জাতীয়
বিতর্ক, সমঝোতা ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতাই সংবিধানের শক্তি: মার্কিন রাষ্ট্রদূত
বিভিন্ন মত ও আদর্শের মানুষের মধ্যে ধারাবাহিক বিতর্ক, ঐকমত্যে পৌঁছানোর প্রচেষ্টা, ক্ষমতার পৃথকীকরণ এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার মতো সাংবিধানিক নীতিই যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানকে দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে কার্যকর রেখেছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন। তিনি বলেন, এসব নীতি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকেই শক্তিশালী করেনি, বরং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গণতন্ত্র ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকেও প্রভাবিত করেছে।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান দিবস এবং দেশটির গণতন্ত্রের ২৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে সম্মানিত অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদ ও ঢাকায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস যৌথভাবে এ সেমিনারের আয়োজন করে।
রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের দীর্ঘস্থায়িত্বের অন্যতম কারণ হলো নিয়মিত বিতর্কের মাধ্যমে মতপার্থক্য মোকাবিলা এবং সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা। তাঁর মতে, ক্ষমতার পৃথকীকরণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী সংবিধান সংশোধনের সুযোগ দেশটির সাংবিধানিক কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করেছে।
তিনি বলেন, ধারাবাহিক বিতর্ক, ঐকমত্যের জন্য নিরন্তর অনুসন্ধান এবং ক্ষমতার পৃথকীকরণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সংবিধানে নতুন সংশোধনী যুক্ত করার অধিকারের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার মাধ্যমে একটি দৃঢ় সাংবিধানিক কাঠামো গড়ে উঠেছে। এই কাঠামো দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বিশ্বের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে অনুপ্রাণিত করে আসছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সেমিনারে বাংলাদেশের বর্তমান সাংবিধানিক পরিস্থিতি ও আইনের শাসন নিয়েও বক্তব্য দেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, সরকার কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে কাজ করছে না; বরং মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার সম্পন্ন করাই সরকারের মূল লক্ষ্য। তাঁর ভাষায়, ‘ব্যক্তি আমাদের লক্ষ্য নয়। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার সম্পন্ন করাই আমাদের লক্ষ্য।’
জুলাই ২০২৪-এর আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার সম্পন্ন করার বিষয়ে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেও জানান আইনমন্ত্রী। তিনি দাবি করেন, এসব মামলায় অপরাধ প্রমাণের জন্য সরকারের হাতে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ রয়েছে।
সংসদে গত জুনে দেওয়া তথ্যের উল্লেখ করে মো. আসাদুজ্জামান বলেন, জুলাই আন্দোলনকে ঘিরে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মোট ৮০টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে সাতটি মামলার রায় হয়েছে এবং ৫৯ জন আসামি দণ্ডিত হয়েছেন। অন্য মামলাগুলোর মধ্যে ২২টিতে সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে এবং ৫১টি মামলা তদন্তাধীন রয়েছে বলে জানান তিনি।
দেশের বর্তমান সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থা ও আইনের শাসনের প্রসঙ্গ তুলে আইনমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে সংবিধান ও অর্থনীতির ওপর বিভিন্ন ধরনের চাপের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে সাংবিধানিক শাসন, আইনের শাসন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক ব্যবস্থার বিভিন্ন দিকের তুলনা করে তিনি বলেন, মতপ্রকাশ, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ, চলাচল এবং সংগঠনের স্বাধীনতা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিচারিক পর্যালোচনার ব্যবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে সুপ্রিম কোর্টের এখতিয়ারের কিছুটা মিল রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বিগত সরকারের সময়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর নিপীড়নের অভিযোগ তুলে আইনমন্ত্রী আরও দাবি করেন, ওই সময়ে চার হাজার ৫০০-এর বেশি বিএনপি নেতা-কর্মী বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন, প্রায় ৭০০ ব্যক্তি গুমের শিকার হয়েছেন এবং ৬০ লাখের বেশি মানুষ রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলার মুখোমুখি হয়েছেন। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি গ্রহণ করেছে।
সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ একরামুল হক।
সেমিনারে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের সংবিধান, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং মৌলিক অধিকারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হয়। অনুষ্ঠানের সমাপনী বক্তব্যে প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন, আইনের শাসন এবং মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকার সমুন্নত রাখার বিষয়ে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের অভিন্ন অঙ্গীকারের বিষয়টি তুলে ধরা হয়।