ফিচার
টিমটিমে আলোয় অব্যক্ত সময়ের নীরবতা
আলোরও একটা আবেগ আছে। তারও একটা গল্প আছে। কখনো তা ঝলমলে, কখনো কখনো নিঃশব্দ আবার কখনো ধীর। কিছু আলো নিভৃতে জ্বলে ওঠে, অন্ধকার ভেদ করে, আর এভাবেই মানুষের জীবনে বয়ে আনে উষ্ণতা, নির্ভরতা আর শান্তি।
এক সময় বাংলার প্রতিটা মানুষের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়েছিল এই হারিকেন। সন্ধ্যা নামলেই দেখা মিলতো এক ক্ষীণ আলোর,সাথে ছড়িয়ে পড়ত কেরোসিনের হালকা গন্ধ আর টিমটিম করে জ্বলতে থাকা একটা ছোট্ট শিখা। এটি কেবল আলো ছিল না—ছিল মানুষের সঙ্গী আর তাদের জীবনের প্রতিচ্ছবি এবং কিছু সময়ের গল্প।
হারিকেনের ইতিহাস মূলত ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে। ১৮৫০ সালের দিকে জার্মান প্রকৌশলী ডিয়েটজ (R. E. Dietz) আধুনিক হারিকেন ল্যাম্পের উন্নয়ন ঘটান। এর ডিজাইন ছিল এমনভাবে তৈরি যাতে বাতাসের ঝাপটায় আলো নিভে না যায়। এই সহজ অথচ কার্যকর আবিষ্কার দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ইউরোপ থেকে এশিয়ায়। ব্রিটিশ শাসনামলে বাংলাদেশসহ পুরো উপমহাদেশের গ্রাম-গঞ্জে এর ব্যবহার শুরু হয়।
প্রথমদিকে কেরোসিনের উৎপাদন ব্যয়বহুল ছিল, তাই হারিকেন ছিল শুধুমাত্র সামর্থ্যবানদের আলোর উৎস। তবে সময়ের সাথে সাথে কেরোসিন সহজলভ্য হয় এবং হারিকেন হয়ে ওঠে সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে পাওয়া যেন এক পথ চলার সঙ্গী। বিশেষ করে কৃষিজীবী মানুষ, ছোট দোকানদার, জেলেরা কিংবা শিক্ষার্থীদের রাতের সঙ্গী হয়ে উঠে এই বাতি।
কেবল প্রয়োজনের জায়গায় আটকে ছিল না হারিকেনের অস্তিত্ব। এটি ধীরে ধীরে প্রবেশ করে গ্রামীণ সংস্কৃতিতে। গল্পের আসর, বিয়ের অনুষ্ঠান, লোকগান, মেলার মাঠ—সবখানেই ছড়িয়ে পড়ে এই আলোর উষ্ণতা।
শুধু তাই নয় প্রবাদ-প্রবচনে, বাংলা গানে এবং আমাদের লোকশিল্পের নকশায় জায়গা করে নেয় হারিকেন। ছোটবেলার স্মৃতিতে আজও অনেকের মনে পড়ে—দাদা-দাদির মুখে শোনা গল্পের সময় হারিকেনের আলোয় ভেসে ওঠা মুখগুলো, অথবা কোনো উৎসবের রাতে উঠোনে জ্বলতে থাকা একের পর এক বাতির সারি।
তবে গত কয়েক দশকে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সম্পূর্ণ বদলে গেছে এই চিত্র । গ্রামবাংলার প্রতিটি ঘরেই পৌঁছে গেছে বিদ্যুতের আলো। হারিকেন এখন প্রায় বিলুপ্ত। বাজারের ছোট ছোট হার্ডওয়্যার দোকানেও আর আগের মতো হারিকেন দেখা যায় না। কেরোসিনের দাম ও অভাব আর তার সাথে আধুনিকতার ছোঁয়া যেন এর ব্যবহার একেবারেই কমিয়ে দিয়েছে।
আজকের প্রজন্ম হয়তো সরাসরি সেই আলোয় পড়াশোনা করেনি, কিংবা গল্প শোনেনি, তবুও হারিকেন রয়ে গেছে এক ঐতিহাসিক প্রতীকের মতো মানুষের মুখে মুখে। এটি কেবল আলো জ্বালানোর যন্ত্র নয়, বরং এক সময়ের সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং পারিবারিক বন্ধনের স্মারক হিসেবে কাজ করেছে। তাই এটি শুধু নিভে যাওয়া অতীত নয়—এটি আমাদের শেকড়, আমাদের লোকঐতিহ্যের এক অমূল্য সাক্ষী।
তবে বিস্ময়ের ব্যাপার এটাই যে, হারিকেন একেবারে এখনো হারিয়ে যায়নি। সৌখিনতা আর পুরনো দিনের প্রতি ভালোবাসা থেকে এখনও অনেকেই বাড়ির অন্দরসজ্জায় হারিকেন ব্যবহার করেন। বিশেষ করে নতুন ধাঁচের ক্যাফে, রেস্টুরেন্ট কিংবা গ্রামীণ মোটিফে সাজানো দোকানে পুরনো হারিকেন আজও স্মৃতির আলো জ্বেলে রাখে আমাদের হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের। কারও কারও শিল্পকর্মে, রিকশার পেছনের নকশায়, পটচিত্রে বা গানের সুরে এখনও ফিরে আসে সেই আলোর গল্প।
মানুষের জীবন বদলে গেলেও কিছু আলোর গল্প বদলায় না। হারিকেনের টিমটিমে শিখা হয়তো নিভে গেছে, কিন্তু তার আলোয় জ্বলেপোড়া স্মৃতি আজও থেকে গেছে অনেক হৃদয়ের আঙিনায়,আমাদের লোকশিল্পে।
লেখক :মারুফা জাহান মুমু
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি