ক্যাম্পাস
জাবিতে গভীর রাতে ‘ম্যানার’ শেখানোর নামে র্যাগিং, ১২ সিনিয়র শিক্ষার্থী আটক
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) ইতিহাস বিভাগের নবীন শিক্ষার্থীদের গভীর রাতে ডেকে নিয়ে ‘ম্যানার’ শেখানোর নামে র্যাগিং করার অভিযোগ উঠেছে একই বিভাগের একদল সিনিয়র শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে। অভিযোগের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অভিযান চালিয়ে ১২ জন শিক্ষার্থীকে আটক করে। পরে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন। একই সঙ্গে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীরাও প্রক্টরিয়াল টিমের কাছে লিখিতভাবে র্যাগিংয়ের ঘটনা স্বীকার করেছেন।
শনিবার (৪ জুলাই) রাত প্রায় ২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠসংলগ্ন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, অভিযুক্তরা সবাই ইতিহাস বিভাগের ৫৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থী। তারা হলেন— সুভাশীষ রায়, নাছিম উদ্দিন মজুমদার, আবু আবতাহী অনিক, নাইমুল হাসান, আব্দুল্লাহ মাহদী, ইসফাক হাদী সিক্ত, মো. রায়হান খান, কাজী শাহ জামসেদ আলম নাবিল, সাইফুল্লাহ মানসুর আনান, মো. মাহফুজুর রহমান অন্ত, শ্রী কার্তিক চন্দ্র রায় এবং নাইম আহমেদ সজিব।
ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ অনুযায়ী, রাত ১১টার দিকে ইতিহাস বিভাগের ৫৫তম ব্যাচের কয়েকজন নবীন শিক্ষার্থীকে ফোন করে প্রথমে মহুয়া মঞ্চের সামনে এবং পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে যেতে বলা হয়। সেখানে প্রায় ৪০ মিনিট অপেক্ষা করানোর পর তাদের মাঠসংলগ্ন একটি নির্জন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর ‘ফরমাল পরিচয়’ ও ‘ম্যানার’ শেখানোর অজুহাতে তাদের বাবা-মাকে নিয়ে অশালীন ভাষায় গালাগাল করা হয়, কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখা হয় এবং বিভিন্নভাবে মানসিক ও শারীরিকভাবে হেনস্তা করা হয় বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী মো. এহসানুল হক বলেন, “সেখানে আমাদের মা-বাবাকে নিয়ে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করা হয়। কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখা হয় এবং ফরমাল পরিচয়ের নামে আমাদের ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। পরে জাকসুর নেতা মোহাম্মদ আলী চিশতী, হুসনে মোবারক এবং প্রক্টরিয়াল টিম ঘটনাস্থলে এসে আমাদের উদ্ধার করেন।”
একই ব্যাচের আরেক শিক্ষার্থী রাজ খান দাবি করেন, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এর আগেও একাধিকবার ‘ম্যানার’ শেখানোর নামে রাত সাড়ে ১১টা থেকে ভোর সাড়ে ৩টা পর্যন্ত সেন্ট্রাল ফিল্ডে নিয়ে তাদের মানসিক ও শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। তিনি এ ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেন।
জাকসুর স্বাস্থ্য ও খাদ্যবিষয়ক সম্পাদক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যান্টি-র্যাগিং সেলের সদস্য হুসনে মোবারক জানান, রাত ২টার দিকে এক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে খবর পেয়ে তিনি এবং জাকসুর কার্যকরী সদস্য মোহাম্মদ আলী চিশতী ঘটনাস্থলে যান। সেখানে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বিষয়টি জানানো হয়। পরে সহকারী প্রক্টর ও নিরাপত্তা কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে এসে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা অফিসে নিয়ে যান। জিজ্ঞাসাবাদের সময় তারা র্যাগিংয়ের ঘটনা স্বীকার করেন।
তিনি বলেন, “র্যাগিংয়ের বিরুদ্ধে যখন পুরো ক্যাম্পাস সোচ্চার, তখন গভীর রাতে নির্জন স্থানে নিয়ে শিক্ষার্থীদের হেনস্তার ঘটনা অত্যন্ত নিন্দনীয়। জাকসু এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে সবসময় কঠোর অবস্থানে থাকবে।”
প্রক্টরিয়াল টিমের কাছে দেওয়া লিখিত স্বীকারোক্তিতে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীরা উল্লেখ করেন, “আমরা ইতিহাস বিভাগের ৫৫তম ব্যাচের ১৩ জন শিক্ষার্থীকে ‘ম্যানার’ শেখানোর নামে জাবি স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে ডেকে নিয়ে র্যাগিং করেছি।”
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, “রাত ২টার দিকে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়। পরে সংশ্লিষ্টদের নিরাপত্তা অফিসে এনে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। বিষয়টি প্রক্টরিয়াল বডির সভায় উপস্থাপন করা হবে। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।”
বিশ্ববিদ্যালয়ে র্যাগিংবিরোধী কঠোর অবস্থানের মধ্যেই এ ঘটনা নতুন করে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও ক্যাম্পাস সংস্কৃতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ভুক্তভোগীরা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন, যাতে ভবিষ্যতে কোনো নবীন শিক্ষার্থীকে এ ধরনের মানসিক বা শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে না হয়।