ফিচার
পানাম নগর: ইতিহাসের মুখচ্ছবিতে সংরক্ষণের আলপনা, না অবহেলার ফাটল
পানাম নগর—এই নামটি উচ্চারিত হলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বাংলার গৌরবোজ্জ্বল, রহস্যময়, এবং শিল্প সুষমায় ভরা অতীতের এক সুবিশাল দৃশ্যপট।
নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁয়ে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক নগরী কেবল কিছু পুরোনো স্থাপনা নয়, বরং এটি বাংলার স্থাপত্য ও সংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রমাণ, যেখানে সময় থেমে আছে অতীতের স্তব্ধতা নিয়ে। মুঘল আমলে যার সূত্রপাত, পরবর্তীতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সময়ে পানাম হয়ে ওঠে অভিজাত ব্যবসায়ীদের বাণিজ্যকেন্দ্র। সেই সময়ের নির্মিত ইউরোপীয় ধাঁচের রাজকীয় বাড়িগুলোর অনেকগুলো আজও দাঁড়িয়ে আছে—মাঝে মাঝে ক্লান্ত, ক্ষয়ে যাওয়া অবয়বে হলেও, এখনো মাথা উঁচু করে বহন করে যাচ্ছে অতীতের ঐতিহ্য।
নগরীর অলিগলি দিয়ে হেঁটে গেলে এক ধরনের নীরব ইতিহাসের স্পর্শ টের পাওয়া যায়। যেন কোনো চিত্রকল্পে আমরা ফিরে যাই শতবর্ষ আগে। ধ্বংসস্তূপের মাঝেও যে সৌন্দর্য থাকে, তার এক অনন্য উদাহরণ পানাম। ছায়াময় পথ, খসে পড়া কার্নিশ, ছিদ্র হয়ে যাওয়া ছাদ, ভাঙা জানালা—সব মিলিয়ে এক ধরনের সৌন্দর্য-বিষাদ মিশে থাকে এই শহরের প্রতিটি পরতে। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে এটি একটি দুর্লভ অভিজ্ঞতা—যেন কোনো গ্যালারির নিঃশব্দ শিল্পকর্ম, যা দেখলে মুগ্ধতা ছড়ায়, কিন্তু গভীরভাবে ভাবলে দুঃখটাও ধরা দেয়।
অথচ এই দৃশ্যপটের অন্তরালে লুকিয়ে আছে এক করুণ বাস্তবতা। অনেক ভবন ইতোমধ্যেই সম্পূর্ণ ধসে গেছে। পানাম নগরে একসময় প্রায় ৫২টি ঐতিহাসিক ভবন ছিল, যার মধ্যে এখন কেবল ধ্বংসাবশেষই অবশিষ্ট। কিছু ভবনের স্থাপত্যশৈলী এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত যে আর পুনঃনির্মাণও সম্ভব নয়। পুরোনো লোহার কাজ, কাঠের দরজা-জানালার খোদাই, রঙিন কাঁচের জানালাও হারিয়ে যাচ্ছে সময়ের স্রোতে।
তবে শুধু মাত্র সময়ের ক্ষয় নয়, অবহেলাও এক বড় কারণ। ভবনের গায়ে লেগে থাকা বৃষ্টির পানি, গজিয়ে ওঠা আগাছা, গলে যাওয়া ইট—সবই বলে দেয় সংরক্ষণের যত্ন কতটা অপর্যাপ্ত। অনেক স্থানে নতুন ইট বসিয়ে কিংবা এলোমেলো রং করে ‘সংরক্ষণ’-এর নামে ঘটানো হয়েছে ঐতিহ্যচ্যুতি। যেখানে থাকা উচিত ছিল গবেষণাভিত্তিক সংরক্ষণ পরিকল্পনা, সেখানে চলছে সংস্কারের নামে প্রাচীনতার অপচর্চা।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। সন্ধ্যার পর অঞ্চলটি প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়ে, ফলে অনৈতিক কর্মকাণ্ড কিংবা পর্যটকদের হয়রানির মতো ঘটনা প্রায়শই ঘটে। পর্যাপ্ত সিসি ক্যামেরা, নিয়মিত টহল বা পর্যটন কর্তৃপক্ষের তদারকি নেই বললেই চলে। এতে করে পর্যটকদের অভিজ্ঞতা হয়ে পড়ে নেতিবাচক, যা দীর্ঘমেয়াদে পর্যটন বিকাশে বড় প্রতিবন্ধক।
পাশাপাশি, পানাম নগরের চারপাশে রয়েছে অব্যবস্থাপনা, দখলদারিত্ব, এবং জনসচেতনতার অভাব। অনেক ভবনের পাশে গড়ে উঠেছে অপরিকল্পিত দোকান ও আবর্জনার স্তূপ। স্থানীয়দের একাংশ ইতিহাসের গুরুত্ব না জানায় পরিবেশ রক্ষায় তাঁদের অংশগ্রহণও নেই। উপরন্তু কিছু অসাধু ব্যবসায়ী পর্যটকদের সঙ্গে প্রতারণা করে থাকেন, যা দেশের ভাবমূর্তির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
এ ইতিহাসকে বুঝতে হলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে এই নগরীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বুননে। একসময় এটি ছিল ধনী হিন্দু সম্প্রদায়ের বসতি—তাঁদের সামাজিক আচার, উৎসব, পোশাক ও খাদ্যসংস্কৃতি এখন বিলুপ্ত। কেউ কেউ বলেন, এখানে একসময় দুর্গাপূজা থেকে শুরু করে মহররম—সবই সহাবস্থানে হতো। দেশভাগের সময় তাঁদের উত্তরসূরিরা দেশত্যাগ করায়, সেই সংস্কৃতির স্পন্দন এখন কেবল স্মৃতিতেই বেঁচে আছে।
এছাড়াও পানাম নগরের ঐতিহাসিক গুরুত্ব মসলিন বাণিজ্যের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। সোনারগাঁয়ের নিকটবর্তী হওয়ায় এটি একসময়ে সূক্ষ্ম হস্তশিল্পের বিনিময় কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। অথচ আজকের পর্যটন গাইড বা রুটে এ ইতিহাসের কোনো উল্লেখ পাওয়া যায় না।
পানামের পুরোনো রাস্তাগুলো ছিল সুচিন্তিত নকশায় নির্মিত—পাশাপাশি দোকান, আবাসিক ভবন ও পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা। বর্তমানে অনেক রাস্তাই দখল হয়ে গেছে, শহরের মূল বিন্যাস প্রায় অদৃশ্য। মূল পানাম রোডের আশপাশের ছোট ছোট গলিগুলো আজ প্রায় চিহ্নহীন।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো—পানাম নগরের ইতিহাসের যথাযথ নথিকরণ নেই। ১৯৪৭ সালের পূর্বে এবং ১৯৭১-পরবর্তী সময়ের মাঝে আলোকচিত্র, দলিল, মানচিত্র বা ঐতিহাসিক উপাদান সংরক্ষণের তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। ফলে অনেক মূল্যবান দলিল হয়ত ব্যক্তিগত সংগ্রহে থেকে হারিয়ে গেছে।
তবে সবচেয়ে দুঃখজনক দিকটি হলো,নতুন প্রজন্মের সঙ্গে এই ইতিহাসের সংযোগ হারিয়ে যাচ্ছে। পাঠ্যপুস্তকে বা শিক্ষা ব্যবস্থায় পানাম নিয়ে আলোচনা নেই বললেই চলে। ফলে তরুণ প্রজন্ম জানে না, এই নগরীর প্রতিটি ইট, প্রতিটি দেয়ালে লুকিয়ে আছে একটি জাতির সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার।
তবুও এই অন্ধকারের মাঝেও রয়েছে কিছু আশার আলো। পানাম নগরকে রক্ষা করা এখনো সম্ভব, যদি আমরা সত্যিই তা চাই। এর জন্য প্রয়োজন একটি সুসমন্বিত ও গবেষণাভিত্তিক সংরক্ষণ নীতি—যেখানে প্রত্নতত্ত্ববিদ, স্থপতি, ইতিহাসবিদ, প্রশাসন এবং জনগণ একসঙ্গে কাজ করবেন। প্রতিটি ভবনের জন্য আলাদা করে মূল্যায়ন, ডকুমেন্টেশন ও পরিকল্পনা প্রয়োজন, যেন স্থাপত্যের আসল রূপ বজায় থাকে।
এছাড়া এই স্থানকে পর্যটন ও শিক্ষার এক প্রাণবন্ত কেন্দ্রে রূপান্তর করা যেতে পারে। থাকবে তথ্যবহুল গাইডলাইন, ডিজিটাল আর্কাইভ, স্থানীয় সংস্কৃতি নিয়ে প্রদর্শনী ও কর্মশালা। এতে যেমন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বাড়বে, তেমনি বাড়বে জনসচেতনতা।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ। কেবল প্রশাসনের ওপর ভরসা না করে, স্থানীয় শিক্ষার্থী, শিল্পী ও তরুণ সমাজকে সম্পৃক্ত করতে হবে সংরক্ষণে। তাঁদের হাত ধরেই গড়ে উঠতে পারে এক ‘ঐতিহ্য রক্ষা আন্দোলন’-যা হবে সময়োপযোগী, সচেতন এবং টেকসই।
আজকের প্রজন্ম যদি এই নগরীর ভাঙা ইটের গায়ে তাদের গর্ব খুঁজে পায়, তবে সেটিই হবে সময়ের সেরা সংরক্ষণ। কারণ ভবন টিকিয়ে রাখা নয়—এই ইতিহাসকে ভালোবেসে, বুঝে, লালন করাই প্রকৃত উত্তরাধিকার রক্ষা।
পানাম নগর এখনও দাঁড়িয়ে আছে—নীরব, ক্লান্ত, কিন্তু অনন্য এক অস্তিত্ব নিয়ে। তার প্রতিটি ভাঙা দেয়াল, ধসে পড়া কার্নিশ আর ধুলোমলিন পথ যেন ইতিহাসের নিঃশব্দ সাক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের সামনে। কিন্তু একে যদি সময়মতো সংরক্ষণের আওতায় না আনা যায়, তবে আমরা হারাব শুধু কিছু প্রাচীন স্থাপনা নয়—হারাব আমাদের সাংস্কৃতিক শিকড়, পরিচয়ের এক অমূল্য অংশ। আর একবার যদি ইতিহাস মুছে যায়, তা যতই ফিরে পেতে চাই না কেন, তার আসল রূপ আর কখনও ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয় না। তাই এখনই প্রয়োজন সচেতনতার, দায়িত্ববোধের, এবং ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের—যাতে পানাম শুধু অতীত নয়, ভবিষ্যতেরও গর্ব হয়ে থাকতে পারে।
লেখক: মারুফা জাহান মুমু
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি