সারাবিশ্ব

রুশ স্যাটেলাইটের তথ্যেই ইরানের হামলা আরও নিখুঁত? চাঞ্চল্যকর দাবি সিএনএনের


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:১০ পিএম

রুশ স্যাটেলাইটের তথ্যেই ইরানের হামলা আরও নিখুঁত? চাঞ্চল্যকর দাবি সিএনএনের
ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় ইরানের সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার নির্ভুলতার পেছনে রাশিয়ার গোয়েন্দা সহায়তা থাকতে পারে বলে দাবি করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন। মার্কিন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের বরাত দিয়ে সিএনএন জানিয়েছে, রাশিয়ার শক্তিশালী স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন মার্কিন সামরিক বাহিনী ও সরঞ্জামের অবস্থান সম্পর্কে ইরানকে সুনির্দিষ্ট তথ্য সরবরাহ করা হয়ে থাকতে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাশিয়ার সামরিক ও গোয়েন্দা স্যাটেলাইটগুলো বিভিন্ন মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনার ওপর নজরদারি চালিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহে সক্ষম। এসব তথ্য ইরানের হাতে পৌঁছালে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার লক্ষ্য নির্ধারণ এবং আঘাতের নির্ভুলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। তবে রাশিয়া সরাসরি ইরানকে এ ধরনের গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করেছে-এমন কোনো প্রকাশ্য ও নিশ্চিত প্রমাণের কথা সিএনএনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে গত ২৭ মার্চের হামলা। ওই হামলায় ১২ জন মার্কিন সামরিক সদস্য আহত হন এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ এয়ারবোর্ন ওয়ার্নিং অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম বা অ্যাওয়াক্স (AWACS) বিমান ধ্বংস হওয়ার কথা প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। মার্কিন সামরিক স্থাপনার মতো সুরক্ষিত লক্ষ্যবস্তুতে হামলার নির্ভুলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, আর সেই সূত্র ধরেই সম্ভাব্য রুশ স্যাটেলাইট সহায়তার বিষয়টি সামনে এসেছে।

সিএনএনের বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, হামলার প্রায় দুই দিন আগে রাশিয়ার ‘কসমস-২৫৭৩’ নামের একটি গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা স্যাটেলাইটসহ মোট ১৪টি রুশ কৃত্রিম উপগ্রহ প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটির ওপর দিয়ে অতিক্রম করেছিল। স্যাটেলাইটগুলোর গতিপথ বিশ্লেষণ করে এই তথ্য পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে কোনো স্যাটেলাইট নির্দিষ্টভাবে ওই ঘাঁটির তথ্য সংগ্রহ করেছে বা সেই তথ্য ইরানের কাছে সরবরাহ করা হয়েছে—এ বিষয়টি নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত নয়।

আধুনিক সামরিক গোয়েন্দা ব্যবস্থায় স্যাটেলাইটের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়ার বিভিন্ন ধরনের স্যাটেলাইটের মাধ্যমে উচ্চ রেজল্যুশনের ছবি সংগ্রহ, রাডার ও রেডিও যোগাযোগ শনাক্তকরণ এবং লক্ষ্যবস্তুর তাপীয় উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হতে পারে। পাশাপাশি সিন্থেটিক অ্যাপারচার রাডার বা এসএআর প্রযুক্তি ব্যবহার করে রাতের অন্ধকার কিংবা মেঘলা আবহাওয়ার মধ্যেও ভূমি ও স্থাপনার পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা যায়। এসব সক্ষমতা একত্রে ব্যবহার করা হলে কোনো সামরিক ঘাঁটিতে থাকা বিমান, যানবাহন বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জামের অবস্থান সম্পর্কে তুলনামূলকভাবে বিস্তারিত ধারণা পাওয়া সম্ভব।

বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধক্ষেত্রে এমন স্যাটেলাইট-ভিত্তিক গোয়েন্দা তথ্য কোনো হামলার পরিকল্পনা ও লক্ষ্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে মোবাইল সামরিক সরঞ্জাম, বিমান বা সাময়িকভাবে মোতায়েন করা ইউনিটের অবস্থান শনাক্ত করতে নিয়মিত স্যাটেলাইট নজরদারি কার্যকর হতে পারে। তবে ইরানের সাম্প্রতিক হামলার সাফল্যের একমাত্র কারণ হিসেবে রুশ স্যাটেলাইট গোয়েন্দা তথ্যকে চিহ্নিত করার মতো পর্যাপ্ত প্রকাশ্য প্রমাণ এখনো নেই।

কিংস কলেজ লন্ডনের ডিপার্টমেন্ট অব ওয়ার স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ গবেষক নওয়াফ ওবায়েদ এই ঘটনাকে বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে দেখছেন। তার মতে, ইউক্রেন যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা ও সামরিক সহায়তার বিপরীতে রাশিয়ার মধ্যপ্রাচ্যে পাল্টা অবস্থান নেওয়ার একটি সম্ভাব্য দৃষ্টান্ত হতে পারে এটি। তার বিশ্লেষণে, এমন সহযোগিতা সত্যি হয়ে থাকলে তা মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির ওপর নতুন ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা সমীকরণেও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি এবং ইরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের উত্তেজনা অঞ্চলটির নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে ইরানের হামলায় রাশিয়ার সম্ভাব্য গোয়েন্দা সহায়তার এই দাবি সত্যতা পেলে তা শুধু একটি সামরিক ঘটনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং রাশিয়া, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বৃহত্তর কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতারও গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করবে।