সারাদেশ
প্রধানমন্ত্রীকে ‘কটূক্তি করা’ ভিডিওতে লাইক দেয়ায় স্কুলশিক্ষক বরখাস্ত
পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে কটূক্তি করা একটি ভিডিওতে ‘লাইক’ দেওয়ার অভিযোগে মো. মামুন অর রশিদ তালুকদার নামে এক স্কুলশিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তিনি উপজেলার মিঠাখালী পিজিএস আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের গণিত বিষয়ের সহকারী শিক্ষক। গত ২১ সেপ্টেম্বর বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি মো. নুরুল আমিন কামালের স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অভিযোগের তদন্ত ও নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত কার্যকর থাকবে।
তবে শিক্ষক মামুন অর রশিদ তালুকদারের দাবি, তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে ওই ভিডিওতে লাইক দেননি। ফেসবুক নিউজফিডে স্ক্রল করার সময় অসাবধানতাবশত আঙুলের ডাবল ট্যাপে ভিডিওটিতে লাইক পড়ে যায়। বিষয়টি জানার পর তিনি দ্রুত লাইকটি সরিয়ে দেন। তার দাবি, ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে তাকে দুই দফা কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হলেও তিনি উভয় নোটিশের জবাবে ঘটনাটি অনিচ্ছাকৃত ছিল বলে ব্যাখ্যা করেছেন।
যে ভিডিওতে লাইক দেওয়ার অভিযোগ
জানা যায়, গত ২৮ জুলাই হবিগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির পদযাত্রায় ছাত্রদল নেতাকর্মীদের হামলার প্রতিবাদে দলটি বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে। ওই সময় রাজধানীর একটি বিক্ষোভ কর্মসূচিতে এনসিপি নেতা তৌহিদুল ইসলাম তুহিনের দেওয়া কয়েকটি স্লোগানের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
ভিডিওটির ২৮ সেকেন্ডের একটি ক্লিপ পরে ‘ভোলা ভিশন’ নামের একটি ফেসবুক পেজে প্রকাশ করা হয়। ভিডিওতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য ও স্লোগান শোনা যায়। অভিযোগ, ওই ভিডিওতে শিক্ষক মামুন অর রশিদ তালুকদারের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে লাইক দেওয়া হয়েছিল। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমেও ঘটনাটি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
‘ভুল করে লাইক’, শিক্ষকের দাবি
শিক্ষক মামুন অর রশিদ তালুকদারের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ৯ আগস্ট রাত সাড়ে ৯টার দিকে তিনি ফেসবুকে নিউজফিড স্ক্রল করছিলেন। এ সময় অসাবধানতাবশত তার আঙুলের ডাবল ট্যাপে ওই ভিডিওতে লাইক পড়ে যায়। কিছুক্ষণ পর পরিচিত একজন মেসেঞ্জারে বিষয়টি জানালে তিনি ফেসবুকে গিয়ে লাইকটি সরিয়ে দেন।
পরে ১০ আগস্ট নিজের ফেসবুক আইডিতে বিষয়টি ব্যাখ্যা করে একটি পোস্টও দেন বলে জানান তিনি। তার দাবি, ভিডিওটিতে লাইক দেওয়ার বিষয়টি ইচ্ছাকৃত ছিল না এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি তা প্রত্যাহার করেন। একই ধরনের বক্তব্য সাম্প্রতিক প্রকাশিত প্রতিবেদনেও এসেছে।
দুই দফা কারণ দর্শানোর নোটিশ
ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয় একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর ২২ আগস্ট প্রথম দফায় শিক্ষক মামুন অর রশিদ তালুকদারকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। নোটিশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া ‘লাইক’কে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়া এবং একজন শিক্ষক হিসেবে তার পেশাগত আচরণ নিয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়।
প্রথম নোটিশের জবাব তিনি পরদিনই দেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, লাইকটি অসাবধানতাবশত পড়ে গিয়েছিল এবং বিষয়টি বুঝতে পারার সঙ্গে সঙ্গে তা সরিয়ে ফেলেন।
তবে বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদ তার প্রথম জবাবে সন্তুষ্ট হয়নি বলে জানানো হয়। এরপর ৫ সেপ্টেম্বর তাকে দ্বিতীয় দফায় কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। এবার সাত কর্মদিবসের মধ্যে লিখিত জবাব দিতে বলা হয়। শিক্ষক ৭ সেপ্টেম্বর ওই নোটিশেরও জবাব দেন।
২১ সেপ্টেম্বর সাময়িক বরখাস্ত
দুই দফা কারণ দর্শানোর নোটিশ এবং শিক্ষকের লিখিত জবাব পর্যালোচনার পর ২১ সেপ্টেম্বর তাকে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ দেওয়া হয়।
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি মো. নুরুল আমিন কামালের স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রীর বিষয়ে আপত্তিকর মন্তব্যে লাইক দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল এবং তিনি তার জবাব দিয়েছেন। অভিযোগ, জবাব ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা এবং জেলা প্রশাসকের নির্দেশনার প্রেক্ষিতে বিদ্যালয়ের এডহক ম্যানেজিং কমিটির সভায় বিষয়টি আলোচনা করা হয়।
আদেশে আরও বলা হয়, এডহক কমিটির ১৬ সেপ্টেম্বরের সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এবং প্রচলিত বিধি-বিধান অনুসরণ করে অভিযোগের পরবর্তী তদন্ত ও নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত শিক্ষক মামুন অর রশিদ তালুকদারকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হলো। সাময়িক বরখাস্তকালীন তার বেতন-ভাতা ও অন্যান্য প্রাপ্য সুবিধা প্রচলিত বিধি অনুযায়ী নিষ্পত্তি করা হবে বলেও আদেশে উল্লেখ করা হয়।
বরখাস্ত হলেও বিদ্যালয়ে উপস্থিত, পাঠদান থেকে বিরত
সাময়িক বরখাস্তের আদেশের পরও শিক্ষক মামুন অর রশিদ তালুকদার নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত হচ্ছেন বলে জানা গেছে। তবে তাকে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। প্রধান শিক্ষক তাকে আলাদা খাতায় হাজিরা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সভাপতির বক্তব্য
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি মো. নুরুল আমিন কামাল বলেন, ওই শিক্ষকের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত কোনো বিরোধ নেই। তবে একজন শিক্ষক হিসেবে প্রধানমন্ত্রীকে কটূক্তি করা ভিডিওতে লাইক দেওয়াকে তিনি অনৈতিক আচরণ হিসেবে দেখছেন।
তার ভাষ্য, শিক্ষক যদি মনে করেন ঘটনাটি ভুলবশত হয়েছে, তাহলে তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে ক্ষমা চাইতে পারেন। দুই দফা কারণ দর্শানোর বিষয়ে তিনি বলেন, দ্বিতীয় নোটিশের জবাবে শিক্ষক ‘ইচ্ছাকৃত ভুল’ বা ‘অপরাধ নয়’ ধরনের বক্তব্য দেওয়ায় কমিটি তার ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হয়নি।
সভাপতি আরও দাবি করেন, বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় কিছু ব্যক্তি প্রধান শিক্ষককে হুমকি দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। পরে তিনি জেলা প্রশাসকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তার দাবি, জেলা প্রশাসক ও বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের নির্দেশনার ভিত্তিতেই সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
‘ডিসির নির্দেশে বরখাস্ত’-দাবি সভাপতির, ভিন্ন বক্তব্য প্রশাসনের
সভাপতি নুরুল আমিন কামাল দাবি করেছেন, জেলা প্রশাসকের নির্দেশনা অনুযায়ীই শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তবে পিরোজপুরের জেলা প্রশাসক আবু সাঈদ বিষয়টি নিয়ে পুরোপুরি অবগত নন বলে জানিয়েছেন। বরখাস্তের বিষয়ে তার নির্দেশনা ছিল কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিষয়টি তার ‘অথরিটি’ নয় এবং সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে বলেন।
মঠবাড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আতাউর রাব্বীও বলেন, শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্ত বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটিই নিয়েছে। কমিটির এ ধরনের ক্ষমতা আছে কি না-এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘থাকার কথা’; আর যদি না থাকে, তাহলে বিষয়টি অভিযোগ আকারে তার কাছে আসার কথা। তবে ওই শিক্ষক তার কাছে কোনো অভিযোগ করেননি বলেও জানান তিনি।
শিক্ষকের দাবি, গোয়েন্দা সংস্থার তদন্তেও অপরাধ পাওয়া যায়নি
শিক্ষক মামুন অর রশিদ তালুকদার দাবি করেন, ঘটনাটি নিয়ে পরবর্তীতে বিভিন্ন সংস্থা তার বিষয়ে তদন্ত করেছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তদন্তকারীরা বিষয়টি অনিচ্ছাকৃতভাবে ঘটতে পারে বলে মনে করেছেন এবং তাকে ভবিষ্যতে এ নিয়ে কেউ হয়রানি করলে যোগাযোগের জন্য কর্মকর্তাদের নম্বরও দেওয়া হয়েছিল।
তবে এই দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থার স্বাধীন কোনো বক্তব্য প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি শিক্ষকের বক্তব্য হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।
মামুন অর রশিদ তালুকদার আরও বলেন, তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নন। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের প্রতি তার সমর্থন ছিল; এর বাইরে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করেন তিনি।
প্রধান শিক্ষকের বক্তব্য
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নিখিল চন্দ্র মিত্র বলেন, তিনি যথেষ্ট মানবিক মানুষ হলেও অনেক সময় পরিস্থিতির কারণে তা প্রকাশ করতে পারেন না। বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি প্রতিষ্ঠানকে শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তবে শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্তের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভায় নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
মানবাধিকারকর্মীর প্রশ্ন
ঘটনাটিকে ‘খামখেয়ালিপনা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন মানবাধিকারকর্মী নুর খান লিটন। তার মতে, কোনো বিষয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যদি সেটিকে অনিচ্ছাকৃত ভুল হিসেবে ব্যাখ্যা করেন এবং দুঃখ প্রকাশ করেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে আরও কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়ার যৌক্তিকতা কর্তৃপক্ষের ভেবে দেখা প্রয়োজন।
নুর খান লিটন আরও বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে প্রধানমন্ত্রী নিজেই তার বিরুদ্ধে মন্তব্য বা মতামত দেওয়ার অভিযোগে আটক হওয়া একজনকে মুক্তির নির্দেশ দিয়ে যে দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন, সেটির পর এ ধরনের ঘটনায় ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের বিষয়টি নতুন করে বিবেচনা করা দরকার।
তার ভাষ্য, রাজনৈতিক নেতৃত্বের দেওয়া বার্তা মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মী বা সংশ্লিষ্টরা কীভাবে বাস্তবায়ন করছেন, এই ঘটনাটি সেই প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে।
তদন্তেই নির্ধারিত হবে পরবর্তী পদক্ষেপ
বিদ্যালয়ের অফিস আদেশ অনুযায়ী, শিক্ষক মামুন অর রশিদ তালুকদারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের পরবর্তী তদন্ত ও প্রশাসনিক বা শৃঙ্খলামূলক কার্যক্রম প্রচলিত বিধি অনুযায়ী সম্পন্ন করার কথা রয়েছে। ফলে বর্তমানে সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত শাস্তি নয়; অভিযোগের তদন্ত ও নিষ্পত্তির পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।