সারাদেশ

ধানক্ষেত থেকে বিচারকের আসনে আনারুল


নিজস্ব প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৩৯ পিএম

ধানক্ষেত থেকে বিচারকের আসনে আনারুল
ছবি: সংগৃহীত

মাত্র চার বছর বয়সে বাবাকে হারিয়েছিলেন। এরপর জীবনের কঠিন বাস্তবতায় ভাইয়ের সংসারে থেকে ধানক্ষেত ও পানবরজে কৃষিকাজ করে চলতে হয়েছে জীবনযুদ্ধ। অভাব-অনটন আর প্রতিকূলতার সেই পথ পেরিয়ে অদম্য ইচ্ছাশক্তি, মেধা ও কঠোর অধ্যবসায়ের মাধ্যমে এবার বিচারকের আসনে বসার স্বপ্ন পূরণ হতে যাচ্ছে চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার চরশ্রীরামপুর গ্রামের কৃতি সন্তান মো. আনারুল ইসলামের।


সম্প্রতি প্রকাশিত ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফলে উত্তীর্ণ হয়ে সহকারী জজ (সিভিল জজ/জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট) পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন তিনি। তাঁর এ সাফল্যে পরিবার, শিক্ষক ও এলাকাবাসীর মধ্যে আনন্দের সৃষ্টি হয়েছে।


আনারুল ইসলাম চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা উপজেলার চরশ্রীরামপুর গ্রামের মৃত হারেজ মোল্লা ও মোছা. জাহেদা খাতুনের ছয় সন্তানের মধ্যে কনিষ্ঠ ছেলে।


পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, মাত্র চার বছর বয়সে বাবাকে হারানোর পর চরম প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠেন আনারুল। অভাবের কারণে ভাইয়ের সংসারে থেকে কৃষিকাজে যুক্ত হতে হয় তাঁকে। ধানক্ষেত ও পানবরজে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেও পড়াশোনার প্রতি তাঁর আগ্রহ কখনো কমেনি। নানা বাধা পেরিয়ে তিনি জগন্নাথপুর-শ্রীরামপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। এরপর আলমডাঙ্গা সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং আলমডাঙ্গা সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে সফলতার সঙ্গে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর বিজেএস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে শেষ পর্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন।


নিজের এই সাফল্যের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে আনারুল ইসলাম মহান আল্লাহ তাআলার প্রতি শুকরিয়া আদায় করেন। তিনি জানান, তাঁর দীর্ঘ ও কঠিন শিক্ষাজীবনে সহোদর আমজাদ হোসেন সবসময় পাশে থেকে সার্বিক সহযোগিতা করেছেন।


শৈশব থেকেই সঠিক দিকনির্দেশনা ও অনুপ্রেরণা দেওয়ার জন্য শিক্ষানুরাগী প্রভাষক খাইরুল ইসলামের প্রতিও গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন আনারুল। তিনি বলেন, “প্রাথমিক পর্যায় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা পর্যন্ত আমার মানসিক ও একাডেমিক অনুপ্রেরণার মূল উৎস ছিলেন খাইরুল ইসলাম স্যার। তাঁর ব্যক্তিগত সমৃদ্ধ লাইব্রেরির বই পড়ার অভ্যাসই আমাকে বিজেএসসহ উচ্চতর পরীক্ষার প্রস্তুতির পথ সহজ করে দিয়েছে।”


বিজেএস পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় পাশে থাকা হলের রুমমেট, বন্ধু এবং সব সম্মানিত শিক্ষকের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।


ধানক্ষেতে কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করা থেকে শুরু করে বিচার বিভাগের মর্যাদাপূর্ণ পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়া—আনারুল ইসলামের এই দীর্ঘ পথচলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর পরিবার, শিক্ষক ও এলাকাবাসীর মধ্যে আনন্দের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, প্রতিকূলতাকে জয় করে আনারুলের এই সাফল্য সুবিধাবঞ্চিত ও স্বপ্নবাজ তরুণদের জন্য অনুপ্রেরণার দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।


আনারুল ইসলাম ভবিষ্যৎ কর্মজীবনে সততা, নিষ্ঠা ও ন্যায়বিচারের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে দেশ ও মানুষের সেবা করতে পারেন—এ জন্য তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে সবার কাছে দোয়া কামনা করা হয়েছে।