সারাবিশ্ব
দৃষ্টিহীনতার বাধা পেরিয়ে ইসলামের জ্ঞান ছড়াচ্ছেন নওমুসলিম ইয়াদিরা
জন্ম থেকেই দৃষ্টিহীন। অথচ নিজের এই সীমাবদ্ধতাকে বাধা হিসেবে না দেখে ইসলামের জ্ঞান অর্জন ও তা অন্য দৃষ্টিহীন মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অনন্য উদ্যোগ নিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের নওমুসলিম নারী ইয়াদিরা সাবাতা। ইসলাম গ্রহণের পর ইসলামী জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে নিজের যে কঠিন অভিজ্ঞতা হয়েছিল, সেটিই পরবর্তীতে তাঁকে দৃষ্টিহীন মুসলিমদের জন্য কাজ করতে অনুপ্রাণিত করে।
ইয়াদিরা সাবাতা ২০০৪ সালে ইসলাম গ্রহণ করেন। ক্যাথলিক পরিবারে বেড়ে ওঠা ইয়াদিরার জীবনে ইসলাম গ্রহণ ছিল এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। ইসলাম সম্পর্কে জানার আগ্রহ দিন দিন বাড়তে থাকে তাঁর। কোরআনের অনুবাদ, হাদিস, নবীদের জীবন, ইসলামের ইতিহাস এবং বিভিন্ন ইসলামি গ্রন্থ সম্পর্কে জানার তীব্র আগ্রহ থাকলেও জন্মগত দৃষ্টিহীনতার কারণে প্রচলিত বই পড়ে জ্ঞান অর্জন করা তাঁর জন্য সম্ভব ছিল না।
ইসলাম গ্রহণের পর তিনি উপলব্ধি করেন, দৃষ্টিসম্পন্ন মানুষের জন্য ইসলামী জ্ঞান অর্জনের যে সুযোগ রয়েছে, দৃষ্টিহীনদের জন্য তা অনেকটাই সীমিত। কোনো বই পড়তে চাইলে তাঁকে প্রায়ই অডিও রেকর্ডিং শুনতে বলা হতো। সহমর্মী মুসলিমরা সহযোগিতার চেষ্টা করলেও নিজের হাতে ব্রেইল পদ্ধতিতে ইসলামী বই পড়ার সুযোগের অভাব তাঁকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে।
ইয়াদিরার কাছে বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত অসুবিধা ছিল না। তিনি বুঝতে পারেন, বিশ্বের অসংখ্য দৃষ্টিহীন মুসলিম একই সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। একজন মানুষ নিজের হাতে বই পড়ার মাধ্যমে যে স্বাধীনতা, চিন্তার সুযোগ এবং গভীর উপলব্ধি অর্জন করতে পারেন, কেবল অডিও শুনে তা সবসময় একইভাবে পাওয়া সম্ভব নয়। এই উপলব্ধি থেকেই দৃষ্টিহীন মুসলিমদের জন্য ইসলামি সাহিত্য সহজলভ্য করার উদ্যোগ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
এই লক্ষ্যেই ২০১৬ সালে স্বামী নাদিরকে সঙ্গে নিয়ে ইয়াদিরা প্রতিষ্ঠা করেন ‘ইসলাম বাই টাচ’ (Islam by Touch) নামে একটি সংগঠন। প্রতিষ্ঠানটির মূল উদ্দেশ্য হলো দৃষ্টিহীন মানুষের জন্য ব্রেইল পদ্ধতিতে প্রস্তুত করা কোরআন, কোরআনের অনুবাদ এবং ইসলামের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ সহজলভ্য করা।
ইসলাম বাই টাচের উদ্যোগে দৃষ্টিহীন মুসলিমরা যেন অন্যের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল না হয়ে নিজেরাই ব্রেইল পদ্ধতিতে ইসলামি বই পড়তে পারেন, সেই সুযোগ তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। সংগঠনটি উত্তর আমেরিকায় দৃষ্টিহীনদের জন্য ব্রেইল পদ্ধতিতে ইসলামি শিক্ষা ও সাহিত্য সহজলভ্য করার উদ্যোগগুলোর মধ্যে অন্যতম। প্রতিষ্ঠানটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব ব্রেইলি কোরআন সার্ভিসের (IBQS) সদস্য হিসেবেও যুক্ত রয়েছে।
ইয়াদিরা তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতা ও উদ্যোগের কথা ইসলাম বাই টাচের ওয়েবসাইটে তুলে ধরেছেন। সেখানে তিনি জানান, তিনি সম্পূর্ণ দৃষ্টিহীন এবং তাঁর স্বামী নাদির আইনগতভাবে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। তাঁদের রয়েছে তিন সন্তান। ইসলাম গ্রহণের পর স্বামী, সন্তান এবং শ্বশুরবাড়ির পরিবারের কাছ থেকে পাওয়া ভালোবাসা ও সহযোগিতার কথাও তিনি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেছেন।
ইয়াদিরার কাছে ইসলাম গ্রহণ তাঁর জীবনের অন্যতম বড় আশীর্বাদ। তিনি আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমতের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তবে একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, ইসলাম গ্রহণের পর একজন নতুন মুসলিমের জন্য ধর্ম সম্পর্কে জানার সুযোগ থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর সেই সুযোগ যদি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতার কারণে সীমিত হয়ে যায়, তাহলে তা দূর করার জন্য সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
ইয়াদিরার অভিজ্ঞতায়, অডিওর মাধ্যমে ইসলামি জ্ঞান অর্জনের সুযোগ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে নিজের হাতে বই পড়ার অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। একটি বই নিজের মতো করে পড়ার সময় পাঠক প্রয়োজন অনুযায়ী থামতে পারেন, কোনো বিষয় নিয়ে ভাবতে পারেন এবং নিজের গতিতে বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারেন। তাঁর মতে, পড়ার স্বাধীনতা মানুষের চিন্তা ও কল্পনার জগতকে আরও বিস্তৃত করে।
এই বিশ্বাস থেকেই ইয়াদিরা ও তাঁর স্বামী দৃষ্টিহীন মুসলিমদের জন্য ইসলামি গ্রন্থের সহজপ্রাপ্যতা বাড়ানোর কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁদের লক্ষ্য শুধু বই সরবরাহ করা নয়; বরং দৃষ্টিহীন মুসলিমদের ইসলাম সম্পর্কে স্বাধীনভাবে শেখা, চিন্তা করা এবং জ্ঞান অর্জনের সুযোগ তৈরি করা।
ইয়াদিরার এই উদ্যোগ দৃষ্টিহীন মুসলিমদের জন্য ইসলামি জ্ঞান অর্জনের একটি বিকল্প পথ তৈরি করছে। তাঁর নিজের জীবনের সীমাবদ্ধতা থেকেই যে উদ্যোগের জন্ম, সেটিই এখন অন্য দৃষ্টিহীন মানুষের কাছে কোরআন ও ইসলামি জ্ঞান পৌঁছে দেওয়ার একটি মাধ্যম হয়ে উঠেছে। দৃষ্টির সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে জ্ঞান অর্জনের এই প্রচেষ্টা তাই তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের গল্পের পাশাপাশি অন্যদের জন্যও একটি অনুপ্রেরণার উদাহরণ হয়ে উঠেছে।