জাতীয়
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগ, জাতিসংঘের আরও সক্রিয় ভূমিকা চায় বাংলাদেশ
রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান এবং মিয়ানমারে বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর প্রত্যাবাসন শুরু করতে নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করছে বাংলাদেশ সরকার। অতীতে বিএনপি সরকারের আমলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এ উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও জোরালো সম্পৃক্ততা প্রয়োজন।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে অনুসৃত কূটনৈতিক উদ্যোগগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে সংকট সমাধানের চেষ্টা করছে। তাঁর মতে, মিয়ানমারের সঙ্গে ধারাবাহিক রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কার্যকর সহযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে প্রত্যাবাসনের পথ তৈরি করা সম্ভব।
শামা ওবায়েদ বলেন, বিএনপি সরকারের আমলে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের রয়েছে। অতীতের সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বর্তমান সরকারও সংকট সমাধানে বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ নিতে চায়। তবে শুধু দ্বিপক্ষীয় আলোচনা যথেষ্ট নয়; প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরিতে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
অতীতের প্রত্যাবাসনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর উদ্যোগ
বাংলাদেশে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ইতিহাস কয়েক দশকের পুরোনো। ১৯৭৮ সালে মিয়ানমার থেকে প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেন। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের নথি অনুযায়ী, তৎকালীন বার্মা ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তির আওতায় ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
শামা ওবায়েদ বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশে আসা বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে প্রত্যাবাসন করা হয়েছিল। পরে ১৯৯২ সালে মিয়ানমার থেকে আরও প্রায় আড়াই লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। সে সময় বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের আমলে প্রায় দুই লাখ ৩৬ হাজার রোহিঙ্গাকে প্রত্যাবাসন করা হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর মতে, অতীতের এসব অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, মিয়ানমারের সঙ্গে ধারাবাহিক রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর অংশগ্রহণ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতার পর বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের ব্যাপক অনুপ্রবেশের সময় বেগম খালেদা জিয়ার মানবিক অবস্থানের কথাও তুলে ধরেন শামা ওবায়েদ। তিনি জানান, চিকিৎসার জন্য লন্ডনে অবস্থানকালে খালেদা জিয়া সীমান্তে আটকে পড়া রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া এবং তাদের মানবিক আশ্রয় দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সে সময় খালেদা জিয়া বলেছিলেন, ‘তাদের আসতে দিন, দেশে প্রবেশ করতে দিন।’
রোহিঙ্গা সংকটে বাড়ছে বাংলাদেশের চাপ
দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ বড় ধরনের মানবিক দায়িত্ব পালন করছে। তবে সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ায় দেশের অর্থনীতি, সমাজ, নিরাপত্তা এবং বিশেষ করে আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর চাপ বাড়ছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছেন। শরণার্থীশিবিরগুলোতে জনসংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। প্রতিবছর সেখানে ৩০ হাজারেরও বেশি শিশুর জন্ম হওয়ায় সংকটের ব্যবস্থাপনা আরও জটিল হয়ে উঠছে।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার অর্থায়ন কমে আসায় শিবিরগুলোতে খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, আশ্রয় ও অন্যান্য জরুরি সেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এ পরিস্থিতিতে অনির্দিষ্টকাল ধরে মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ব্যবস্থা চালিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে প্রত্যাবাসন শুরু করাকে সরকারের তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেন শামা ওবায়েদ।
তিনি বলেন, ‘আমরা অন্তত প্রত্যাবাসন শুরু করতে চাই।’ তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রোহিঙ্গাদের দীর্ঘমেয়াদি আশ্রয় দেওয়ার পাশাপাশি তাদের নিরাপদে নিজ দেশে ফেরার বাস্তবসম্মত পথ তৈরি করাও জরুরি।
জাতিসংঘের আরও জোরালো ভূমিকা চায় বাংলাদেশ
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততার গুরুত্ব তুলে ধরে শামা ওবায়েদ বলেন, অতীতের প্রত্যাবাসন উদ্যোগগুলোর সঙ্গে পরবর্তী উদ্যোগের অন্যতম পার্থক্য ছিল আন্তর্জাতিক অংশীদারদের ভূমিকা। তাঁর মতে, জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার কার্যকর অংশগ্রহণ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাংলাদেশ, চীন ও মিয়ানমারকে নিয়ে গঠিত ত্রিপক্ষীয় প্রক্রিয়ার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ওই উদ্যোগ প্রত্যাশিত ফল দিতে পারেনি। তাঁর ভাষায়, ‘ত্রিপক্ষীয় প্রক্রিয়া কাজ করেনি। এটি ব্যর্থ হয়েছে।’
শামা ওবায়েদ উল্লেখ করেন, আগের সরকার মিয়ানমারের সঙ্গে প্রত্যাবাসন-সংক্রান্ত সমঝোতা করলেও বড় পরিসরে সংগঠিত প্রত্যাবাসন শুরু করা সম্ভব হয়নি। এ কারণে বর্তমান সরকার জাতিসংঘ, চীন, আসিয়ানভুক্ত দেশ, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র এবং অন্যান্য প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক অংশীদারকে আরও ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করি, জাতিসংঘ এখন এ বিষয়ে আরও গভীরভাবে সম্পৃক্ত হবে।’
রাখাইনের পরিস্থিতি বিবেচনায় আরাকান আর্মির সঙ্গেও যোগাযোগ
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে আরও জটিল করে তুলেছে। এ পরিস্থিতিতে মিয়ানমারের কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি আরাকান আর্মির সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছে বাংলাদেশ বলে জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
শামা ওবায়েদ বলেন, আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ করা এখনো কঠিন। তবে ঢাকা আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক-উভয় মাধ্যমে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে। তাঁর মতে, রাখাইনের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ বজায় রাখা জরুরি।
প্রত্যাবাসনের যোগ্য রোহিঙ্গাদের তালিকা যাচাই ও পরিচয় শনাক্তকরণের কাজও চলমান রয়েছে বলে জানান তিনি। এ প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য বাংলাদেশ বারবার মিয়ানমারকে আহ্বান জানিয়েছে।
জাতিসংঘে সংকট সমাধানে পাঁচ দফা প্রস্তাব
রোহিঙ্গা সংকটকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গুরুত্ব দেওয়ার অংশ হিসেবে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় সংকট সমাধানের প্রস্তাব তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ২৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে আয়োজিত একটি উচ্চপর্যায়ের পার্শ্ববৈঠকে তিনি পাঁচটি প্রস্তাব উপস্থাপন করেন।
প্রস্তাবগুলোর মধ্যে ছিল দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের সুস্পষ্ট রূপরেখা তৈরি; বেসামরিক মানুষের ওপর সহিংসতা বন্ধ; পূর্বানুমেয় মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা; ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি জোরদার করা এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমনে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো।
পরদিন ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান হলো তাদের নিরাপদে মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেওয়া। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে হওয়ায় এর স্থায়ী সমাধানের দায়িত্বও দেশটির ওপর বর্তায়।
নিউইয়র্ক সফরকালে প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান নিয়ে আলোচনা করেন। এ ছাড়া জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালেহের সঙ্গে বৈঠকে তিনি আরও জোরালো ও সমন্বিত আন্তর্জাতিক উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন।
চীন, আসিয়ান ও মুসলিম দেশগুলোর সহযোগিতা চায় ঢাকা
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চীনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে বাংলাদেশ সরকার। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, মিয়ানমারের ওপর চীনের প্রভাব থাকায় প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরিতে দেশটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময় চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলেও জানান তিনি। ওই আলোচনায় প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে বেইজিংয়ের সহযোগিতা চাওয়া হয়।
এদিকে, আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ জোরদার করছে বাংলাদেশ। ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও ফিলিপাইনের মতো দেশগুলো মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে সংকট সমাধানে ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন শামা ওবায়েদ। পাশাপাশি তুরস্কসহ অন্যান্য মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশও বাংলাদেশের কূটনৈতিক উদ্যোগে সহায়তার আগ্রহ দেখিয়েছে বলে তিনি জানান।
তবে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত এবং দেশটির বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদ্বন্দ্বী কর্তৃপক্ষের উপস্থিতির কারণে প্রত্যাবাসনের পথ আগের তুলনায় আরও জটিল হয়েছে বলে সতর্ক করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘এটি অত্যন্ত কঠিন একটি সমস্যা। রাতারাতি এর সমাধান হবে না।’
প্রত্যাবাসন শুরু করাই সরকারের লক্ষ্য
শামা ওবায়েদ বলেন, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগের পাশাপাশি জাতিসংঘের আরও জোরালো সম্পৃক্ততা এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে। একই সঙ্গে মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরির চেষ্টা চলবে।
তাঁর মতে, রোহিঙ্গাদের নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে নিজ দেশে ফেরার সুযোগ নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক চাপ, মানবিক সহায়তা এবং রাজনৈতিক উদ্যোগের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। শুধু শরণার্থীশিবির পরিচালনা করে দীর্ঘমেয়াদি এ সংকটের সমাধান সম্ভব নয়।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকারের লক্ষ্য কেবল বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়ে তাদের ব্যবস্থাপনা চালিয়ে যাওয়া নয়; বরং এমন পরিস্থিতি তৈরি করা, যাতে বাস্তব অর্থেই প্রত্যাবাসন শুরু করা যায়।