সারাবিশ্ব

আসামে ৭৩ মুসলিম পরিবারের বাড়ি বুলডোজারে ভাঙা হলো, হাইকোর্টের প্রশ্ন


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:১৩ পিএম

আসামে ৭৩ মুসলিম পরিবারের বাড়ি বুলডোজারে ভাঙা হলো, হাইকোর্টের প্রশ্ন
ছবি: সংগৃহীত

ভারতের আসাম রাজ্যের গোয়ালপাড়া জেলায় ৭৩টি মুসলিম পরিবারের বাড়িঘর বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দেওয়ার ঘটনায় জেলা প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে গৌহাটি হাইকোর্ট। ব্যক্তিমালিকানাধীন কৃষিজমিতে নির্মিত এসব বাড়ি ভেঙে ফেলার ক্ষেত্রে প্রশাসনের নেওয়া পদক্ষেপ প্রাথমিকভাবে অবৈধ ও অননুমোদিত বলে প্রতীয়মান হচ্ছে বলে পর্যবেক্ষণ করেছেন আদালত। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের বক্তব্য উপস্থাপনের পর্যাপ্ত সুযোগ না দেওয়ায় স্বাভাবিক ন্যায়বিচারের নীতি (Principles of Natural Justice) লঙ্ঘিত হয়েছে কি না, সে বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছে আদালত।

গত ৭ সেপ্টেম্বর গোয়ালপাড়া জেলা প্রশাসন ৭৩টি বাড়ি ভেঙে দেয়। এর মাত্র দুই দিন আগে, অর্থাৎ ৫ সেপ্টেম্বর, সংশ্লিষ্ট সার্কেল অফিসারের পক্ষ থেকে এসব পরিবারের কাছে নোটিশ পাঠানো হয়েছিল। নোটিশে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কৃষিজমিতে নির্মিত বাড়িঘর সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাড়ি সরিয়ে না নিলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও নোটিশে উল্লেখ করা হয়।

প্রশাসনের দেওয়া ওই নোটিশে ১৮৮৬ সালের আসাম ভূমি ও রাজস্ব বিধান এবং ২০০৫ সালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন-এর বিধানের উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে মাত্র ২৪ ঘণ্টার নোটিশের ভিত্তিতে এত বড় পরিসরে বাড়িঘর উচ্ছেদ ও ভাঙার সিদ্ধান্ত কতটা আইনসম্মত ছিল, সেটিই এখন আদালতের সামনে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাড়িঘর ভেঙে দেওয়ার ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ২১ জন বাসিন্দা গৌহাটি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন। তাদের অভিযোগ, প্রশাসন বাড়িঘর ভেঙে ফেলার আগে তাদের নিজেদের বক্তব্য উপস্থাপন, আপত্তি জানানো কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার জন্য যথেষ্ট সময় ও সুযোগ দেয়নি। মামলাটির শুনানি করেন বিচারপতি দেবাশিস বড়ুয়া।

শুনানির সময় আদালত ২০১৫ সালের আসাম কৃষিজমি পুনঃশ্রেণীকরণ ও হস্তান্তর আইন-এর বিষয়টিও বিবেচনায় নেয়। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ সাপেক্ষে এক বিঘা পর্যন্ত কৃষিজমিতে নিজস্ব বসবাসের জন্য দুই তলা পর্যন্ত বাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রে ডেপুটি কমিশনারের আগাম অনুমতির প্রয়োজন নাও হতে পারে। তবে ভেঙে দেওয়া প্রতিটি বাড়ি ওই আইনের সব শর্ত পূরণ করেছিল কি না, সে বিষয়ে আদালত এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়নি।

এদিকে, ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে বসতবাড়ি ভেঙে ফেলার মতো এত কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য কী ধরনের ‘আসন্ন বিপদ’ বা জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল—এ প্রশ্নও তুলেছে হাইকোর্ট। মাত্র ২৪ ঘণ্টার নোটিশ দিয়ে বাসিন্দাদের বক্তব্য শোনার সুযোগ না দিয়ে কেন এত বড় ধরনের উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলো, প্রশাসনের কাছে তার ব্যাখ্যাও চেয়েছে আদালত।

১১ সেপ্টেম্বরের আদেশে হাইকোর্ট জানায়, প্রশাসনের পক্ষ থেকে জমা দেওয়া নথিপত্র ও নির্দেশনা পর্যালোচনা করে প্রাথমিকভাবে এমন কোনো আসন্ন বিপদের পরিস্থিতি আদালতের নজরে আসেনি, যার কারণে ব্যক্তিগত জমিতে থাকা বাড়িঘর ভেঙে ফেলার মতো জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন ছিল। বরং ২০০৫ সালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইনে দেওয়া ক্ষমতার অপব্যবহার হয়ে থাকতে পারে বলেও আদালত প্রাথমিক পর্যায়ে পর্যবেক্ষণ করেছে।

তবে আদালতের এই পর্যবেক্ষণকে এখনই চূড়ান্ত রায় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ শুনানি ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য পর্যালোচনার পরই আদালত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে।

এ ঘটনায় জেলা প্রশাসক ও সংশ্লিষ্ট সার্কেল কর্মকর্তাকে পৃথক হলফনামা দাখিলের সুযোগ দিয়েছে হাইকোর্ট। একই সঙ্গে বাড়িঘর ভেঙে দেওয়ার ফলে তাদের কী ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার বিস্তারিত তথ্য উল্লেখ করে ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের অতিরিক্ত হলফনামা জমা দেওয়ার অনুমতিও দেওয়া হয়েছে।

প্রশাসনের দাবি, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই কৃষিজমির শ্রেণি পরিবর্তন করে সেখানে বসতবাড়ি নির্মাণ করা হয়েছিল। অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের দাবি, যে জমিতে তাদের বাড়ি ছিল, সেগুলো তাদের ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি। ফলে জমির ব্যবহার, বাড়ি নির্মাণের বৈধতা এবং উচ্ছেদ অভিযানের ক্ষেত্রে প্রশাসন যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছিল কি না-এই তিনটি বিষয় এখন মামলার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

মামলাটির পরবর্তী শুনানি আগামী ১৩ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ওই শুনানিতে প্রশাসনের হলফনামা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পক্ষ থেকে দেওয়া ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ আদালতের পরবর্তী বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।