জিন, ১ হাজার ৮৫টির বেশি কোচ এবং একাধিক ডিজেলচালিত ইউনিটের ট্রেনসেট সরবরাহ করেছে। ভারতের এই রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটি এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও পশ্চিম এশিয়াসহ বিশ্বের ৫৫টির বেশি দেশে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে।

বাংলাদেশে ভারতীয় কোচ সরবরাহের ধারাবাহিকতা

রেল মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ রেলওয়ে ও ভারতের রেল কোচ কারখানার মধ্যে কোচ সরবরাহের সহযোগিতা শুরু হয় ২০১৫-১৬ অর্থবছরে। ওই সময়ে ভারত থেকে বাংলাদেশ রেলওয়েকে ১২০টি এলএইচবি ধরনের ব্রডগেজ যাত্রীবাহী কোচ সরবরাহ করা হয়েছিল। সেই সহযোগিতার ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালে রাইটস লিমিটেডের মাধ্যমে নতুন করে ২০০টি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী কোচ কেনার চুক্তি করে বাংলাদেশ রেলওয়ে।

চুক্তি অনুযায়ী, সাত ধরনের কোচ তৈরি করে সরবরাহ করা হবে। নতুন চালানের মাধ্যমে ওই চুক্তি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বাংলাদেশের রেল পরিচালনার বাস্তবতা এবং যাত্রীদের ভ্রমণ আরও আরামদায়ক করার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে কোচগুলোর নকশায় বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

যাত্রীদের জন্য থাকছে যেসব সুবিধা

নতুন কোচগুলোতে বিশেষভাবে নকশা করা হেলানো যায় এমন আসন রাখা হয়েছে। এসব আসনে স্টেইনলেস স্টিলের হাতল ও পা রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে যাত্রীরা নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী আসনের অবস্থান পরিবর্তন করে তুলনামূলক আরামদায়কভাবে ভ্রমণ করতে পারবেন।

যাত্রীসেবার মান উন্নত করতে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কোচগুলোতে পাখা, সমন্বিত সিসিটিভি নজরদারি ব্যবস্থা, জরুরি সংকেত দেওয়ার সুবিধা এবং আংশিক খোলা যায় এমন জানালা রাখা হয়েছে। পাশাপাশি শিশুর যত্ন নেওয়ার জন্য পৃথক কক্ষ এবং প্রার্থনার জন্য একটি কক্ষের ব্যবস্থাও রয়েছে। এসব সুবিধা দীর্ঘপথের যাত্রায় যাত্রীদের প্রয়োজন মেটাতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের রেলপথে যাত্রীচাপ ও পরিচালনাগত বাস্তবতা বিবেচনায় কোচের কাঠামোতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। অতিরিক্ত ওজন বহনের বিষয়টি মাথায় রেখে ছাদ আরও মজবুত করা হয়েছে। ব্যস্ত সময়ে কোচের ছাদে মানুষ উঠে ভ্রমণ করলে সৃষ্ট বাড়তি চাপ সামলানোর বিষয়টিও নকশায় বিবেচনা করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

সংঘর্ষে নিরাপত্তা বাড়াতে বিশেষ নকশা

নতুন কোচগুলোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো সংঘর্ষের সময় যাত্রীদের সুরক্ষা বাড়ানোর উপযোগী কাঠামোগত নকশা। কোচগুলো ইউরোপীয় মানদণ্ড ইএন ১৫২২৭ অনুসরণ করে তৈরি করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এ মানদণ্ড অনুযায়ী নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে কোচের বাইরের মূল কাঠামোর নকশায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর ফলে সংঘর্ষের ধাক্কা সামলানোর সক্ষমতা বাড়ানো এবং যাত্রীদের সুরক্ষায় সহায়তা করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের উপযোগী বিদ্যুৎব্যবস্থা

বাংলাদেশ রেলওয়ের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কোচগুলোর বিদ্যুৎব্যবস্থায়ও পরিবর্তন আনা হয়েছে। ভারতীয় রেলওয়ের প্রচলিত কোচে ৭৫০ ভোল্টের বিদ্যুৎব্যবস্থা ব্যবহার করা হলেও বাংলাদেশের জন্য তৈরি কোচগুলো ৪১৫ ভোল্টের বিদ্যুৎব্যবস্থায় পরিচালনার উপযোগী করে নির্মাণ করা হয়েছে।

সব মিলিয়ে, ২০০টি কোচ সরবরাহের চুক্তির প্রথম চালানে ১৮টি কোচ পাঠানোর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের বহরে নতুন কোচ যুক্ত করার কার্যক্রম এগিয়ে যাচ্ছে। যাত্রীদের আরাম, নিরাপত্তা, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং বাংলাদেশের রেল পরিচালনার প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়ে এসব কোচ তৈরি করা হয়েছে। বাকি কোচগুলো সরবরাহের মাধ্যমে চুক্তিটি পর্যায়ক্রমে সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।