সারাদেশ
আমার ছেলেরে আর মুফতি বানানো হইলো না: লাশ নিতে এসে বাবার আহাজারি
মাজার জিয়ারত, পর্যটনকেন্দ্র ঘুরে দেখা আর প্রিয়জনদের কাছে ফেরার প্রস্তুতি, সবকিছুই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু শুক্রবার সকালে সিলেটের ওসমানীনগরে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় মুহূর্তেই থেমে যায় দুই পরিবারের স্বপ্ন। আনন্দভ্রমণ শেষে বাড়ি ফেরা হলো না কিশোরগঞ্জের সাইফুল ইসলাম ও তরুণ মাদ্রাসাছাত্র আরমান হোসেন রাহিমের।
শুক্রবার সকাল ৭টার দিকে সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার কাশিকাপন এলাকায় ঢাকাগামী একটি বাসের সঙ্গে সিলেটগামী আরেকটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে একটি বাসের নয় যাত্রী নিহত হন। আহত হন আরও অনেকে।
কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার লক্ষ্মীপুর গ্রামের সাইফুল ইসলামসহ পাঁচ বন্ধু মঙ্গলবার রাতে সিলেটে যান। তারা হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করেন। পরদিন ভোলাগঞ্জের সাদাপাথরসহ বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র ঘুরে দেখেন।
সাইফুলের এক আত্মীয়ের বিয়েতে অংশ নিতে বৃহস্পতিবার রাতেই তাদের বাড়ি ফেরার কথা ছিল। প্রথমে ট্রেনে ফেরার পরিকল্পনা থাকলেও পরে বাসে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তারা। এরপর শাহপরান মাজার গেট এলাকা থেকে সকালের বাসের টিকিট কাটেন।
পাঁচ বন্ধুর মধ্যে রানা ও জমরেদ বিমানযোগে বাড়ি ফেরেন। আর সাইফুল, ফাখরুল ইসলাম ফারুক ও মো. লতিফ বাসে করে সিলেট থেকে কিশোরগঞ্জের উদ্দেশে রওনা দেন। তবে সেই যাত্রাই সাইফুলের জীবনের শেষ যাত্রা হয়ে যায়।
সাইফুলের বন্ধু মো. লতিফ জানান, বাসে তাদের তিনজন ছাড়াও প্রায় ৩৬ জন যাত্রী ছিলেন। সকাল ৭টা ১০ মিনিটের দিকে হঠাৎ বিকট শব্দ শুনতে পান তারা। এরপর বাসটি রাস্তা থেকে ছিটকে জমিতে পড়ে যায়।
লতিফ বলেন, দুর্ঘটনার পর তার চোখের সামনে বন্ধু সাইফুলের নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখেন। সাইফুলের কপালের বেশ কিছু অংশ কেটে গিয়েছিল। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। একই দুর্ঘটনায় আহত হন ফাখরুল ইসলাম ফারুক। তবে তুলনামূলকভাবে গুরুতর আঘাত থেকে বেঁচে যান লতিফ।
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে শুক্রবার দুপুরে শেরপুর হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়িতে ছেলে আরমান হোসেন রাহিমের লাশ নিতে আসেন তার বাবা রফিকুল ইসলাম। পেশায় রডমিস্ত্রি রফিকুল তখন কান্নায় নিজেকে সামলাতে পারছিলেন না।
মোবাইল ফোনে কারও সঙ্গে কথা বলার সময় কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে নাই! দুনিয়া ছাড়িয়া চলিয়া গেছে, আল্লাহ নিয়া গেছে। এটা কইয়ে দিয়েন। মসজিদের ইমাম সাহেবকে বলিয়েন। সকালে প্যান্ট-শার্ট পড়ে বের হইছিল, আর আমার ছেলে নাই। লাশ পাইছি।’
এরপর হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, ‘আমার ছেলেরে আর মুফতি বানানো হইলো না।’
রফিকুল ইসলামের বুকফাটা আহাজারিতে শেরপুর হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। এ সময় তাকে সান্ত্বনা দেন ওসমানীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুনমুন নাহার আশা।