বিজ্ঞান-তথ্যপ্রযুক্তি
সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে হুয়াওয়ের অর্থে বিসিসির পাঁচ কর্মকর্তার চীন সফর
ঠিকাদার বা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের অর্থে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর নিষিদ্ধ- সরকারের এমন স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও তা মানা হচ্ছে না বহু সংস্থায়। এর সর্বশেষ উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের অধীনস্থ বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের (বিসিসি) পাঁচ কর্মকর্তার চীন সফর, যা হয়েছে হুয়াওয়ের অর্থায়নে। যা সরকারের নিষেধাজ্ঞার সরাসরি লঙ্ঘন।
গত ২ থেকে ৭ নভেম্বর চীনে অনুষ্ঠিত ‘হুয়াওয়ে ক্লাউড স্ট্যাক অ্যান্ড ডেটা সেন্টার নেটওয়ার্ক’ নামে একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে এই পাঁচ কর্মকর্তাকে অনুমতি দেওয়া হয়। সফরকারীদের মধ্যে ছিলেন- বিসিসির পরিচালক (ডেটা সেন্টার) এস কে মফিজুর রহমান, প্রশাসক (ওয়েব) সুমন কুমার পাটোয়ারী, সহযোগী আম্মার আশরাফ, অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার মো. আতিকুর রহমান এবং সহযোগী সালমা সুবহা মালিহা। এদের মধ্যে চারজন জাতীয় ডেটা সেন্টারের কর্মকর্তা।
সফরকে ঘিরে বিতর্কের শুরু সরকারি অনুমোদনপত্র থেকেই। আইসিটি বিভাগের আদেশে অনুষ্ঠান কোথায় অনুষ্ঠিত হবে সেই তথ্যই উল্লেখ নেই। ইন্টারনেটে অনুসন্ধান করেও ওই তারিখে চীনে হুয়াওয়ের এমন কোনো অনুষ্ঠানের তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে সন্দেহ তৈরি হয়েছে, অনুষ্ঠানটি আদৌ কোথায় হয়েছিল বা সরাসরি হয়েছিল কি না। পরে বিসিসির পরিচালক মফিজুর রহমান জানান, অনুষ্ঠানটি চীনের শেনজেনে ‘সরাসরি’ আয়োজিত হয়েছিল। আইসিটি বিভাগ ও বিসিসির কয়েকটি সূত্রও সফরের সত্যতা নিশ্চিত করেছে।
হুয়াওয়ে বহু বছর ধরেই আইসিটি বিভাগ ও বিসিসিকে বিভিন্ন প্রযুক্তি পণ্য ও সেবা সরবরাহ করে আসছে। চলমান এজ প্রকল্পের অধীনে জাতীয় ডেটা সেন্টারের জন্য হুয়াওয়ের ‘ক্লাউড স্ট্যাক ৮.৫.১’ পণ্য কেনার প্রক্রিয়াও চলছে। এ অবস্থায় ওই প্রতিষ্ঠানের অর্থে কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর- আইন ও নীতিমালার দিক থেকেও অত্যন্ত স্পর্শকাতর বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সফর থেকে কী অর্জন হয়েছে- এমন প্রশ্নের জবাবে মফিজুর রহমান বলেন, নতুন প্রযুক্তি সম্পর্কে জেনেছেন এবং তা ডিজিটালাইজেশনে সহায়ক হবে। তবে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের অর্থে বিদেশ ভ্রমণ একেবারেই নিষিদ্ধ। মার্চ, জুলাই ও অক্টোবর মাসে জারি করা পরিপত্রেও একই নিষেধাজ্ঞা পুনর্ব্যক্ত করেছে সরকার। বিশেষ করে নির্বাচনের আগ পর্যন্ত ‘অপরিহার্য কারণ ছাড়া’ বিদেশ ভ্রমণ নিষেধ করা হয়েছে। কিন্তু এসব নির্দেশনার কোনো প্রতিফলনই দেখা যায়নি বিসিসির সাম্প্রতিক সফরে।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দায় আছে সরকারি কর্মকর্তা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান- দুই পক্ষেরই। সাবেক অতিরিক্ত সচিব ফিরোজ মিয়া রূপালীর ভাষায়, বিদেশ সফরের অনুমোদন শেষ পর্যন্ত আসে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকেই। তারা অনুমোদন না দিলে সফর সম্ভব নয়। আবার অধীনস্ত কর্মকর্তাদের ভ্রমণের অনুমতি দিচ্ছেন যারা, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে মত তার। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বিসিসির নির্বাহী পরিচালক আবু সাঈদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। আইসিটি বিভাগে লিখিত প্রশ্ন পাঠানো হলেও রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কোনো গণমাধ্যমকে কোনো উত্তর দেননি।
হুয়াওয়ের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের যোগাযোগ বিভাগের প্রধান তানভির আহমেদ গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, অংশীজনদের দক্ষতা বাড়াতে দেশে–বিদেশে কর্মশালা আয়োজন একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রক্রিয়া এবং এসব আয়োজন বন্ধে কোনো সরকারি নির্দেশনা তারা পায়নি। তাদের সব আয়োজনই সরকারি অনুমতি সাপেক্ষ। এমনটাই দাবি প্রতিষ্ঠানটির।
সরকারি নিষেধাজ্ঞা, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন এবং নীতিনির্ধারকদের নীরবতা- সব মিলিয়ে বিসিসির সাম্প্রতিক বিদেশ সফর এখন ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। সরকারি নির্দেশনা কতটা কার্যকর হচ্ছে- এই প্রশ্নও নতুন করে সামনে এসেছে।