বিজ্ঞান-তথ্যপ্রযুক্তি

এআই অসৎ লোকের হাতে পড়লে ১০০ কোটি মানুষের প্রাণ যেতে পারে: বিল গেটস


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৪৭ পিএম

এআই অসৎ লোকের হাতে পড়লে ১০০ কোটি মানুষের প্রাণ যেতে পারে: বিল গেটস
ছবি: সংগৃহীত

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দ্রুত অগ্রগতি যেমন প্রযুক্তির নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে, তেমনি এর সম্ভাব্য অপব্যবহার নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগও। মাইক্রোসফটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস সতর্ক করে বলেছেন, অত্যাধুনিক এআই প্রযুক্তি যদি অসৎ উদ্দেশ্যসম্পন্ন ব্যক্তিদের হাতে চলে যায়, তাহলে তা মানবসভ্যতার জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এমনকি এর পরিণতিতে প্রায় ১০০ কোটি মানুষের প্রাণহানিও ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি।

এনবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিল গেটস এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকিকে কোনোভাবেই হালকাভাবে না দেখার আহ্বান জানান। তার মতে, বর্তমান সময়ের এআই প্রযুক্তি এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠছে যে, এর অপব্যবহার হলে এর প্রভাব অতীতের যেকোনো প্রযুক্তিগত হুমকির চেয়ে ভয়াবহ হতে পারে। বিশেষ করে অসৎ উদ্দেশ্যে এআই ব্যবহার করে বিপজ্জনক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ তৈরি হলে তা বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।

গেটস মনে করেন, এআইয়ের অগ্রগতিকে সম্পূর্ণভাবে থামিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে এর ব্যবহার ও উন্নয়নের ওপর কার্যকর নজরদারি প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। এ জন্য সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এখন থেকেই সমন্বিত আলোচনা ও নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে। তার মতে, যথাযথ নজরদারি বাধ্যতামূলক করা হলেও প্রযুক্তির অগ্রগতি পুরোপুরি থেমে যাবে না; বরং সম্ভাব্য বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

শুধু বিল গেটসই নন, এআইয়ের ভবিষ্যৎ ঝুঁকি নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরাও সতর্ক করে আসছেন। যুক্তরাজ্যভিত্তিক অ্যালান টিউরিং ইনস্টিটিউটের এক প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই এমন সুপারইন্টেলিজেন্ট এআই ব্যবস্থা তৈরি হতে পারে, যা গুরুত্বপূর্ণ অনেক জ্ঞানগত কাজে মানুষের সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যাবে।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতের এআই যদি এমন নতুন কৌশল বা পদ্ধতি নিজেই তৈরি করতে শুরু করে, যা মানুষ কিংবা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো যথাযথভাবে মূল্যায়ন বা বুঝতে সক্ষম হবে না, তাহলে প্রযুক্তিটির ওপর মানুষের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে রাসায়নিক ও জৈবিক হুমকি তৈরিতে এআইয়ের সম্ভাব্য ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে। এর পাশাপাশি ভুল তথ্য, অপপ্রচার ও অন্যান্য অপব্যবহারের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এদিকে মার্কিন এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেইও ফ্রন্টিয়ার এআইয়ের দ্রুত উন্নয়ন নিয়ে সতর্ক অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। তিনি উন্নয়নে সাময়িক বিরতি, স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে নিরাপত্তা মূল্যায়ন এবং এআই নিরাপত্তার জন্য অভিন্ন মানদণ্ড তৈরির মতো পদক্ষেপের প্রস্তাব দিয়েছেন। একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে এআই নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমঝোতা বা চুক্তির প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি।

অ্যানথ্রপিকের সাবেক গবেষক জ্যাকব কক্সন এবং অ্যালাইনমেন্ট সায়েন্সের প্রধান ইভান হাবিঙ্গারও উন্নত এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছেন। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, চলতি দশকের শেষ নাগাদ কিংবা আগামী এক দশকের মধ্যে এআই-সম্পর্কিত বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে এবং এ ধরনের ঝুঁকির সম্ভাবনা ১০ শতাংশের চেয়েও বেশি হতে পারে।

তবে এআইকে ঘিরে এমন আশঙ্কার পাশাপাশি প্রযুক্তিটির সম্ভাবনাও ব্যাপক। চিকিৎসা, গবেষণা, শিক্ষা, ব্যবসা, যোগাযোগ ও বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনসহ বহু ক্ষেত্রে এআই ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ফলে প্রযুক্তিটির উন্নয়ন বন্ধ করার পরিবর্তে কীভাবে নিরাপদ, দায়িত্বশীল ও নিয়ন্ত্রিতভাবে এর ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়-এটাই এখন বিশ্বজুড়ে আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

এআইয়ের সক্ষমতা যত দ্রুত বাড়ছে, ততই এর নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহির প্রশ্ন সামনে আসছে। সরকার, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, গবেষক ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সময়মতো কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তুলতে না পারলে ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তির অপব্যবহার কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে। তাই মানবকল্যাণে এআইয়ের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি এর ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।