রাজনীতি

রাষ্ট্র সংস্কারে কোথায় ঐকমত্য-মতানৈক্য আনুষ্ঠানিকভাবে জানাল বিএনপি


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৫, ০৩:০০ পিএম

রাষ্ট্র সংস্কারে কোথায় ঐকমত্য-মতানৈক্য আনুষ্ঠানিকভাবে জানাল বিএনপি
ছবি: সংগৃহীত

রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে চলমান জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে কোন কোন বিষয়ে ঐকমত্য এবং কোথায় মতানৈক্য রয়েছে, তা আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে বিএনপি। দলটি বলছে, রাষ্ট্র সংস্কার প্রশ্নে যেমন আগ্রহ ও প্রত্যাশা রয়েছে, তেমনি জনমনে আছে হতাশা ও উৎকণ্ঠাও।

রোববার (৬ জুলাই) গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

ফখরুল জানান, বিএনপি ছয়টি সংস্কার কমিশনের প্রতিটি কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছে এবং প্রতিদিনের আলোচনায় যুক্তি, তথ্য ও যুক্তিসংগত প্রস্তাব দিয়ে কমিশনকে সহায়তা করেছে। তিনি বলেন, ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার জন্য অনেক ক্ষেত্রে বিএনপি ছাড় দিয়েছে এবং বাস্তবভিত্তিক সমঝোতার মাধ্যমে জাতীয় ঐকমত্য গঠনে কাজ করে যাচ্ছে।

তিনি জানান, দুদক সংস্কার কমিশনের ৪৭টি সুপারিশের মধ্যে ৪৬টিতে তারা সম্মত হয়েছেন। কেবল ২৯ নম্বর সুপারিশে তাঁরা চেয়েছেন আদালতের অনুমতির বর্তমান নিয়ম বজায় থাকুক। জনপ্রশাসন সংস্কারে ২০৮টি প্রস্তাবের মধ্যে ১৮৭টিতে একমত, ৫টিতে আংশিক একমত, ১১টিতে মতানৈক্য এবং ৫টিতে ভিন্নমত দিয়েছে বিএনপি। মতবিরোধের প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রদেশ গঠন, পদোন্নতির নিয়মসহ প্রশাসনিক বিষয়ে কিছু প্রস্তাব।

বিচার বিভাগীয় সংস্কার কমিশনের ৮৯টি সুপারিশের মধ্যে ৬২টিতে একমত, ৯টিতে আংশিক একমত ও ১৮টিতে ভিন্নমত দিয়েছে বিএনপি। তবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংক্রান্ত সব প্রস্তাবেই দলটি একমত। নির্বাচনী ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের ২৪৩টি প্রস্তাবের মধ্যে ১৪১টিতে একমত, ১৪টিতে আংশিক, ৬৪টিতে শর্তসাপেক্ষে একমত এবং ২৪টিতে ভিন্নমত রয়েছে। এসব ভিন্নমতের মধ্যে কয়েকটি বাস্তবায়নযোগ্য নয় এবং কিছু প্রস্তাব নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে পারে বলে দাবি করেছে বিএনপি।

সংবিধান সংস্কার কমিশনের ১৩১টি সুপারিশের অধিকাংশেই একমত হয়েছে বিএনপি। ৭০ অনুচ্ছেদ এবং প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সংক্রান্ত বিষয়ে দলটি ছাড় দিয়েছে। প্রধান বিচারপতি নিয়োগে পূর্বের অবস্থান থেকেও সরে এসে ঐকমত্যে পৌঁছেছে। এছাড়া জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের হাতে গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় স্থায়ী কমিটির নেতৃত্ব দেওয়ার বিষয়েও একমত হয়েছে দলটি।

বিএনপি আরও জানিয়েছে, বিভাগীয় পর্যায়ে হাইকোর্টের স্থায়ী বেঞ্চ গঠন প্রশ্নেও তারা একমত হয়েছে, তবে এ বিষয়ে বিচার বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করে বাস্তবায়নের পরামর্শ দিয়েছে। ফখরুল বলেন, অনেক প্রস্তাব বাস্তবায়নে জটিলতা রয়েছে এবং কিছু প্রস্তাবের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন থাকতে পারে। তবুও ঐকমত্যের স্বার্থে বিএনপি অনেক বিষয়ে সম্মতি জানিয়েছে।

বিএনপি মহাসচিব বলেন, “নির্বাচিত সংসদ ও সরকারকে দুর্বল করার প্রস্তাবের বিরোধিতা করা আমাদের দায়িত্ব। কারণ জনগণের দ্বারা নির্বাচিত সরকারই জনগণের কাছে জবাবদিহি করে। গণতান্ত্রিক কাঠামো রক্ষায় এ ধরনের অবস্থান সংস্কারপ্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত।”

তিনি বলেন, “রাষ্ট্রের মালিক জনগণ। তাদের সম্পৃক্ততা ছাড়া বড় কোনো পরিবর্তন করা যায় না। ব্যক্তি, দল কিংবা কমিশনের একক সিদ্ধান্তে রাষ্ট্র কাঠামো পুনর্গঠন হতে পারে না।” তবে এখনও অনেক প্রস্তাব নিয়ে সুস্পষ্ট আলোচনা হয়নি, তাই সে বিষয়ে মন্তব্য থেকে বিরত রয়েছে দলটি।

বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরে ফখরুল বলেন, “দীর্ঘ প্রায় দেড় দশকের লড়াই, শহীদের রক্ত ও সহকর্মীদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে বিএনপি আরও ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী হয়েছে। গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দায়িত্ব পালনে বিএনপি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।”

তিনি আরও বলেন, “স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদ রোধে আমরা সবচেয়ে সক্রিয়। নির্বাচিত সংসদ ও সরকারকে শক্তিশালী করে, দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্র সংস্কারকে গঠনমূলকভাবে এগিয়ে নিতে হবে। এই সুযোগ যেন আমরা হাতছাড়া না করি।”

সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান ও সালাহউদ্দিন আহমেদ উপস্থিত ছিলেন।