সারাদেশ
দেশে প্রথমবারের মতো সন্ধান মিলল বিরল ‘গোঁফওয়ালা’ বাদুড়ের
বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ‘গোঁফওয়ালা বাদুড়’ নামে পরিচিত এক বিরল প্রজাতির বাদুড়ের সন্ধান মিলেছে। মুখের চারপাশে সূক্ষ্ম লোম এবং বল্লমের মতো কানের গঠন এমন বৈশিষ্ট্যের কারণে প্রাণীটি দেখতে বেশ অদ্ভুত। গবেষকদের কাছে পরিচিত এই বাদুড়ের বৈজ্ঞানিক নাম ‘পেটনস হুইস্কার্ড ব্যাট’।
হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে এই বিরল প্রজাতির সন্ধান পাওয়ায় দেশে শনাক্ত হওয়া বাদুড়ের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭টিতে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের একদল গবেষক দীর্ঘ সাত বছরের গবেষণার মাধ্যমে প্রজাতিটি শনাক্ত করেন। গত ৩০ জুন জীববৈচিত্র্য বিষয়ক আন্তর্জাতিক জার্নাল ‘চেকলিস্ট’-এ তাদের গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়।
গবেষণার নেতৃত্ব দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. কামরুল হাসান। ২০১৭ সালের ১৯ আগস্ট সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের একটি পুরোনো কালভার্টের নিচে প্রথম এই বাদুড়ের কলোনি দেখতে পান গবেষকরা। সেখান থেকে নমুনা সংগ্রহ করে শুরু হয় দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ।
পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালের মার্চ ও আগস্টে একই স্থান থেকে আরও নমুনা সংগ্রহ করা হয়। খুলি ও দাঁতের গঠন বিশ্লেষণের পাশাপাশি ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায় এটি সত্যিই ‘গোঁফওয়ালা বাদুড়’। এ গবেষণায় অংশ নেন অনিক সাহা, আশিস কুমার দত্ত, শারমিন আক্তার ও সাজেদা বেগম।
এ আবিষ্কার গবেষকদের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতদিন ধারণা করা হতো এই প্রজাতির বাদুড় কেবল ভারতের কেরালা ও পশ্চিমঘাট অঞ্চলের বনেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু সেখান থেকে প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার দূরে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে এর উপস্থিতি প্রাণী বিস্তৃতি সম্পর্কে নতুন ধারণা দিয়েছে।
শুধু তাই নয়, ভারতে যেখানে এদের উচ্চ পার্বত্য এলাকায় দেখা যায়, সেখানে সাতছড়ির তুলনামূলক নিচু উচ্চতার চিরসবুজ বনেও এদের বসবাস লক্ষ্য করা গেছে। এতে বোঝা যায়, পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা এদের বেশ উন্নত।
আকারে ছোট থেকে মাঝারি এই বাদুড়ের গায়ের রং বাদামি এবং লোম ঘন। কানের ভেতরের অংশ বল্লমের মতো সূচালো। সাধারণত এরা একাকী ঘোরাফেরা করলেও মৌসুমভেদে কালভার্টের নিচে ছোট কলোনিতে বসবাস করে।
গবেষকরা জানান, এই বাদুড় মূলত পতঙ্গভুক। রাতে উড়ে বেড়িয়ে প্রচুর মশা ও ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে সহায়তা করে।
প্রকৃতি সংরক্ষণ বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএনের লাল তালিকায় এ প্রজাতিকে ‘তথ্য অপর্যাপ্ত’ হিসেবে রাখা হয়েছে। ফলে এদের সঠিক অবস্থা সম্পর্কে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
তবে একই সঙ্গে উদ্বেগের বিষয়ও রয়েছে। সাতছড়িতে পর্যটকের চাপ বৃদ্ধি, পুরোনো স্থাপনা সংস্কার ও বন উজাড়ের কারণে এই বাদুড়ের আবাসস্থল হুমকির মুখে পড়তে পারে।
গবেষকদের মতে, এই বিরল প্রজাতি সংরক্ষণে বনের পুরোনো কালভার্ট, মৃত গাছের কোটর ও পরিত্যক্ত স্থাপনাগুলো অক্ষত রাখা জরুরি। পাশাপাশি আধুনিক গবেষণা বাড়ানো গেলে দেশের প্রকৃতিতে লুকিয়ে থাকা আরও অজানা প্রাণীর সন্ধান মিলতে পারে।