সারাবিশ্ব

হুতিদের বিরুদ্ধে নতুন হামলা নয়, নেতানিয়াহু সরকারকে সেনাবাহিনী


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:০৫ পিএম

হুতিদের বিরুদ্ধে নতুন হামলা নয়, নেতানিয়াহু সরকারকে সেনাবাহিনী
ছবি: সংগৃহীত

ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে নতুন করে সরাসরি সামরিক হামলা না চালানোর জন্য ইসরায়েলি সরকারকে সতর্ক করেছে দেশটির সামরিক ও নিরাপত্তা মহল। তাদের মতে, হুতিদের বিরুদ্ধে এককভাবে সামরিক অভিযান পরিচালনা করে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান পাওয়া কঠিন হতে পারে। এর পরিবর্তে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করা এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের নিয়ে একটি বৃহত্তর জোট গঠন করাই ইসরায়েলের জন্য বেশি কার্যকর কৌশল হতে পারে।

ইসরায়েলি সংবাদপত্র হারেৎজ-এর এক প্রতিবেদনে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন নিরাপত্তা কর্মকর্তার বরাত দিয়ে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি নিরাপত্তা মহল মনে করছে, হুতিদের সামরিক সক্ষমতার পাশাপাশি তাদের আঞ্চলিক প্রভাব ও ভূখণ্ডগত নিয়ন্ত্রণ মোকাবিলায় শুধু ইসরায়েলের সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়। বরং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সম্পৃক্ত করে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণ করা প্রয়োজন।

সরাসরি হামলার পরিবর্তে কূটনৈতিক উদ্যোগের পরামর্শ

হারেৎজ-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েল এককভাবে নতুন সামরিক অভিযান শুরু করলে তা প্রত্যাশিত ফল নাও দিতে পারে। বরং এতে আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়ার পাশাপাশি সংঘাতের পরিধিও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এ কারণে সামরিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তারা তাৎক্ষণিক হামলার পরিবর্তে কূটনৈতিক তৎপরতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

তাদের মতে, হুতিদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হলে শুধু সামরিক হামলা নয়, একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ বাড়াতে হবে। এ জন্য যুক্তরাষ্ট্রসহ সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি বৃহত্তর আন্তর্জাতিক জোট গঠনের উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।

বাব আল-মানদেব নিয়ে আন্তর্জাতিক জোটের ভাবনা

ইসরায়েলি নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মানদেব প্রণালি। লোহিত সাগরের সঙ্গে এডেন উপসাগরকে যুক্ত করা এই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ দিয়ে এশিয়া, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পণ্য পরিবহন করা হয়।

নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের ধারণা, বাব আল-মানদেবের নিরাপত্তাকে শুধু ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তার বিষয় হিসেবে উপস্থাপন না করে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করা হলে ইসরায়েল বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায় করতে পারে।

তাদের মতে, হুতিদের কর্মকাণ্ডকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও নৌ নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরতে পারলে বিভিন্ন দেশকে একটি অভিন্ন উদ্যোগের আওতায় আনা সহজ হবে। একই সঙ্গে এর মাধ্যমে হুতিদের সামরিক ও কৌশলগত সক্ষমতার পেছনে ইরানের ভূমিকা নিয়েও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও চাপ তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত বাড়লে হুতিদের নিয়ে নতুন আশঙ্কা

এদিকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত আরও তীব্র হলে হুতিদের মাধ্যমে ইসরায়েলের ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করা হতে পারে-এমন আশঙ্কাও করছে ইসরায়েলি নিরাপত্তা মহল।

হারেৎজ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েল এমন একটি পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, যেখানে তেহরান সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়লে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের মিত্র ও সহযোগী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সক্রিয় করতে পারে। সেই পরিস্থিতিতে ইয়েমেনভিত্তিক হুতিরাও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ইসরায়েলি নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের দৃষ্টিতে, এমন পরিস্থিতিতে আগেভাগে ইয়েমেনে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানো উল্টো ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এতে হুতিদের সঙ্গে সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার পাশাপাশি ইরানের সঙ্গে পরোক্ষ সংঘাতও বাড়তে পারে।

গাজা যুদ্ধের পর থেকেই হুতি-ইসরায়েল সংঘাত

গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে হুতি ও ইসরায়েলের মধ্যে একাধিকবার পাল্টাপাল্টি হামলা হয়েছে। ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে হুতিরা ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে। এর জবাবে ইসরায়েলও ইয়েমেনে হুতিদের নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন সামরিক ও অবকাঠামোগত স্থাপনায় বিমান হামলা চালিয়েছে।

হুতিদের সামরিক তৎপরতার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হলো লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদেব প্রণালির আশপাশের এলাকা। এই অঞ্চলে হুতিদের তৎপরতার কারণে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হলে বৈশ্বিক বাণিজ্য, জাহাজ চলাচল এবং পণ্য সরবরাহব্যবস্থায় এর প্রভাব পড়তে পারে।

নেতানিয়াহু সরকারের সঙ্গে সামরিক নেতৃত্বের কৌশলগত মতপার্থক্য?

হুতিদের বিরুদ্ধে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা নিয়ে ইসরায়েলি সরকারের রাজনৈতিক অবস্থান এবং সামরিক-নিরাপত্তা মহলের মূল্যায়নের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

ইসরায়েলের উগ্র ডানপন্থি রাজনৈতিক মহলের একটি অংশ আঞ্চলিক প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে সামরিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সাম্প্রতিক সতর্ক অবস্থান থেকে বোঝা যাচ্ছে, হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি নতুন অভিযান চালানোর কৌশল নিয়ে ইসরায়েলের অভ্যন্তরেও আলোচনা ও মতপার্থক্য রয়েছে।

নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, ইসরায়েল এককভাবে হুতিদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালালে আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে এর ফলে ইরানও তাদের আঞ্চলিক মিত্র ও সহযোগী গোষ্ঠীগুলোকে আরও সক্রিয় করার সুযোগ পেতে পারে।

ইসরায়েলের সামনে এখন কূটনীতিই বড় হাতিয়ার?

এই পরিস্থিতিতে ইসরায়েলি সামরিক ও নিরাপত্তা মহলের পরামর্শ হলো-হুতিদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে নতুন হামলা চালানোর পরিবর্তে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা এবং কূটনৈতিক চাপ বাড়ানো। পাশাপাশি বাব আল-মানদেবের নিরাপত্তাকে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে তুলে ধরে বৃহত্তর আন্তর্জাতিক জোট গঠনের চেষ্টা চালানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে হুতিদের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক ও তেহরানের সম্ভাব্য ভূমিকা আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে রাখার মাধ্যমে ইরানের ওপর কূটনৈতিক চাপ বাড়ানোর কৌশলও নেওয়া হতে পারে।

তবে হুতিদের বিরুদ্ধে নতুন হামলা চালানো হবে কি না, কিংবা ইসরায়েল সরকার সামরিক নেতৃত্বের এই পরামর্শ কতটা অনুসরণ করবে-তা এখনো স্পষ্ট নয়। এ বিষয়ে ইসরায়েলি সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্যও পাওয়া যায়নি।

এ ছাড়া হারেৎজ-এর প্রতিবেদনে যেসব নিরাপত্তা কর্মকর্তার বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে, তাদের কারও নাম প্রকাশ করা হয়নি। ফলে তাদের বক্তব্য ইসরায়েলি সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান নয়, বরং দেশটির নিরাপত্তা মহলের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন ও পরামর্শ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।