সারাবিশ্ব
হুতিদের ঠেকাতে পাল্টা গোয়েন্দা যুদ্ধে সৌদি জোট
ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চলীয় ফ্রন্টে হুতিদের অগ্রযাত্রা থামাতে সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনী এখন শুধু সামরিক শক্তি প্রয়োগের ওপর নির্ভর করছে না; বরং গোয়েন্দা তথ্য, যোগাযোগব্যবস্থা এবং কমান্ড কাঠামোকে কেন্দ্র করে পাল্টা কৌশল গ্রহণ করছে। একটি সামরিক বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে, রাশিয়া ও ইরানের সমন্বিত গোয়েন্দা ও কমান্ডব্যবস্থার সহায়তায় অতীতে হুতিরা যে সুবিধা পেয়েছিল, সেই ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো এখন কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনী।
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, রাশিয়ার মহাকাশভিত্তিক ভূ-স্থানিক গোয়েন্দা তথ্য বা জিওইন্ট এবং সিগন্যাল গোয়েন্দা তথ্য বা সিগইন্ট ইরানের নেতৃত্বাধীন কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল বা সি২ ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছিল। পরে এসব তথ্য হুতিদের সামরিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা ও লক্ষ্য নির্ধারণে ব্যবহৃত হয় বলে দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চলে তারিক সালেহের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সেস বা এনআরএফের ভেতরে মানব গোয়েন্দা বা হিউম্যান ইন্টেলিজেন্সের একটি নেটওয়ার্কও গড়ে তোলা হয়েছিল বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই সমন্বিত গোয়েন্দা ব্যবস্থার মাধ্যমে পশ্চিম উপকূলীয় ফ্রন্টে সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনীর অবস্থান, যোগাযোগব্যবস্থা, সেনা মোতায়েন এবং কমান্ড কাঠামোর দুর্বলতা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছিল বলে বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে। এসব দুর্বলতা কাজে লাগিয়েই হুতিরা ওই অঞ্চলে সামরিক অগ্রগতি অর্জন করতে পেরেছিল বলে বিশ্লেষকের মত।
মহাকাশ থেকে যুদ্ধক্ষেত্রের নজরদারি
বিশ্লেষণটির লেখক দাবি করেছেন, তার তৈরি ‘প্রজেক্ট অরোরাহ’ নামের একটি জিওইন্ট ও সিগইন্ট ফিউশন ব্যবস্থার মাধ্যমে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের সময় সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, ইরাক, ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জর্ডানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের ওপর রাশিয়ার সামরিক নজরদারি কার্যক্রম শনাক্ত ও বিশ্লেষণ করা হয়েছিল।
তার দাবি অনুযায়ী, প্রকল্পটির একটি বিশেষভাবে নিয়ন্ত্রিত অংশ রাশিয়ার কক্ষপথভিত্তিক গোয়েন্দা কার্যক্রমকে একটি সমন্বিত বহুসেন্সর ব্যবস্থায় রূপ দেয়। এর মাধ্যমে ইরান কীভাবে বিভিন্ন দেশের সামরিক স্থাপনা ও মার্কিন সামরিক অবস্থান সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহার করে নির্ভুল হামলার সক্ষমতা বাড়িয়েছে, তার একটি চিত্র তৈরি করা হয় বলে দাবি করা হয়েছে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আধুনিক যুদ্ধে স্যাটেলাইট গোয়েন্দা তথ্যের ব্যবহার এখন কেবল যুদ্ধক্ষেত্র পর্যবেক্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বাহিনীর অবস্থান, চলাচলের পথ, সামরিক সদর দফতর এবং রসদ সরবরাহের পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে হামলার আগেই একটি বিস্তৃত যুদ্ধক্ষেত্রের চিত্র তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে।
একাধিক স্যাটেলাইটের তথ্য এক ব্যবস্থায়
একটি মাত্র স্যাটেলাইটের ওপর নির্ভর না করে বিভিন্ন ধরনের গোয়েন্দা স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া তথ্য সময় ও অবস্থান অনুযায়ী একত্র করাই এই ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
জিওইন্টের মাধ্যমে কোনো এলাকায় কোন বাহিনী মোতায়েন রয়েছে, তাদের অবস্থান কোথায় এবং কী ধরনের গতিবিধি হচ্ছে, সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। অন্যদিকে সিগইন্টের মাধ্যমে যোগাযোগব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক সংকেত, যোগাযোগের ধরন এবং সম্ভাব্য কমান্ড কাঠামো সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব।
বিশ্লেষণটির দাবি, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের সময় রাশিয়ার স্যাটেলাইটভিত্তিক গোয়েন্দা তথ্য ইরানের নির্ভুল হামলার সক্ষমতা বাড়াতে ভূমিকা রেখেছিল। ইয়েমেনেও একই ধরনের গোয়েন্দা সমন্বয়ের মডেল ব্যবহার করা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
ইয়েমেনে মানব গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের সঙ্গে সমন্বয়
ইয়েমেনে স্যাটেলাইট ও সিগন্যাল গোয়েন্দা তথ্যকে কার্যকর সামরিক সুবিধায় রূপান্তরের ক্ষেত্রে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বলে বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে। রাশিয়া থেকে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে হুতিদের নিজস্ব মাঠপর্যায়ের তথ্য এবং এনআরএফের ভেতরে থাকা মানব গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের তথ্য একত্র করা হয়েছিল বলে এতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর ফলে তারিক সালেহের বাহিনীর কমান্ড কাঠামো কীভাবে কাজ করছে, কোন সদর দফতর কার্যকর রয়েছে, কোথায় বাহিনীর অবস্থান সম্পর্কে ভুল তথ্য দেওয়া হচ্ছে এবং কোথায় যোগাযোগ ও কমান্ডে দুর্বলতা রয়েছে-এসব শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
বিশ্লেষকের মতে, এর ফলে সৌদি নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট ফোর্সেস কমান্ড এবং ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সেসের মধ্যে সমন্বয়ের দুর্বল জায়গাগুলো হুতিরা কাজে লাগানোর সুযোগ পেয়েছিল।
ভুল তথ্যেই দুর্বল হয়ে পড়ে পশ্চিমাঞ্চলীয় ফ্রন্ট
বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে, পশ্চিমাঞ্চলীয় ফ্রন্টে বড় সমস্যা তৈরি হয়েছিল কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে। জয়েন্ট ফোর্সেস কমান্ডের সদর দফতর এবং এনআরএফের বিভিন্ন ইউনিটের মধ্যে যোগাযোগব্যবস্থা থাকলেও মাঠপর্যায়ের ইউনিটগুলোর নিজেদের মধ্যে এবং ঊর্ধ্বতন কমান্ডের সঙ্গে থাকা যোগাযোগব্যবস্থাও একই সময়ে দুর্বল হয়ে পড়ে।
এর ফলে নিচের স্তর থেকে ভুল বা অসম্পূর্ণ তথ্য ওপরের কমান্ডে পৌঁছাতে থাকে। একইভাবে ওপর থেকে দেওয়া নির্দেশনাও মাঠপর্যায়ে বিভ্রান্তিকর বা বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। যুদ্ধক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়ে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
একজন এনআরএফ কমান্ডার গুরুত্বপূর্ণ একটি অবস্থান ধরে রাখার নির্দেশ পাওয়ার পরও সেখান থেকে সরে যান বলে বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে। অন্যদিকে আরেক কমান্ডার দাবি করেছিলেন, একটি ইয়েমেনি সামরিক ইউনিট বিমানঘাঁটি ছেড়ে গেছে। পরে সেখানে সেনাসদস্যদের উপস্থিতি পাওয়া যায় বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ধরনের তথ্যগত অসামঞ্জস্যের কারণে নিজস্ব বাহিনীর প্রকৃত অবস্থান সম্পর্কে কমান্ড পর্যায়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয় এবং বিমান হামলা পরিচালনার ক্ষেত্রেও ঝুঁকি বাড়ে। মোখা এলাকায় মোতায়েন সৌদি বিশেষ বাহিনীর একটি ইউনিট মাঠপর্যায়ের বাস্তব অবস্থান এবং কমান্ড সিস্টেমে থাকা তথ্যের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য শনাক্ত করেছিল বলেও বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে।
বিমান হামলা পরিচালনাতেও তৈরি হয় জটিলতা
সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনী বিমান হামলার প্রস্তুতি নিলেও নিজেদের স্থলবাহিনীর অবস্থান নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করতে না পারায় বিমানশক্তি ব্যবহারে জটিলতা তৈরি হয়েছিল বলে বিশ্লেষণে বলা হয়েছে।
পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে যখন এনআরএফের কয়েকটি ব্রিগেড সক্রিয় করার সময় দেখা যায়, নিবন্ধিত সদস্যদের প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ দায়িত্ব পালনে উপস্থিত ছিলেন না। অথচ এর আগে জয়েন্ট ফোর্সেস কমান্ড এসব সদস্যের বায়োমেট্রিক নিবন্ধন, বেতন পুনর্বহাল এবং বাহিনী পুনর্গঠনের মতো কার্যক্রম চালিয়েছিল বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কেন্দ্র জাবাল আল-নারকে ঘিরে সমন্বয় দুর্বল হয়ে পড়ার পর এনআরএফের কয়েকটি ইউনিট হুতিদের প্রধান বাহিনী সেখানে পৌঁছানোর আগেই নিজেদের অবস্থান ছেড়ে দেয় বলেও বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে।
মোখার ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিচ্ছে সৌদি জোট
মোখা এলাকার অভিজ্ঞতা সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হিসেবে কাজ করেছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। এর পর থেকে মাঠপর্যায়ের বাহিনী এবং জয়েন্ট ফোর্সেস কমান্ডের মধ্যে যোগাযোগ ও লক্ষ্য নির্ধারণের প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সৌদি-ইয়েমেনি এবং সৌদি-পাকিস্তানি যৌথ টার্মিনাল অ্যাটাক কন্ট্রোলার বা জেটিএসি দলগুলো উত্তরাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ইউনিটগুলোর সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে। এর উদ্দেশ্য হলো মাঠপর্যায়ের বাহিনী এবং যৌথ কমান্ডের হামলা পরিচালনা ব্যবস্থার মধ্যে যাচাইকৃত যোগাযোগ নিশ্চিত করা।
একই সঙ্গে সৌদি অপারেশনাল মেন্টরিং অ্যান্ড লিয়াজোঁ টিম বা ওএমএলটি ইয়েমেনি বাহিনীর জনবল, অবস্থান এবং যুদ্ধপ্রস্তুতির অবস্থা স্বাধীনভাবে যাচাই করছে বলেও বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে।
নির্দেশনার ইতিবাচক যাচাই, পৃথক ও নিয়ন্ত্রিত তথ্যপ্রবাহ এবং বিকল্প এনক্রিপ্টেড যোগাযোগব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে মোখায় প্রকাশ পাওয়া দুর্বলতাগুলো কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে বলে এতে উল্লেখ করা হয়েছে।
আগেও একই ধরনের কৌশল প্রয়োগের দাবি
বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে, সৌদি আরব এর আগে দক্ষিণ ইয়েমেনে সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল বা এসটিসির বিরুদ্ধে একই ধরনের গোয়েন্দা ও কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স কৌশল ব্যবহার করেছিল।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সৌদি নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট ফোর্সেস কমান্ডের সামরিক কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স দক্ষিণ ইয়েমেনে এসটিসির সামরিক কার্যক্রম পরিচালনাকারী কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা শনাক্ত করে ধাপে ধাপে দুর্বল করে দেয় বলে বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে।
এর পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের যোগাযোগ ও লক্ষ্য নির্ধারণের ব্যবস্থা সচল রাখা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে। ফলে বাহ্যিক সহায়তার স্তর দুর্বল হওয়ার পর সংযুক্ত আরব আমিরাত-সমর্থিত কয়েকটি ইউনিট দ্রুত কার্যক্ষমতা হারিয়ে সৌদি নেতৃত্বাধীন অভিযানের চাপে পিছু হটে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
এবার ঝুঁকিতে হুতিদের কমান্ডব্যবস্থা
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, রাশিয়া ও ইরানের সহায়তায় হুতিদের গোয়েন্দা ও কমান্ডব্যবস্থা আগের তুলনায় অনেক বেশি উন্নত হলেও এই ব্যবস্থার মধ্যেই কিছু গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা রয়েছে।
এ ধরনের ব্যবস্থাকে কার্যকর রাখতে নিরাপদ যোগাযোগ, দক্ষ ও বিশেষজ্ঞ জনবল, গোয়েন্দা তথ্য একীভূত করার সক্ষমতা, কারিগরি সহায়তা এবং সানা ও বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রের সদর দফতরের মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ প্রয়োজন। এসব ব্যবস্থার কোনো একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হলে পুরো কমান্ড কাঠামোর কার্যকারিতা কমে যেতে পারে বলে বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে।
বিশ্লেষণটির দাবি, সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনী এখন মূলত এই দুর্বল সংযোগগুলো শনাক্ত ও কাজে লাগানোর দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
সানায় হুতিদের শীর্ষ কমান্ডে বড় আঘাতের দাবি
১৯ সেপ্টেম্বর রাতে ইরান-সমর্থিত হুতিদের শীর্ষ পর্যায়ের কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামোয় বড় ধরনের আঘাত হানা হয়েছে বলে বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে। এতে অন্তত দুই মেজর জেনারেল, সাত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এবং ৩২ কর্নেলসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ হুতি সামরিক কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন বলে এতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাদের সঙ্গে থাকা সহকারী, স্টাফ এবং যোগাযোগব্যবস্থার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে মেজর জেনারেলের চেয়েও উচ্চপদমর্যাদার কয়েকজন কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট বিদেশি ব্যক্তিরাও হামলায় নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকতে পারেন বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
তবে এসব দাবির বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি এবং স্বাধীনভাবেও এগুলো যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে হতাহতের নির্দিষ্ট সংখ্যা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পরিচয়কে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে বিবেচনা করার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন।
সংখ্যার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কমান্ড কাঠামোর ক্ষতি
বিশ্লেষণের মতে, হামলায় কতজন কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এসব হামলা হুতিদের কমান্ড কাঠামোর ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলছে।
সামনের সারির কমান্ড দুর্বল করার পাশাপাশি সানায় হুতিদের উচ্চপর্যায়ের সদর দফতরগুলোতে ধারাবাহিক হামলা চালানো হলে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, লক্ষ্য নির্ধারণ এবং সামরিক অভিযান পরিচালনার মধ্যকার সমন্বয় দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
সদর দফতরগুলো স্থান পরিবর্তন করতে বাধ্য হলে এবং বেঁচে থাকা কমান্ডাররা অধীনস্থ ইউনিটগুলোর সঙ্গে নতুন করে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করলে নতুন যোগাযোগ সংকেত ও অবস্থানগত তথ্য তৈরি হতে পারে। বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে, এসব সংকেত শনাক্ত ও বিশ্লেষণ করে হুতিদের পরবর্তী কার্যক্রম সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
কেন পশ্চিম উপকূলে আগের মতো গতি নেই
এই গোয়েন্দা ও কমান্ড কাঠামোর পরিবর্তনের কারণেই পশ্চিম উপকূলীয় ফ্রন্টে হুতিদের আগের মতো দ্রুত অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না বলে বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে।
যে যোগাযোগ ও কমান্ডব্যবস্থার দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে হুতিরা অতীতে সাফল্য পেয়েছিল, সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনী এখন সেই জায়গাগুলো শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। বিপরীতে হুতিদের বহিরাগত সহায়তাপ্রাপ্ত কমান্ড ও গোয়েন্দা ব্যবস্থাও চাপের মুখে পড়েছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ পশ্চিম উপকূলে অতীতের ব্যর্থতা সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনীর জন্য কেবল দুর্বলতার উদাহরণ হয়ে থাকেনি; বরং সেটিকে পরবর্তী সামরিক পরিকল্পনা ও কমান্ড সংস্কারের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে।
বদলে যাচ্ছে ইয়েমেন যুদ্ধের সমীকরণ
২০১৫ সাল থেকে সৌদি নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট ফোর্সেস কমান্ড কমান্ড, কন্ট্রোল, কমিউনিকেশন, কম্পিউটার, সাইবার, ইন্টেলিজেন্স, সার্ভেইলেন্স ও রিকনাইস্যান্স-অর্থাৎ সি৬আইএসআর সক্ষমতা উন্নয়নে গুরুত্ব দিয়ে আসছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ থেকে শুরু করে লক্ষ্য শনাক্তকরণ এবং দ্রুত হামলা পরিচালনার সক্ষমতাও ধীরে ধীরে উন্নত করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। একই সময়ে হুতিদের দীর্ঘদিনের হামলা ও সামরিক চাপ সৌদি আরবের আগের সংযত অবস্থানের ওপরও প্রভাব ফেলেছে বলে বিশ্লেষক মত দিয়েছেন।
ফলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের সৌদি নেতৃত্বাধীন স্থল, আকাশ ও নৌ অভিযান শুরু হলে সেটি এমন একটি প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে হতে পারে, যার বহিরাগত গোয়েন্দা ও কমান্ড সহায়তা ইতোমধ্যে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে-এমনটাই বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে।
যুদ্ধের নতুন কেন্দ্রবিন্দু ‘গোয়েন্দা যুদ্ধ’
পুরো বিশ্লেষণের মূল বক্তব্য হলো, হুতিদের সামরিক সক্ষমতা কেবল তাদের অস্ত্র, ক্ষেপণাস্ত্র বা জনবলের ওপর নির্ভরশীল নয়। রাশিয়ার স্যাটেলাইট ও সিগন্যাল গোয়েন্দা তথ্য, ইরানের সমন্বয় এবং হুতিদের মাঠপর্যায়ের তথ্য-এই তিন স্তরের সমন্বয় তাদের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে বলে বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে।
তবে একই ব্যবস্থা তাদের জন্য দুর্বলতার কারণও হয়ে উঠতে পারে। কারণ একটি উন্নত কমান্ড ও গোয়েন্দা ব্যবস্থা যত বেশি নির্ভর করে নিরাপদ যোগাযোগ, দক্ষ জনবল, নির্দিষ্ট গোয়েন্দা অবকাঠামো এবং নিরবচ্ছিন্ন তথ্যপ্রবাহের ওপর, সেই সংযোগগুলোর কোনো একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে পুরো ব্যবস্থার কার্যকারিতা দ্রুত কমে যেতে পারে।
ফলে ইয়েমেনের চলমান সংঘাতে শুধু কে কত সেনা বা অস্ত্র মোতায়েন করছে, সেটিই একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। বরং প্রতিপক্ষের গোয়েন্দা তথ্য, যোগাযোগ ও কমান্ড কাঠামো কে কত দ্রুত শনাক্ত, বিশ্লেষণ এবং অকার্যকর করতে পারছে-সেটিও সংঘাতের গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।