সারাবিশ্ব
মক্কার আকাশে হুতি ড্রোন, এবার কি কার্যকর হবে পাকিস্তান-সৌদি-তুরস্কের প্রতিরক্ষা চুক্তি?
পবিত্র মক্কা নগরীর দক্ষিণে হুতিদের একটি ড্রোন সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভূপাতিত করার পর পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত ত্রিপক্ষীয় ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে চুক্তিটি কার্যকরের সময় এসেছে। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, চুক্তিটি পাকিস্তানের জন্য প্রযোজ্য এবং প্রয়োজন হলে ইসলামাবাদ নিজেদের দায়িত্ব পালন করবে।
বুধবার জিও নিউজের ‘আজ শাহজেব খানজাদা কে সাথ’ অনুষ্ঠানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে খাজা আসিফ এসব কথা বলেন। তিনি জানান, তিন দেশের যেকোনো একটি দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা বা সীমান্ত লঙ্ঘিত হলে পারস্পরিক প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে চুক্তিতে। এ চুক্তি কখন কার্যকর হবে, তা নিয়ে ‘একেবারেই কোনো অস্পষ্টতা নেই’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তবে চুক্তির আওতায় সামরিক সহযোগিতা বা প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হবে না বলে জানান পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য, পবিত্র স্থানগুলোর নিরাপত্তার জন্য আলাদা কোনো চুক্তির প্রয়োজন নেই। এমনকি এই প্রতিরক্ষা চুক্তি না থাকলেও মক্কা ও অন্যান্য পবিত্র স্থান রক্ষাকে পাকিস্তান নিজেদের দায়িত্ব হিসেবে দেখে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
এর আগে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছিল, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মক্কার নিষিদ্ধ আকাশসীমায় প্রবেশের আগেই একটি হুতি ড্রোন শনাক্ত করে ধ্বংস করা হয়েছে। জোটের মুখপাত্র তুরকি আল-মালকি বলেন, মক্কার নিরাপত্তা সৌদি আরবের জন্য ‘রেড লাইন’। ২০১৭ সালে মক্কাকে লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ঘটনার পর এটিকে পবিত্র নগরীকে লক্ষ্য করে হুতিদের দ্বিতীয় হামলার চেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে মক্কা বা অন্য কোনো পবিত্র স্থানে হামলার লক্ষ্য থাকার অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে হুতিরা। গোষ্ঠীটির দাবি, সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও সামরিক ঘাঁটিগুলোই তাদের অভিযানের লক্ষ্য। এসব লক্ষ্যবস্তু পবিত্র স্থানগুলো থেকে দূরে বলেও দাবি করেছে তারা।
হুতি ড্রোন হামলার এই ঘটনার পর সৌদি আরবের প্রতি পূর্ণ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। তিনি সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা এবং পবিত্র স্থানগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে পাকিস্তান পাশে থাকবে বলে জানিয়েছেন। একই সঙ্গে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
এদিকে হুতিদের হামলার বিষয়ে সৌদি আরবের একটি বার্তা পাকিস্তান ইরানের কাছে পৌঁছে দিয়েছে বলেও জানিয়েছেন খাজা আসিফ। তাঁর ধারণা, ইরান রাষ্ট্র হিসেবে এমন কোনো পদক্ষেপ নেবে না, যার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা আরও বড় আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, ইরানি রাষ্ট্রের সঙ্গে অরাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীগুলোর সম্পর্কের বিষয়টি আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, কোনো অরাষ্ট্রীয় গোষ্ঠী সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ছাড়াও নিজেদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারে। ফলে কোনো গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডের জন্য সরাসরি সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রকে দায়ী করা সবসময় যথাযথ নাও হতে পারে।
খাজা আসিফ আরও মন্তব্য করেন, হুতি ও সৌদি আরবের চলমান সংঘাতে ইরান সরাসরি কোনো পক্ষ নিলে তা তেহরানের জন্য বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত হবে না। আঞ্চলিক উত্তেজনা যাতে নতুন কোনো দেশে বা নতুন কোনো এলাকায় ছড়িয়ে না পড়ে, সে জন্য পাকিস্তান কূটনৈতিকভাবে কাজ করে যাবে বলেও জানান তিনি।
পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ তিন দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতায় নতুন একটি কাঠামো তৈরি করেছে। খাজা আসিফের বক্তব্য অনুযায়ী, তিন দেশের নিরাপত্তাগত প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়েই এই ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। মক্কার কাছে হুতি ড্রোন ভূপাতিত হওয়ার পর তাঁর বক্তব্যে এখন প্রশ্ন উঠেছে—এই চুক্তির পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বাস্তবে কীভাবে প্রয়োগ করা হবে এবং বর্তমান আঞ্চলিক উত্তেজনায় পাকিস্তানের ভূমিকা কতটা সক্রিয় হবে।