পরিবেশ-জলবায়ু
মহাসাগরে ভয়াবহ পরিবর্তন, উষ্ণায়নের গতি দ্বিগুণ-মানবজাতির জন্য বড় সতর্কবার্তা
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বের মহাসাগরগুলোতে দ্রুত এবং নজিরবিহীন পরিবর্তন ঘটছে। সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়া, পানির অম্লতা বৃদ্ধি, বরফ গলে যাওয়া এবং সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ-সব মিলিয়ে পৃথিবীর জলভাগ এখন বড় ধরনের সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একশরও বেশি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীর যৌথ গবেষণার ভিত্তিতে প্রকাশিত কোপার্নিকাস ওশান স্টেট রিপোর্টের দশম সংস্করণে এমনই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণাটিতে উপগ্রহ, বুয়ি ও বিভিন্ন সামুদ্রিক সেন্সর থেকে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে সংগ্রহ করা তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি সমুদ্র ও জলবায়ু ব্যবস্থার জন্য এখন পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুতর সতর্কবার্তাগুলোর একটি।
মানুষের ব্যাপক জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের ফলে বায়ুমণ্ডলে যে অতিরিক্ত তাপ জমা হচ্ছে, তার প্রায় ৯০ শতাংশই মহাসাগর শোষণ করে নিচ্ছে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, সমুদ্রের উষ্ণায়নের গতি এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি দ্রুত। গবেষণায় বলা হয়েছে, গত দুই দশকে মহাসাগরের উষ্ণ হওয়ার হার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছানোর পরও পরিস্থিতির অবনতি থামেনি। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালেও সমুদ্রের উষ্ণতা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
গবেষকরা বলছেন, সমুদ্রের এই পরিবর্তনকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, বরফ গলে যাওয়া এবং সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি—সবকিছুই পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। মার্কেটর ওশান ইন্টারন্যাশনালের মহাপরিচালক পিয়েরে বাহুরেল বলেন, মহাসাগরগুলো মানুষের চোখের সামনেই দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি উষ্ণায়নের সঙ্গে প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্রের পরিবর্তন যুক্ত হওয়ায় সমুদ্রের ওপর চাপ আরও বাড়ছে।
মহাসাগর কতটা অতিরিক্ত তাপ শোষণ করছে, তার একটি ভয়াবহ চিত্রও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। গবেষণা অনুযায়ী, গত এক বছরে সমুদ্র প্রায় ২৩ জেটাজুল অতিরিক্ত তাপ শোষণ করেছে। এটি টানা নবম বছরের মতো নতুন তাপ শোষণের রেকর্ড। এই বিপুল শক্তির পরিমাণ বোঝাতে বিজ্ঞানীরা তুলনা করেছেন-প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১২টি হিরোশিমা পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ থেকে যে পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন হতো, তার সমপরিমাণ তাপ সমুদ্রে জমা হচ্ছে। একইভাবে, এই অতিরিক্ত শক্তি ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী ব্যবহৃত মোট শক্তির প্রায় ৪০ গুণের সমান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সমুদ্রের এই অতিরিক্ত তাপের সরাসরি প্রভাব পড়ছে আবহাওয়া ও সামুদ্রিক পরিবেশে। একদিকে তৈরি হচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ, অন্যদিকে উষ্ণ সমুদ্র ঘূর্ণিঝড় ও অন্যান্য চরম আবহাওয়াকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সামুদ্রিক প্রাণী ও উদ্ভিদের আবাসস্থল। সমুদ্রের পানি উষ্ণ হওয়ার পাশাপাশি বরফ গলে যাওয়ায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাও বাড়ছে। এর আরেকটি কারণ হলো, উষ্ণ পানি ঠান্ডা পানির তুলনায় বেশি আয়তন দখল করে। ফলে শুধু স্থলভাগের বরফ গলার কারণেই নয়, সমুদ্রের পানির তাপীয় প্রসারণের কারণেও সমুদ্রপৃষ্ঠ ক্রমেই ওপরে উঠছে।
পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৯৯ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় উচ্চতা বছরে প্রায় ৩.৮ মিলিমিটার বা ০.১৫ ইঞ্চি করে বেড়েছে। এর ফলে গত কয়েক দশকে সমুদ্রপৃষ্ঠ প্রায় ৪ ইঞ্চি পর্যন্ত উঁচু হয়েছে। ২০১২ সালের পর এই বৃদ্ধির হার আরও দ্রুত হয়েছে। এতে বিশ্বের বিভিন্ন উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাসকারী কোটি কোটি মানুষ ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির মুখে পড়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়লে জলোচ্ছ্বাস, উপকূলীয় বন্যা এবং ঘূর্ণিঝড়ের সময় ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা আরও বেড়ে যেতে পারে।
শুধু উষ্ণায়ন নয়, অতিরিক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণের কারণে সমুদ্রের রাসায়নিক ভারসাম্যও বদলে যাচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৮৫ সালের পর থেকে বায়ুমণ্ডলীয় কার্বন শোষণের ফলে সমুদ্রের অম্লতা প্রায় ১৭ শতাংশ বেড়েছে। বিজ্ঞানীদের কাছে এটি জলবায়ু পরিবর্তনের আরেকটি গুরুতর দিক। সমুদ্রের অম্লতা বাড়লে ঝিনুক, শামুক, গলদা চিংড়ি এবং প্রবালের মতো জীবের জন্য প্রয়োজনীয় খোলস ও কঙ্কাল তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ে। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খল এবং মানুষের ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।
ইউরোপের সমুদ্রগুলোতেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। মার্কেটর ওশান ইন্টারন্যাশনালের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা এবং প্রতিবেদনের অন্যতম লেখক কারিনা ভন শ্যুকম্যানের মতে, ইউরোপের সামুদ্রিক অঞ্চলগুলো বর্তমানে ব্যাপক চাপের মুখে রয়েছে। ২০২৪ সালে ভূমধ্যসাগর ও কৃষ্ণসাগরে একাধিক ভয়াবহ সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ দেখা যায়। এর মধ্যে কয়েকটি তাপপ্রবাহ ৩০ দিনেরও বেশি সময় ধরে স্থায়ী হয়েছিল। কিছু এলাকায় সমুদ্রের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় ৪.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি বেড়ে যায়।
দ্য মেডিটেরেনিয়ান ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজের গবেষক এবং প্রতিবেদনের সহলেখক ব্লাঙ্কা ফার্নান্দেজ-আলভারেজ বলেন, এসব ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন বা সাময়িক উষ্ণতার ঘটনা নয়। বরং দীর্ঘমেয়াদি সমুদ্র উষ্ণায়নের পটভূমিতে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপেরই প্রতিফলন এগুলো।
সমুদ্রের এই পরিবর্তনের প্রভাব ইতোমধ্যে মানুষের জীবন ও অবকাঠামোর ওপরও দেখা যাচ্ছে। প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের ঝড় লুইসের উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে। ওই ঝড়ের সময় স্পেনের উপকূলে প্রায় ২৬ ফুট উঁচু ঢেউ আঘাত হানে। এতে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয় এবং একজনের মৃত্যু ঘটে।
একই বছরে সুইডেন ও ফিনল্যান্ডের মধ্যবর্তী বোথনিয়ান উপসাগরেও অস্বাভাবিক একটি ঘটনা ঘটে। প্রচণ্ড বাতাসের কারণে উপসাগরের পানি একদিকে সরে গিয়ে স্থানীয় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রায় ৬০ ইঞ্চি কমে যায়। পরিস্থিতির কারণে প্রায় ১৮ ঘণ্টা ফেরি চলাচল বন্ধ রাখতে হয়েছিল। ঘটনাটি দেখিয়ে দেয়, সমুদ্রের পরিবর্তন শুধু দীর্ঘমেয়াদি উষ্ণায়ন বা সমুদ্রপৃষ্ঠ বৃদ্ধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; চরম আবহাওয়ার সঙ্গে এর প্রভাব বিভিন্নভাবে প্রকাশ পেতে পারে।
বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা অঞ্চলগুলোর একটি আর্কটিকেও পরিবর্তনের মাত্রা বিশেষভাবে স্পষ্ট। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত চার দশকে আর্কটিক মহাসাগরের উপরিভাগের তাপমাত্রা প্রায় ৪.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। ১৯৭৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রতি দশকে আর্কটিক সমুদ্রের গড় মাসিক বরফের বিস্তার প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার বর্গমাইল কমেছে। বিজ্ঞানীরা এর ব্যাপকতাকে বোঝাতে বলেছেন, প্রতি দশকে প্রায় স্পেনের আয়তনের সমপরিমাণ বরফের বিস্তার হারিয়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে অ্যান্টার্কটিকাতেও বরফের পরিবর্তন সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের ওপর প্রভাব ফেলছে। ২০২২ সালে অ্যান্টার্কটিক অঞ্চলে সমুদ্রবরফের অস্বাভাবিক হ্রাসের কারণে সম্রাট পেঙ্গুইনদের কয়েকটি প্রজনন উপনিবেশে ব্যাপক প্রজনন ব্যর্থতার ঘটনা রেকর্ড করা হয়। বরফের ওপর নির্ভরশীল প্রাণীদের জন্য এ ধরনের পরিবর্তন ভবিষ্যতে বড় ধরনের আবাসস্থল সংকট তৈরি করতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে ছোট দ্বীপরাষ্ট্র ও নিম্নভূমির উপকূলীয় অঞ্চলগুলো। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, উপকূলীয় ক্ষয় এবং প্রবাল প্রাচীরের ক্ষতির কারণে এসব অঞ্চলের মানুষের জীবন ও অর্থনীতি সরাসরি হুমকির মুখে পড়ছে। কারিনা ভন শ্যুকম্যানের মতে, দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর জন্য সমুদ্রের পরিবর্তন কোনো দূরবর্তী ভবিষ্যতের সমস্যা নয়; এটি তাদের বর্তমান অর্থনীতি, উন্নয়ন ও নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তার মতে, এসব অঞ্চলে যে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, তা ভবিষ্যতে বিশ্বের অন্যান্য উপকূলীয় অঞ্চলের সম্ভাব্য ঝুঁকিরও একটি সতর্ক সংকেত।
গবেষকদের মতে, এই পরিবর্তন মোকাবিলায় শুধু ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করলেই হবে না; সমুদ্রের অবস্থা নিয়মিত ও দীর্ঘমেয়াদে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। উপগ্রহ, বুয়ি, সেন্সর এবং অন্যান্য প্রযুক্তির মাধ্যমে আরও নির্ভুল তথ্য সংগ্রহ করা জরুরি। একই সঙ্গে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ, বরফের বিস্তার এবং সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের পরিবর্তন সম্পর্কে আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞানীদের বক্তব্য অনুযায়ী, মহাসাগরের পরিবর্তন এখন আর কেবল পরিবেশগত কোনো দূরবর্তী আশঙ্কা নয়। সমুদ্র পৃথিবীর জলবায়ু ব্যবস্থা, খাদ্য, অর্থনীতি, উপকূলীয় নিরাপত্তা এবং কোটি কোটি মানুষের জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাই সমুদ্রের দ্রুত পরিবর্তনকে বোঝা, নির্ভুলভাবে পর্যবেক্ষণ করা এবং এর প্রভাব মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেওয়া এখন বিশ্বজুড়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে।